কক্সবাজারে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের আমির

১২ জানুয়ারি দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিবাদকে লাল কার্ড দেখাবে জনগণ

প্রকাশ: ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৬:২৬ , আপডেট: ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৬:২৯

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


# এই নির্বাচন ৫৪ বছরের বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনার নির্বাচন
# ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে সবখানেই ইনসাফ কায়েম হবে

ইমাম খাইর, সিবিএন:
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ বা ২০২৪ এর নির্বাচন নয়। এই নির্বাচন অতীতের ৫৪ বছরে যে
রাজনীতি ফ্যাসিবাদ তৈরি করেছে, সেই বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনার নির্বাচন।
এ নির্বাচন দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিবাদকে লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন। জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা পূরণের নির্বাচন। যারা জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে না; সংস্কার চায় না, তাদেরকেও লাল কার্ড দেখাবে জনগণ। ১৩ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) থেকে নতুন একটি বাংলাদেশ পাবে জনগণ।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজার পৌর শহরের বাহারছড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা (গোল চত্বর) মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন।

বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের কারণে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। উপকারকারীদের নিয়ে উপহাস করেন কেন? এটি আপনাদের জন্য বুমেরাং হবে।

অপপ্রচারের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলায় গোপনে আমার পেছনে লাগা হয়েছে। পেছনের লোকেরা পেছনে পড়ে থাকবে, আমরা ক্ষমতায় গেলে নারীদের মাথার ওপর তুলে মর্যাদা দিয়ে রাখা হবে।

তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে সবখানেই ইনসাফ কায়েম করা হবে। ন্যায় প্রতিষ্ঠাই হবে আমাদের মূল কাজ। সবকিছু ক্ষমা করা হলেও জুলাই হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। আবু সাঈদ, আবরার ফাহাদদের হত্যাকারীদের কোন ছাড় দেওয়া হবে না। হাদির ঘাতকদের প্রতি কোন মায়া-দয়া নাই। তবে পাইকারি বিচার হবে না। কেউ তাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হলে বিবেচনা করা হবে।

জেলা জামায়াতের আমির ও কক্সবাজার-৩ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এমপি প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারীর সভাপতিত্বে জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‌‘১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন বাংলাদেশ পাবে দেশবাসী। আমরা সরকার গঠনের সুযোগ পেলে নারীদের মাস্টার্স পর্যন্ত ফ্রি পড়ালেখার সুব্যবস্থা করা হবে। ইনসাফের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠাই হবে আমাদের মূল কাজ।’

হেভিওয়েট ১২ তারিখ মাপা হয়ে যাবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কক্সবাজারের অনেক আসনে নাকি হেভিওয়েট প্রার্থী আছে। তারা আমাদের প্রার্থীকে ভয় দেখাচ্ছে। আমাদের দাঁড়িপাল্লায় রায় দিয়ে তাদের ওয়েট মাপবে জনগণ।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধাদের দাবি ছিল কাজ, বেকার ভাতা নয়। শিক্ষিত যুবকদের হাতে কাজ তুলে দিয়ে বলবো, এবার এগিয়ে যাও। কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করো তুমিই বাংলাদেশ।

কক্সবাজার কেন সিঙ্গাপুর ও সাংহাই হতে পারলো না—এমন প্রশ্ন রেখে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কক্সবাজারের চারটি আসন ১১ দলকে তুলে দিলে একটি সুশৃঙ্খল পর্যটন জেলা উপহার দেওয়া হবে।’

নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে কক্সবাজার পৌর শহরের বাহারছড়ায় মুক্তিযোদ্ধা (গোলচত্বর) মাঠে সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় জোট। সকালে মহেশখালীর জনসভা শেষে দুপুর ১টা ৫ মিনিটে কক্সবাজারের জনসভায় আসেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

এর আগে, সকাল ১০টায় শুরু হয় সমাবেশে কার্যক্রম। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই কক্সবাজার সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা দলে দলে সমাবেশস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন। মাঠে দলীয় ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

সমাবেশে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের আব্দুল্লাহ আল ফারুখ, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের শহিদুল আলম বাহাদুর ও কক্সবাজার-৩ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এমপি প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারীর হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়ে জনগণের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন আমিরে জামায়াত।

দেশ পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাজার ছেলে রাজা হোক—এই মতবাদে আমরা বিশ্বাসী নই। এদেশে এমপি, মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী—যেই হোক, অপরাধ করলে তার বিচার নিশ্চিত করতে চাই। দুর্নীতিবাজদের পেটে হাত ঢুকিয়ে বের করা হবে। কোন মামা-খালুকে পাত্তা দেওয়া হবে না।’

নির্বাচনী জনসভায় দলীয় প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান

জনগণকে নির্বাচনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন জামাতের আমির। তিনি বলেন, ‘১২ তারিখ আমরা নিজেরা “হ্যাঁ” ভোট দেব এবং দেশের জনগণকে “হ্যাঁ” ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করবো। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে কক্সবাজার আলোকিত হবে।’

৫৪ বছরেও কক্সবাজারের কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়ায় বিগত সরকারগুলোকে দায়ী করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, কক্সবাজার একটি সম্ভাবনাময় এলাকা। এখানকার প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম উন্নয়নকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সে জন্য ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক নেতৃত্ব প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কথা দিয়ে কথা রাখি। আমরা বেঁচে থাকলে কোনো ওয়াদা বরখেলাফ হবে না ইনশাআল্লাহ।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের নয়, এটি জাতির দিক পরিবর্তনের নির্বাচন। এটি জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা পূরণের নির্বাচন এবং মা-বোনদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন।’ তিনি বলেন, ‘১২ তারিখ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে দেশের জনগণ তা প্রমাণ করে দেবে।’

সমাবেশের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মুফতি মাওলানা হাবিবুল্লাহ। তিনি বলেন, আমরা অনেক দলের শাসন দেখেছি। এবার জামায়াতকে দেখা পালা। পরীক্ষামূলকভাবে জামায়াতকে অন্তত একবার সুযোগ দিন।

জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহেদুল ইসলামের সঞ্চালনায় নির্বাচনী জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, জামায়াতের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী ডা. মাহমুদা আলম মিতু, ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ মোহাম্মদ সিবগাহ, কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক মোঃ ইব্রাহিম।

বক্তব্য দেন, জেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান, নায়েবে আমির এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন ফারুকী, জেলা বারের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, জেলা এনসিপির সদস্য সচিব অধ্যাপক ওমর ফারুক, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাহাঙ্গীর কাশেম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মাওলানা আমিনুল হক, খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মাওলানা নুরুল্লাহ জিহাদী, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জেএইচএম ইউনুস, জেলা নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নুরুল হক চকোরী, কক্সবাজার জেলা এলডিপির সাধারণ সম্পাদক এড. রফিকুল ইসলাম, টেকনাফ উপজেলার সাবেক আমির অধ্যক্ষ নুরুল হোসাইন ছিদ্দিকী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এড. ছলিম উল্লাহ বাহাদুর, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আহসান হাবীবের চাচা মাসুদ ছিদ্দিকী, ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা দেলোয়ার হোছাইন, সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাম্মদ হেদায়ত উল্লাহ, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র রাজ বিহারী দাশ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ পারভেজ, জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মুহাম্মদ খালিদ বিন সাঈদ, সাংগঠনিক সম্পাদক রাইয়ান কাশেম, জেলা শ্রমিক কল্যাণের সহসভাপতি আলহাজ্ব সাইদুল আলম, উখিয়া জামায়াতের আমির মাওলানা আবুল ফজল, সদর উপজেলা আমির অধ্যাপক খোরশেদ আলম আনসারী, শহর জামায়াতের সেক্রেটারি রিয়াজ মোহাম্মদ শাকিল।

শুরুতে কুরআন তিলাওয়াত করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।

অনুষ্ঠানে এনসিপি নেতা এডভোকেট শেখ আহমদ ফারুকী ও ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন চব্বিশের প্রথম সারির জুলাইযোদ্ধা মো. রবিউল হোসাইন। জেলা জামায়াতের আমিরসহ দলীয় নেতৃবৃন্দ তাদের ফুলের শুভেচ্ছায় বরণ করে নেন।