cbn  

ডেস্ক নিউজ:

বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ‘ভুল’ হিসেবে দেখছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকরা। ফ্রন্ট ও জোটের নেতারা মনে করেন, সংসদে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে শরিকদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেনি। এক্ষেত্রে বিএনপি নেতাদের ভাষ্য— সৃষ্ট পরিস্থিতিই এমপিদের সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত দিতে বাধ্য করেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকরা বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফল প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচন না চেয়ে, সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে এই সংসদকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থান থেকে দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে জোট ত্যাগ করেছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। বৃহস্পতিবার (৯ মে) ফ্রন্টে অসঙ্গতির অভিযোগ এনে একমাসের আল্টিমেটাম দিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিভ রহমান পার্থের ভাষ্য— ‘সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি নাই। যেহেতু নিতে পারি নাই, আর এটা রাজনীতির নর্ম। কোনও সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পারলে তো বেরিয়ে আসাই সঠিক। আমি সরে এসেছি। আমি বিএনপির বাইরের কেউ না। তারা ভালো কাজ করুক। আমি গণতন্ত্রের কথা বলবো, জনগণের কথা বলবো।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রভাবশালী একনেতা মনে করেন, ‘তারেক রহমান সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, দলে তার নেতৃত্ব অক্ষুণ্ন রাখতেই। তিনি অনুমতি না দিলেও এমপিরা সংসদে যেতো। এমনকী মির্জা ফখরুলকেও অনুমতি দেননি তিনি শপথগ্রহণ করার। কারণ, এতে করে নেতৃত্বে ভাঙন সৃষ্টি হতো— এমনটি তারেক রহমান আশঙ্কা করেছেন। তবে এভাবে রাজনীতি হবে না। বিদেশ থেকে সিদ্ধান্ত আসবে, এরপর আমরা মিটিং করে যা সিদ্ধান্ত নেবো, তা বাতিল করা হবে, এতে করে ঐক্য সুদৃঢ় হয় না।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘তারেক রহমান হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলেও ফ্রন্ট বা জোটের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে তারা বিষয়টি জরুরি হিসেবে জানাতে পারতো। এটা তাদের নৈতিক ত্রুটি হয়েছে। সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও পদ্ধতিটা ভুল, এটা আমি আগেও বলেছি।’

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচিত ৬ জনের মধ্যে জাহিদুর রহমান দলের নির্দেশনা ভঙ্গ করে শপথ নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল বাদে বাকি চারজন সংসদে যেতে মরিয়া ছিলেন। এ অবস্থায় সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত না দিলে দলের নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তো। এমনকী নিবন্ধনের বিষয়ে সমস্যা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী একাধিক সদস্য জানান, সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা পরে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদের জানালে সমস্যা তৈরি হতো। এমনকী ওই পরিস্থিতিতে দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত না নিলে বিএনপির দুর্বলতাই প্রকাশ পেতো, এমনটি দাবি নীতিনির্ধারকদের।

গত ২৮ এপ্রিল (রবিবার) বিএনপির গুলশানের কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকেই এ বিষয়ে তারেক রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই বৈঠকে তারেক রহমান স্কাইপে সব সদস্যের মতামত চান। তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে তারেকের ওপরেই ভার দেয় বিএনপি। এরপর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হলেও বিএনপির ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার কোনও ইঙ্গিত মিলেনি। এই সময়ে জোট ও ফ্রন্টের বৈঠক করার সুযোগ থাকলেও বিএনপি তা করেনি। ওই দিন স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তার ভাষ্য— ‘এটা আমি বলতে পারবো না। কেন তাদের সঙ্গে বলা হয়নি, তা জানি না।’ হাসতে-হাসতে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা এই জায়গায় সাকসেস যে, এই সিদ্ধান্তের কথা আমরা বলার আগে কেউ টের পায়নি।’

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জোটের বা ফ্রন্টের বৈঠক ডাকলেও কোনও সিদ্ধান্ত আসতো না। শরিক নেতাদের প্রায় প্রত্যেকেই সংসদের যাওয়ার পক্ষে মত দেওয়ার বিষয়ে বিরত থাকতেন। এছাড়া, পরে বৈঠক করে জানানো হলে— শরিকরা প্রশ্ন ওঠাতেন, সিদ্ধান্ত নিয়ে বলার কী আছে। আর এই দ্বিমুখী বাধার কারণে ঐক্যফ্রন্ট ও জোট শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেনি বিএনপি। এমনকী বিএনপির যে অবস্থান, তা আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে রেখেছেন মির্জা ফখরুল— ‘সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। সংসদে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। এই সিদ্ধান্ত চমক এবং টার্ন তৈরি করেছে’, তাও সজোরেই বলেছেন তিনি।

বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির মনে করেন, ‘সময়েই বুঝা যাবে সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক নাকি ভিন্ন।’

ফ্রন্টের অন্যতম নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তো সিদ্ধান্তই নিয়েছে এই সংসদে যাবে না। মিটিংয়ে তো আমরা না যাওয়ার পক্ষেই বলতাম।’

বিএনপিকেই এগিয়ে রাখছে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল

সংসদে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেওয়া সিদ্ধান্তে ক্ষোভ থাকলেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে সম্ভাব্য আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপির বিকল্প দেখছে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকেরা।

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির আরেক সদস্য জেএসডি’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি আমাদের ব্যাখ্যা দেয়নি, কেন তারা সংসদে গেছে। দেশে সুষ্ঠু রাজনীতির স্বার্থে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। এই ধারার মধ্যে গ্যাপ হয়েছে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আবার যোগ দেওয়ায়। নতুন ফরমেশন নির্ভর করবে পুরনো ফরমেশনের ওপর। নতুন রাজনীতি কী আঙ্গিকে হবে, কোন পন্থা অবলম্বন করা হবে, সেটা নির্ভর করছে বিএনপির ওপরে। তাদেরকেই ঠিক করতে হবে নতুন পন্থা। এরপর আমাদের অবস্থান ঠিক করতে পারবো। তারা যদি এটাকে মেকাপ করতে চায়, তাহলেও বসে ঠিক করতে হবে।’

স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জাহেদ উর রহমান মনে করেন, ‘বিএনপির সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তাদের দু’টি জোটে এক ধরনের অস্থিরতাও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু শিগগিরই এই দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেতৃত্ব বিএনপিকেই দিতে হবে। কারণ, বর্তমানের চরম কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সাংগঠনিক শক্তি এবং জনসমর্থন এই দেশে বর্তমানে শুধু বিএনপি’র আছে। তাই এই মুহূর্তে সব সমালোচনা সত্ত্বেও বিএনপির ওপরই আমাদের আস্থা রাখতে হবে। বিএনপিরও উচিত হবে এই বাস্তবতা বোঝা এবং দ্রুতই গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির আরেক সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট থাকবে। উত্তাল সময়টা থামতে দিতে হবে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক হলে আমরা বসবো।’

২০ দলীয় জোটের শরিক, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের মনে করেন, ‘দেশে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। এই নির্বাচন আদায়ে বিএনপিকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। কিন্তু তাদেরকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।’

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপিই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। সেক্ষেত্রে বিএনপিকে সাংগঠনিক সক্ষমতা তৈরি করা ছাড়া পরবর্তী দাবি নিয়ে সরকারের সামনে ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব।’

সূত্র আরও বলছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মিলনমেলা হয়। প্রাথমিকভাবে সেই মিলন থেকে তার গ্রেফতারের পর ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয় বিএনপি। নির্বাচনি এই জোটকে কার্যকরভাবে সামনে নিতে হলে এখন নতুন রাজনীতির প্রয়োজন হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয় মনে করছে বিএনপি।

সূত্রের দাবি, নতুন রাজনীতি শুরু করতে নতুন ঘটনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ২০ দলীয় জোট গড়ে উঠেছে মূলত চার দলীয় জোট থেকে। আর ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সে কারণে নতুন দাবিতে রাজনৈতিক কৌশল নিরূপণ করতে ফ্রন্ট, জোটসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নতুন ঐক্য প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার (১০ মে) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এসব বিষয়ে কমেন্ট করতে চাই না। আমাদের উদ্যোগ আমাদের মতো করছি, করবো। কিন্তু কোনও কথা বলতে পারবো না।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •