– আকতার চৌধুরী

আজ ৭ নভেম্বর। মহান জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস।  ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল।  আজ সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ৫১তম বার্ষিকী।  বিপ্লব ও সংহতির অনন্য দৃষ্টান্ত এই ৭ নভেম্বরকে বর্তমান প্রজন্ম কোন দৃষ্টিতে দেখছে এবং এ সম্পর্কে কতটুকু জানে, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতার আড়াই মাস যেতে না যেতেই ৩ নভেম্বর তৎকালীন সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর মাধ্যমে খন্দকার মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত হন এবং প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অন্তরীণ করা হয়।

সেনাবাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অন্তরীণ করায় সেনানিবাসে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড গভীর সংকটের মুখে পড়ে। সৈনিকেরা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে স্লোগান দিতে থাকেন। ইতিপূর্বে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে সাধারণ মানুষের কাছেও জিয়াউর রহমান অপরিচিত কেউ ছিলেন না। ফলে সৈনিকদের আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করে। জিয়াকে অন্তরীণ অবস্থা থেকে মুক্ত করার দাবিতে রাজপথে গড়ে ওঠে এক অভূতপূর্ব ঐক্য। এই ঐক্যের মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয় ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান এবং জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনা হয়।

বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রসঙ্গ এলেই আরও একজন ব্যক্তির নাম অবধারিতভাবে সামনে আসে। তিনি হলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহের। সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালেই তিনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। বলা যায়, তিনি ছিলেন কার্ল মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের অনুসারী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বৈষম্যমূলক আচরণে ক্ষুব্ধ কর্নেল তাহের স্বাধীন বাংলাদেশে ১২ দফা দাবিভিত্তিক একটি বিপ্লবের পটভূমি রচনায় সচেষ্ট ছিলেন। সে লক্ষ্যেই ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর জাসদ ও গণবাহিনীর মাধ্যমে তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুরু করেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করতে গিয়ে জাসদের অসংখ্য নেতা-কর্মী রক্ষীবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হন, প্রাণ হারান কিংবা কারাবরণ করেন। এতে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হলেও তিনি তাঁর লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থবে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর বৈপ্লবিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তাধারা তাহেরের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিকল্পনার সঙ্গে এক ছিল না।

বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কাছে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আগমনের ইতিহাসকে বিভিন্নভাবে বিকৃত ও কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এটাই সত্য যে, জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে দেশের ক্ষমতায় আসীন হননি। জাতির দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি যেমন বিপন্ন জাতিকে সাহস জুগিয়েছিলেন, তেমনি ১৯৭৫ সালের সংকটময় পরিস্থিতিতেও দেশের প্রয়োজনে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন বিশ্বস্ত দেশপ্রেমিক হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটলেও ৭ নভেম্বরের বিপ্লবীরা সেই পরিবর্তনে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁদের সামনে ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা। আমার বিবেচনায়, ৭ নভেম্বরের এই বিপ্লব না ঘটলে বাংলাদেশ আরও গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারত। আমাদের ইতিহাসে পলাশীর ট্র্যাজেডি একটি বড় শিক্ষা। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বাঙালি জাতিকে প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকতে হয়েছিল। সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জাতীয় ঐক্য ও সংহতির অভাব একটি জাতির জন্য কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বিশ্ব ইতিহাসে বিপ্লবের সঙ্গে সিপাহী ও সাধারণ মানুষের এমন সংহতি গড়ে ওঠার দৃষ্টান্ত বিরল। এ কারণে ৭ নভেম্বর আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই দিন আমাদের শুধু বিপ্লবের প্রেরণাই দেয়নি, বরং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির নতুন উপলব্ধিও তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার বিকাশের পথ তৈরি হয়েছিল।

নবপ্রজন্মের কাছে ৭ নভেম্বরের ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি

এমন একটি গৌরবোজ্জ্বল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়কে জাতীয় ইতিহাসে যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অতীতে জাতীয় উদ্যোগের অভাব আমরা দেখেছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তক ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ধারণা লাভ করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ও উপলব্ধি কতটুকু? বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে আরও সচেতন করা সময়ের দাবি।

এ ক্ষেত্রে আশার কথা, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং তাঁর লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ প্রবন্ধও পাঠ্যবইয়ে স্থান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো জানার সুযোগ করে দেবে। দীর্ঘদিনের ইতিহাসচর্চার পরিসরে এটি একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। তবে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের এই সংযোজন যেন কোনো দলীয় বয়ান বা একপাক্ষিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং প্রামাণ্য দলিল, গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

আমার মতে, শুধু পাঠ্যপুস্তকে কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, ইতিহাসভিত্তিক বিতর্ক ও পাঠচক্রের আয়োজন করতে হবে। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও মুক্ত আলোচনা চালু করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে হবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান, ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাস।

তরুণদের জানতে হবে, কীভাবে স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আদর্শিক সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছিল। একই সঙ্গে জানতে হবে, এই সংকটের মধ্য দিয়ে কীভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকাশ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দর্শনের সূচনা ও বিস্তার ঘটেছিল।

আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম শুধু ৭ নভেম্বরের নাম জানবে না; জানবে এর পটভূমি, তাৎপর্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, রাজনৈতিক দর্শন এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে তাদের জানার, প্রশ্ন করার এবং যুক্তির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার সুযোগ দিতে হবে।

কারণ, ইতিহাসকে আড়াল করে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। আর ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ চর্চাই পারে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয় পরিচয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের বোধ জাগ্রত করতে।

এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ হাজার বছর। যে পথে আলো দেখাবেন একজন মেজর জিয়া, একজন রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

আমরা মহান বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনার কথা বলি, অথচ এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না এর প্রকৃত চেতনা কী! ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো ৭ নভেম্বরের ইতিহাসও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় বিপ্লবের চেতনা একসময় বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। আমি মনে করি, ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্যের ঘটনা এবং এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা কোনো কঠিন কাজ নয়।

তাই এখনই সময়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে সত্য, তথ্য ও গবেষণানির্ভর একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে দেওয়ার।