অ্যাডভোকেট ইউসুফ আরমান

বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক মানুষের জন্য ব্যাংকিং সেবা সহজ করেছে। তবে অনিয়ম, প্রতারণা, দুর্বল তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ঘাটতি এই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হচ্ছ। এজেন্ট কোনো স্বাধীন ব্যাংক নয়; সে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পক্ষে কাজ করে। তাই বৈধ লেনদেন, আমানত, তথ্যের নিরাপত্তা ও অভিযোগের প্রতিকারের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক দায় অস্বীকার করা যায় না।
তবে তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। অভিযোগ সত্য হলে শুধু মাঠপর্যায়ের এজেন্টকে দায়ী করে ব্যাংকের তদারকি, নিরীক্ষা ও জবাবদিহির ঘাটতি আড়াল করাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাৎক্ষণিক ডিজিটাল প্রমাণ, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি, ঝুঁকিপূর্ণ আউটলেটে বিশেষ নিরীক্ষা, অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের দ্রুত প্রতিকার—এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকিঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংক নির্ধারিত নীতিমালায় এজেন্টের মাধ্যমে সেবা দেয়। গ্রাহক ব্যাংকের নাম ও লোগো দেখে টাকা জমা দিলেও লেনদেনটি ব্যাংকের মূল ব্যবস্থায় নথিভুক্ত হয়েছে কি না সবসময় যাচাই করতে পারেন না। রসিদ না দেওয়া, ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ নেওয়া, হিসাবের তথ্য গোপন করা বা গ্রাহকের বিশ্বাসের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে পারে।
তাই প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত জরুরি। সব এজেন্টকে একসঙ্গে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অজুহাতে ব্যবস্থার দুর্বলতা উপেক্ষা করাও দায়িত্বহীনতা।
দায় নির্ধারণ ও প্রতিকারঃ কোনো গ্রাহক এজেন্ট আউটলেটে টাকা জমা দিয়ে পরে জানতে পারেন, তাঁর হিসাবে অর্থ জমা হয়নি। তখন যাচাই করতে হবে—লেনদেনটি অনুমোদিত পদ্ধতিতে হয়েছিল কি না, ব্যাংকের সার্ভারে রেকর্ড আছে কি না, রসিদটি আসল কি না এবং ব্যাংক নিয়মিত তদারকি করেছে কি না।
এজেন্টের ব্যক্তিগত প্রতারণা এবং বৈধ ব্যাংকিং লেনদেনের আইনি পার্থক্যও স্পষ্ট করতে হবে। গ্রাহকের দাবি, ব্যাংকের রেকর্ড, চুক্তি ও প্রযোজ্য বিধিমালা যাচাই করেই দায় ও প্রতিকারের পথ নির্ধারণ করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে ব্যাংককে শুধু এজেন্টের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানো যাবে না।
গ্রাহক সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ-
১. প্রতিটি লেনদেনের তাৎক্ষণিক এসএমএস, যাচাইযোগ্য রসিদ ও হালনাগাদ হিসাবের তথ্য দিতে হবে।
২. অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা, অভিযোগ নম্বর ও অগ্রগতি গ্রাহককে জানাতে হবে।
৩. অস্বাভাবিক লেনদেন বা বারবার অভিযোগ দেখা দিলে ঝুঁকিপূর্ণ আউটলেটে বিশেষ নিরীক্ষা চালাতে হবে।
৪. অর্থ আত্মসাৎ, জাল রসিদ বা প্রতারণা প্রমাণিত হলে নিয়ন্ত্রক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গ্রাহকের অর্থ ফেরতের পথ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকে দরিদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও অনুসরণযোগ্য অভিযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আইন ও তদারকিঃ- ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য বিধি, নির্দেশনা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতারণা, আত্মসাৎ, জালিয়াতি বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ফৌজদারি আইনও প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সব ঘটনায় একই ধারা প্রযোজ্য নয়; অর্থ কীভাবে নেওয়া হয়েছে, লেনদেন ব্যাংকের ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং কী প্রমাণ রয়েছে—এসবের ওপর আইনি অবস্থান নির্ভর করবে।
শেষ কথাঃ- এজেন্ট ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এর সাফল্য শুধু আউটলেট বা লেনদেনের সংখ্যা দিয়ে নয়; সাধারণ মানুষের আমানত কতটা নিরাপদ, সেটিই প্রকৃত মাপকাঠি।

বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর নজরদারি, ব্যাংককে শক্তিশালী নিরীক্ষা ও দ্রুত প্রতিকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গ্রাহকদের যাচাইযোগ্য রসিদ সংরক্ষণ ও সন্দেহজনক লেনদেনে দ্রুত অভিযোগ করার অভ্যাস নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কোনো এজেন্টের ব্যক্তিগত পুঁজি নয়। এটি পরিবারের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের আশ্রয়। আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সাফল্য শেষ পর্যন্ত আস্থার সংকটে পরিণত হবে।

 

লেখক: অ্যাডভোকেট ইউসুফ আরমান, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কক্সবাজার