শাহপরীরদ্বীপে বিএনপির দুর্দিনের এক পরিবারের গল্প

বিএনপি করতে গিয়ে সরকারি চাকুরি বঞ্চিত, যুবদলের নেতৃত্বে আসতে চান নুরুল আমিন আশিক

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৩৯ , আপডেট: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৪৩

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


নিজস্ব প্রতিবেদক, টেকনাফ

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই দ্বীপে বিএনপির রাজনীতি যখন কঠিন সময় পার করেছে, তখন দলটির পাশে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারের মধ্যে অন্যতম ছিল ডাংগর পাড়ার মরহুম আবদুল মোতালেবের পরিবার। দ্বীপে বিএনপির সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল তাঁর বাড়ি। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটির প্রতি আনুগত্য ধরে রেখেছে পরিবারটি। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বুকে ধারণ করেই বেড়ে উঠেছেন তাঁর ছেলে নুরুল আমিন আশিক।

পরিবারের অভিযোগ, বিগত ১৭ বছরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাঁরা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি আশিকের। তাঁর ছোট ভাই হেলাল উদ্দিনও দুবার পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এবং সার্জেন্ট নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি পাননি।

চাকরির স্বপ্ন পূরণ না হলেও বিএনপির রাজনীতি থেকে সরে যাননি তাঁরা। বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এবার শাহপরীরদ্বীপ সাংগঠনিক ইউনিয়ন যুবদলের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন নুরুল আমিন আশিক। তাঁর সমর্থকদের প্রত্যাশা, দলের দুর্দিনে পাশে থাকা এই পরিবারকে এবার সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করবেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

বাবার মুখে জিয়াউর রহমানের গল্প শুনে রাজনীতিতে ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের গল্প শুনে বড় হয়েছেন নুরুল আমিন আশিক। সেই আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ২০০৮ সালে ছাত্রদলের সদস্য হন তিনি। পরে স্কুল কমিটির দায়িত্ব পালনের পর দীর্ঘদিন শাহপরীরদ্বীপ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতির পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যান নুরুল আমিন আশিক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৩৮তম ও ৩৯ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পাননি তিনি। সমাজসেবা কর্মকর্তা পদে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তরের চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সেসব চাকরিতেও যোগ দিতে পারেননি এবং সাউথ ইস্ট ব্যাংকে চাকরি পেয়ে ১৭ মাসের মাথায় চাকুরিচ্যুত হন।

নুরুল আমিনের অভিযোগ, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে।

জানা যায়, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় শাহপরীরদ্বীপ ডাংগরপাড়া কেন্দ্রে বিএনপির পক্ষে নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন নুরুল আমিন আশিক। তাঁর অভিযোগ, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতাকর্মীদের মারধর ও ভোট কারচুপির অভিযোগের মধ্যে তিনি হামলার শিকার হন এবং তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তখন ইসমাইল মেম্বার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বাকিরা শাহপরীরদ্বীপ ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যান। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে মনে করেন আশিকের সমর্থকেরা।

নুরুল আমিন আশিক বলেন, “বিএনপি আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। ছোটবেলা থেকে এই দলের আদর্শ ধারণ করে বড় হয়েছি। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও শুধু বিএনপির পরিবারের সন্তান হওয়ায় চাকরি পাইনি । আমার ছোট ভাই হেলাল উদ্দিনও দুবার পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি পায়নি। আরও কয়েকটি চাকরির ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছি । বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করার পর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে চাকরিচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে শাহপরীরদ্বীপে বিএনপির যেকোনো নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে আমরা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছি।গেল সাংসদ নির্বাচনে নিজের কেন্দ্রেও ধানের শীষের পক্ষে ব্যাপক ভোট পেয়েছি। এত প্রতিকূলতার পরও আমরা দল ছেড়ে যাইনি। এখন বিএনপি সরকারে থাকায় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর নেতৃত্বে জনগণের জন্য কাজ করে যেতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, দলের জন্য দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদান বিবেচনায় নিয়ে নেতারা আমাদের মূল্যায়ন করবেন।

বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখেছেন সন্তানেরা

শাহপরীরদ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা কাদের হোসেন বলেন, “শাহজাহান চৌধুরী সংসদ সদস্য থাকাকালে আস্ত ডাংগরপাড়ায় মরহুম আবদুল মোতালেবের বাড়িতে এসে পরামর্শ করতেন। আবদুল মোতালেব আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর ছেলেরা বাবার রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শ ধরে রেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বিএনপির সঙ্গে আছেন। তাঁদের পরিবার যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “আবদুল মোতালেবের দুই ছেলে লেখাপড়া করেও সরকারি চাকরি পাননি বলে তাঁদের অভিযোগ। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি তাঁরা বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তাহলে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা। তাঁদের একজনকে সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হলে তা হবে পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

ত্যাগের স্বীকৃতি চান তরুণ নেতাকর্মীরা

শাহপরীরদ্বীপের ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, নুরুল আমিন আশিক ও তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁরা দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তাই আসন্ন সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে আশিককে নির্বাচিত করার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক ত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

তাঁদের মতে, একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু ক্ষমতায় থাকার সময়ের কর্মীদের দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং প্রতিকূল সময়ে যারা দলের পাশে থাকেন, তাঁদের অবদানও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ছাত্র নেতা ইব্রাহিম নূরী বলেন,যে পরিবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বছরের পর বছর চাকরিবঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে জীবন কাটিয়েছে, সেই পরিবারের সন্তানদের যদি দলের দুঃসময়ের ত্যাগের জন্যও মূল্যায়ন করা না হয়, তাহলে তা হতাশাজনক হবে। নুরুল আমিন আশিককে শাহপরীরদ্বীপ সাংগঠনিক ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক করা হলে তাঁর পরিবার যেমন সম্মানিত হবে, তেমনি দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীরাও উৎসাহিত হবেন।

এখন সিদ্ধান্ত দলের নেতাদের হাতে

নুরুল আমিন আশিকের সামনে এখন নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার বেদনা, পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলা এবং সংগঠনের প্রতি আনুগত্য-

সবকিছু নিয়েই তিনি যুবদলের নেতৃত্বে আসতে চান।