মো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান) :

লামা উপজেলায় প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে সরকারি বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্যের তালিকা থেকে ৫টি স্বনামধন্য বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ দিয়ে অন্য ৮টি প্রতিষ্ঠান অর্ন্তভূক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদ কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক উঃ নন্দমালা থের এ অভিযোগ করেন।
১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে লামা উপজেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় প্রবারণা পূর্নিমা উপলক্ষে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জন্য ৭৯ টি বৌদ্ধ বিহার সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হত। কিন্তু চলতি বছর বরাদ্দ তালিকা থেকে ৫টি বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ দিয়ে অন্য ৮ প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাদ পড়া বৌদ্ধ বিহারগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইয়াংছা বড় পাড়া বৌদ্ধ বিহার, ইয়াংছা হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার, ইয়াংছা নামা পাড়া বৌদ্ধ বিহার,
কৃপাশরণ ও নন্দমালা বৌদ্ধ বিহার ও জীনামেজ অনাথ আশ্রম বৌদ্ধ বিহার।
অন্যদিকে যে ৮টি যুক্ত করা হয়েছে সেগুলো হলো- লুলাইং নয়া পাড়া ক্রামা বিহার, নয়া আলক পাড়া ক্রামা বিহার, আলক পাড়া ক্রামা বিহার, ময়ূর পাড়া ক্রামা বিহার, চংকক পাড়া ক্রামা বিহার, ডলা পাড়া ক্রামা বিহার, বোচা পাড়া ক্রামা বিহার, মংয়াং পাড়া ক্রামা বিহার।
পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদ কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক উঃ নন্দমালা থের অভিযোগ করে জানান, ‘প্রবারণা পূর্নিমা বৌদ্ধ ধর্মীয় অন্যতম একটি অনুষ্ঠান।’ ‘ক্রামা নামের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকতেই পারে, তবে বৌদ্ধ ধর্মীয় বিহারের তালিকার সাথে অন্য কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকা থাকতে পারে না। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে ক্রামা ধর্মের কোনো ধরণে সামঞ্জস্যতাও নেই। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে একই সাথে অন্য কোনো ধর্মের আচার অনুষ্ঠান কোনো দিন হয় নাই এবং হবেও না।’ তিনি আরো জানান, ‘ক্রামা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হয়ে থাকলে সেটি আলাদা কোনো সময় ও আলাদা তালিকা এবং সরকারী বরাদ্দ থাকতে পারে। সুতরাং উল্লেখিত ৮ টি ক্রামা বিহারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে, বাদ পড়া ৫টি বৌদ্ধ বিহারের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করছি।’
তিনি দাবি করেন- ‘প্রবারণা উৎসবে যেসব বৌদ্ধ বিহারের নামে সরকারি বরাদ্দ আসবে বা এসেছে, সেসব বিহারের তালিকায় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের নাম, মোবাইল নং, বিহারের ঠিকানা উল্লেখ থাকতে হবে। এর পর উপজেলা ত্রাণ শাখা অথবা সমাজ সেব বিভাগে লোকদ্বারা তদন্ত করে খাদ্যশস্য বিতরণ করা হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদ কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদিত লামা উপজেলাস্থ ছাগলখাইয়া বৌদ্ধ বিহারে অস্থায়ী কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে এতদ বিষয়ে সহায়তা নিতে পারবেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা জানায়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রবারণা পূর্নিমা, সাংরাই উৎসবে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা বিহীন মনগড়া তালিকা দিয়ে বরাদ্দ এনে ভাগভাটোয়ারা করা হতো। কতিপয় ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে এখনো সেরকম করার চেষ্টা করছেন।
লামা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইনু অং চৌধুরী বলেন, ‘যেকোনো কেউ ধর্মীয় কিংবা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকা দিলে, সেটি কর্তৃপক্ষ যাচাই করা উচিত। একটি নির্দিষ্ট ছক পূরন করে তালিকা হবে, এর পর ত্রানশাখা সেটি তদন্ত করে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘এসব নিয়ম অনু স্মরণ না করে তালিকা পাঠানো উচিত নয়। জিনামেজু অনাথ আশ্রম বৌদ্ধ বিহারের মতন একটি বৃহত প্রতিষ্ঠানের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি অত্যান্ত লজ্জাকর ও দুঃখজনক। হাল বিতর্কিত তালিকা ভালো করে যাচাই করে বাদ পড়া বৌদ্ধ বিহাগুলোর নাম অন্তর্ভুক্তি করার দাবি জানান থোয়াইনু অং চৌধুরী।
এই তালিকা কারা করেছে জানতে চাইলে লামা উপজেলা ত্রানশাখা থেকে জানানো হয়, বিগত প্রায় তিন মাস আগে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সচিবরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের যে তালিকা জমা দিয়েছেন, সেই তালিকাটিই আমরা ধর্ম মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়েছি। এ নিয়ে অভিযোগ থাকলে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হয়, সেটা মেনে কর্মকান্ড চালানো হবে।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে জীনামেজু অনাথ আশ্রম সহ উল্লেখযোগ্য ৫টি বৌদ্ধ বিহারের নাম সরকারি সহায়তা তালিকা থেকে বাদ দেয়ার কারণ জানতে ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিনের কাছে জানতে তার মুঠোফোনে কল করে সংযোগ না পাওয়ায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয় নাই।
এই ব্যপারে লামা উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত আলীকদম নির্বাহী অফিসার মনজুর আলম এর সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার কাছে অভিযোগ আকারে এসেছে। বিগত বছরগুলোর তালিকা যাচাই করে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানানো হবে। তিঁনি যে সিদ্ধান্ত দিবেন, সেইমতে কার্যক্রম করা হবে।’