ইমরানুল হোছাইন :
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো তৈরি পোশাক শিল্প বা RMG Sector। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১.৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। অর্থাৎ বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে ১০০ ডলার আয় করে, তার প্রায় ৮১.৫ ডলারই আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল অর্জনের পেছনে যাঁদের সবচেয়ে বড় অবদান, তাঁদের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে?
তাঁরা হলেন আমাদের পোশাকশ্রমিক। তাঁদের প্রতিটি নিডেলের ফোঁড়, প্রতিটি বিন্দু ঘাম আর নিরলস পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি। তাঁদের শ্রমেই তৈরি হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের পোশাক, সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, একজন পোশাকশ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি মাত্র ১২,৫০০ টাকা!
একবার ভাবুন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে একজন শ্রমিক মাস শেষে হাতে পান মাত্র ১২,৫০০ টাকা। এই সামান্য অর্থে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের জীবনযাপন কি আদৌ সম্ভব?
যেখানে একটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ২,৫০০ টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য খরচ। তাহলে একজন শ্রমিক কীভাবে এই আয়ে তাঁর পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করবেন?
অন্যদিকে, সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারী বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতাসহ মাসে প্রায় ৩০,৫০০ টাকা পেয়ে থাকেন (প্রযোজ্য ভাতা ও হিসাবভেদে)।
প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁদের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানি অর্থনীতি, সেই পোশাকশ্রমিকদের জীবন ও শ্রমের মূল্য কি এতটাই কম?
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির কথা উঠলেই নানা অজুহাত, নানা হিসাব-নিকাশ, নানা যুক্তি সামনে চলে আসে। অথচ তাঁদের শ্রম ছাড়া এই বিশাল রপ্তানি আয়ের চাকা সচল রাখা সম্ভব নয়।
আমার স্পষ্ট অবস্থান—
আমি পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণের পক্ষে।
আমি মনে করি, এটি কোনো দয়া বা অনুদান নয়; বরং একজন শ্রমিকের শ্রম, মর্যাদা ও জীবনধারণের অধিকারের ন্যায্য স্বীকৃতি।
যে শ্রমিকের ঘামে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে, সেই শ্রমিকের পরিবারও যেন সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে।
অবিলম্বে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা হোক।
কারণ, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি তখনই প্রকৃত অর্থে অর্থবহ হবে, যখন সেই প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকের ঘরেও পৌঁছাবে।
শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে।

ইমরানুল হোছাইন
০২.১১.২৬