– রাশেদ মোহাম্মদ আলী
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, একাধিক সামরিক ক্যু, অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সংঘটিত এই দিনের ঘটনা প্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সারাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ওই দিনই বাংলাদেশ তার নিজের চলার পথ খোঁজে নেয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের ইশারায় ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যা শুরু হয়েছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটে ৭ নভেম্বর।
৩ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ঘটনা প্রবাহের মূল চরিত্র তিনজন। সামরিক কর্মকর্তা ক্ষণস্থায়ী সেনা প্রধান খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। কিন্তু ৭ নভেম্বর এসে সিপাহী ও জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমানই হয়ে উঠেছিলেন মূল নায়ক। ষড়যন্ত্রের দায় নিয়ে ছিটকে গেলেন খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল আবু তাহের।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এক দলীয় বাকশালি ফ্যাসিবাদী শাসনের কবলে জাতি যখন নানা ধারার বিভাজিত তখনই জাতি গঠনে ঐক্যের ডাক নিয়ে রাজনীতির মঞ্চে হাজির হন জিয়াউর রহমান।
৭ নভেম্বর ছিল সিপাহি-জনতার ঐক্য, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় সংহতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ওই সময়ের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, জাসদের এককভাবে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার ক্ষমতা ছিল না। ফলে জাসদ বা কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানের ওপর ভর করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন।
স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে জিয়াউর রহমানের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। ৭ নভেম্বরের ঘটনা প্রবাহের শেষ সমীকরণে জিয়াউর রহমানকে সামনে নিয়ে আসে সিপাহী-জনতা। এক পর্যায়ে সব কিছুই জিয়াউর রহমানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জিয়াউর রহমানের গ্রহণযোগ্যতার কাছে কর্নেল তাহের আর টিকতে পারেননি। ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে জাসদের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
এরপরই শহীদ #জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন। প্রথমেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দেন। বাকশালের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত উদার বাজার ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যান। অর্থনীতির দুয়ার তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ করে দেন।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জিয়াউর রহমান রাজনীতিকেও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। জিয়াউর রহমানের আমলেই বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ নিজ নামে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়।
একই ভাবে অন্যান্য দলের সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতি ফেরা শুরু করে। জিয়াউর রহমান যুদ্ধত্তোরকালে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। তিনি রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দেশের কল্যাণে সবাইকে নিয়োজিত করতে চেয়েছিলেন। উনি বুঝতে পেরেছিলেন, জাতীয় ঐক্য ছাড়া দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
দেশের রাজনীতির ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক ঐক্যের প্রতীক। আর সেই ঐক্যের মহানায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির মূল দর্শন হচ্ছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার এবং জাতীয় ঐক্য। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও দেশপ্রেমের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।
জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত। তিনি রণাঙ্গনে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমনের মুখে হতবিহ্বল জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছেন। সেই সাহসের ওপর ভর করেই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর দেশের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
ফলে দেখাই যাচ্ছে, স্বাধীন ও স্বনির্ভর দেশ গঠনের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ৭ নভেম্বর বিপ্লবের হাত ধরে। ১৯৭১ সালের পর সারা দেশের মানুষ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ৭ নভেম্বর।
একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করার অর্থ শুধু অতীতের ইতিহাস স্মরণ করা নয়; বরং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
আমি বিশ্বাস করি, বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি এদেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ঠিকানা। উদার গণতান্ত্রিক এই দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, গণমুখী, দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তা’ সম্ভব।
৭ নভেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আসুন, বিভেদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হই।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
শহীদ জিয়া অমর হোক। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
রাশেদ মোহাম্মদ আলী
সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মী,
সদস্য, কক্সবাজার জেলা বিএনপি।
