মো. এমরান, লামা:
বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দুর্গম সাঙ্গু মৌজায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ম্রো সম্প্রদায়ের শতাধিক শিশু। নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ৭–৮ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের। এতে রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ অন্তত পাঁচটি ম্রোপাড়ার অনেক শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাঙ্গু মৌজার রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছেন। এসব এলাকার শিশুদের জন্য কাছাকাছি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ৭–৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পাহাড়ি ছড়া, নদী ও উঁচু-নিচু দুর্গম পথ পেরিয়ে এত দূরে গিয়ে ছোট শিশুদের পক্ষে নিয়মিত ক্লাস করা কঠিন। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়ার পানি বৃদ্ধি, তীব্র স্রোত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিদ্যালয়ের অভাবে এসব পাড়ার অনেক শিশুই বর্ণমালা শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে জুমচাষসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছে তাদের কেউ কেউ। ফলে শৈশবেই শিক্ষার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে এসব শিশু।
তবে রোয়াজাপাড়ায় ব্যক্তি উদ্যোগে ‘সিংমং’ নামে এক ব্যক্তি একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে দুজন শিক্ষক ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে আলীকদম জোনের সহায়তায় গয়ালমারা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মৈত্রী স্কুল’। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, এসব উদ্যোগের পরও রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ আশপাশের পাঁচটি ম্রোপাড়ার সব শিশুর জন্য পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় অভিভাবকেরা বলেন, অন্যান্য এলাকার শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করছে। অথচ দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তাঁদের সন্তানদের অনেকেই বর্ণমালাও শিখতে পারছে না। তাঁরা এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানান, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-৩ শাখার একটি প্রতিবেদনে সাঙ্গু মৌজায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য চাহিদাভিত্তিক নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে মতামত চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রোয়াজাপাড়াটি রেংলেপাড়া, মেনক্রুংপাড়া, রেংছমপাড়া ও মাংখাইকপাড়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জমির সংস্থানও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাঙ্গু মৌজার হেডম্যান চংপাত ম্রো বলেন, “সাঙ্গু মৌজার রোয়াজাপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমি প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কাছে সুপারিশ ও প্রত্যয়ন দিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখতে পাইনি।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে সাঙ্গু মৌজার ম্রো জনগোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। এসব শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন অথবা বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। তাই সাঙ্গু মৌজার রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ আশপাশের পাড়াগুলোর শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
