সিবিএন ডেস্ক:
বাবু রাজ বিহারী দাস ২ ফেব্রুয়ারী জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় চমৎকার একটি বক্তব্য রেখেছেন। জামায়াতে ইসলামীর মত একটা অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সমাবেশে তিনি কোন রাজনৈতিক নেতা বা দল-মতের পক্ষ হয়ে বক্তব্য রাখেননি। সেখানে তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসাবে একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। উপরোন্ত তিনি কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র এবং চারবার সফল নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
মূলত আমিরে জামায়াতের জনসভায়, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, পেশাজীবী ও বিশিষ্ট অনেক ব্যাক্তিদের দাওয়াত প্রদান করা হয়েছিল। ব্যাক্তিগত ভাবে আমি জেলা পূজা উৎযাপন কমিটির সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সাথে যোগাযোগ করি, তিনি ঢাকা অবস্থান করার কারনে সমাবেশে আসতে পারেননি। কক্সবাজার অবস্থান করলে তিনিও হয়তো আমিরে জামায়াতে সমাবেশে বক্তব্য রাখতেন। এছাড়া দাওয়াত প্রদান করি রাখাইন সম্প্রদায়ে বিশিষ্ট ব্যাক্তি মম রাখাইন কেও।
জামায়াতের সমাবেশে রাস বিহারী ভাইয়ের বক্তব্য দেওয়া নিয়ে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, অনেকে তার চরিত্র হননের জন্যও উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু যারা এসব করছেন তাদের অনেকে হয়তো এটা জানেন না, বিগত ২০ বছরে যে তিনি চার চারবার ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিবাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তার পিছনে এলাকার সাধারন মানুষের ভোটের পাশাপাশি ৮নং ওয়ার্ড জামায়াতে ভোটার এবং পারিবারিক ভাবে আমার পিতা ও পরিবারের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বাবু রাস বিহারী দাস আমার নিকটতম প্রতিবেশী, আমার বাড়ির পিছনের দক্ষিন সীমানায় তার বাড়ি। এছাড়া পূর্ব-পশ্চিম অপর দুই পাশে বেশকিছু রাখাইন পরিবার। আমরা প্রায় ৫০ বছর যাবত একই সীমানায় শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে আসছি। আমার মনে আছে সে সময়, এখনকার মত প্রতিবেশী বাড়ির সাথে কোন সীমানা দেয়াল থাকতো না, থাকতে কিছু গাছপালা বা হালকা বেড়া। ছেলে বেলায় আমরা হিন্দু/বোদ্ধ(রাখাইন) উভয় প্রতিবেশীদের উঠোনে খেলতাম, বেড়াতাম, খাওয়া-দাওয়া করতাম, বিয়ে-শাদী বা অনুষ্ঠানে আমরা ছিলাম একটা পরিবারের মতই। আমার মরহুম পিতা এডভোকেট ছালামতুল্লাহ সাহেবের উপস্থিতি ছাড়া আমাদের আশে পাশের হিন্দু-বৌদ্ধদের কোন অনুষ্ঠানই হতো না। আমি অনেক সময় দেখেছি বিপদে-আপদে, ভাল-মন্দে আমার পিতা সব সময় তাদের পাশে দাড়াতেন, কতিপয় জালিম মুসলিম পরিবারের বিরুদ্ধে মজলুম এই হিন্দু-বৌদ্ধ পরিবারের পাশে দাড়িয়েছেন, দিয়েছেন প্রশাসনিক ও আইনী সহায়তা। ঠিক তেমনি ভাবে রাস বিহারী ভাই যখন প্রথমবার পৌর কাউন্সিলন নির্বাচন করেছিলেন তখন আমার পিতা সরাসরি, রাস বিহারী ভাইয়ের পক্ষে প্রচার প্রচারনার কাজ করেছেন এবং ভোটও দিয়েছেন। তার পক্ষে কাজ করা নিয়ে বাঁকা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলতেন, ”রাস বিহারী আমার প্রতিবেশী, আমার উপর তার হক আছে। বিপরীত প্রার্থীর চেয়ে সে অনেক সৎ ও ভাল মানুষ”। তখন থেকেই চারবার কাউন্সিলন নির্বাচনে আমরা রাসবিহারীকেই ভোট দিয়েছি, কারণ অন্য প্রার্থীরা মুসলিম ছিলো কিন্তু ভাল মানুষ ছিলোনা! ছিলো সন্ত্রাসী, দাগী মদ ও ইয়াবা ব্যাবসায়ী।
সত্যিকার অর্থে রাস বিহারী ভাই একজন সৎ, সহজ-সরল উপকারী মানুষ। ওয়ার্ডের শুধু সাধারন হিন্দুরা নয়, বিশাল অংকের মুসলিম এবং রাখাইন জনগোষ্ঠী তাকে অত্যন্ত ভালবাসেন। আমার মনে হয় আগামী কাউন্সিলর নির্বাচনেও তিনি আবার নির্বাচিত হবেন।
কথা প্রসঙ্গে জুলাই বিপ্লবের পরের কিছু ঘটনা কক্সবাজার বাসীকে জানানো দরকার। ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর পরই, দুপুর ২ টা থেকে আমি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ শুরু করি, এটা আমার পিতার কাছ থেকে শেখা, কারন দেশের রাজনৈতিক এই পটপরিবর্তনের পর কিছু স¦ার্থন্বেষী পক্ষ সাপ্্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। সেদিন আমি জেলা পূজা উৎযাপন কমিটির বর্তমান সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু, বেন্টু দাস ও রাস বিহরী ভাইয়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ করি এবং যে কোন সমস্যায় তাদের পাশে থাকার কথা বলি। একই রাতে আমি জামায়াতের সাথে একটি সম্প্রতি সমাবেশের আয়োজনের পরামর্শ দিলে পরদিন ৬ আগষ্ট কৃষ্ণধাম মন্দিরে একটি সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে একটা বড় অংকের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও সাধারন মানুষ উপস্থিত হন।
রাস বিহারী ভাইকে নিয়ে একটি পক্ষের বিরোধীতার প্রেক্ষাপটে, আরেকটি দুঃখজনক ঘটনার কথা কক্সবাজারবাসীকে না জানালেই নয়। রাস বিহারী ভাই দীর্ঘদিন যাবত ঈদের জামায়াতের সামিয়ানার কাজ করতেন। গত বছরও তিনি পৌরসভায় ঈদের নামাজের সামিয়ানার টেন্ডারের সিডিউল সংগ্রহ করলে, একটি রাজনৈতিক দলের নেতারা উনাকে চাপ প্রয়োগ করে দরপত্রটি নিয়ে নেন। পরে কর্তৃপক্ষ কাজটি পুনঃদরপত্রের আহবান করলে, রাসবিহারী ভাই আমার নামে তার দরপত্রটি নিতে আনুরোধ করলে আমি রাজি না হয়ে, তাকে সার্বিক সহয়োগীতার আশ^াস দিই। এবারো তিনি দরপত্র দাখিল করতে ব্যার্থ হন, কারণ একটি দলের নেতা-কর্মীরা পৌরসভা ঘেরাও করে কাউকে টেন্ডার ফেলতে দিচ্ছিলো না। বিষয়টা রাস বিহারী ভাই আমার সাথে দেখা করে জানালে আমি বিএনপি সংসদ সদস্য প্রার্থী কাজল ভাইকে জানাতে বললে তিনি আমার সামনে কাজল ভাইকে ফোন দেন। বলেন ”তার দলের এই এই নামের নেতারা তাকে টেন্ডার ফেলতে দিচ্ছেনা”। কাজল ভাই রাসবিহারী ভাইকে বলেন, ”আপনি টেন্ডার ফেলেন আমি তাদের বলে দিচ্ছি”। কিন্তু এর পরেও রাসবিহারী ভাইকে সেদিন ঈদের নামাজের সামিয়ানার টেন্ডার ফেলতে দেওয়া হয়নি, সম্ভবত কাজল ভাই তার নেতা-কর্মীদের বলেনও নিই বা প্রয়োজন বোধ করেননি। না হয় সেবার পৌরসভায় ঈদের নামাজের সামিয়ানা নিয়ে, এভাবে প্রকাশ্যে টেন্ডারবাজী হতো না!!!
রাস বিহারী ভাই কতটুকু আওয়ামীলীগ করতো সেটা আমি জানিনা, একটা পদ হয়তো ছিল আর কাউন্সিলর হিবাবে সাবেক দুই মেয়রের সাথে কিছু ফটোসেশন তিনি করেছেন বটে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ৫ আগষ্টের পর সর্বপ্রথম তিনি ঐ গোলচত্বর মুক্তিযোদ্ধা মাঠেই বিএনপির সমাবেশে বক্তব্য দেন। আর বিএনপির সমাবেশে বক্তব্য দিলে দোসর থাকেনা, পাপ হয়না। আর জামায়াতের সমাবেশে প্রতিনিধিত্ব করলে দোসর হয়, পাপ হয়!
এ কেমন বিচার?
এই বিচার আমি কক্সবাজারবাসীকেই দিলাম।
–শহর জামায়াতের সেক্রেটারি রিয়াজ মুহাম্মদ শাকিল এর ফেসবুক ওয়াল থেকে।
