জয়ের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমে উল্টো ২-০ গোলে হেরে গেলো বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। একই সঙ্গে এই প্রথম বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো জার্মানরা। দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে প্রথম গোলটি করেন কিম ইয়ং-গুন। খেলা শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একেবারে ফাঁকা পোস্টে দ্বিতীয় গোলটি করেন সন হিউং মিন।

South Koria

এরপর জার্মানি গোলরক্ষক নুয়্যারসহ ১১জন উঠে আসে দক্ষিণ কোরিয়ার পোস্টের সামনে। অতিরিক্ত সময়ের ৬ষ্ঠ মিনিটে বক্সের সামনে নুয়্যারকে কাটিয়ে লম্বা পাস দেন সি জং। সেই পাস এসে পড়ে জার্মানির অ্যাটাকিং হাফে। সামনে কেউ নেই। সন হিউং মিন সেটি ধরে এনে ঠাণ্ডা মাথায় জড়িয়ে দেন জার্মানির জালে।

আগেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার। শেষ ম্যাচটা ছিল তাদের জন্য নিয়মরক্ষার। এই ম্যাচে জয় ছাড়া কোনো উপায় ছিল না জার্মানদের। কিন্তু তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই রাশিয়া বিশ্বকাপকে গুডবাই জানালো দক্ষিণ কোরিয়া।

প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর কাছে ১-০ গোলে পরাজয়ই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিল। পরের ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে মাত্র ২০ সেকেন্ড আগে টনি ক্রুসের অসাধারণ এক গোলে কোনোমতে নিজেদের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখে জার্মানরা। কোরিয়ানদের কাছে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে হোঁচট খাওয়ার অর্থই হলো এই বিশ্বকাপ থেকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিদায়। জয় তো দুরে থাক, উল্টো কোরিয়ানদের কাছে হার মানতে বাধ্য হলো জার্মানরা।

Germany

শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জার্মানির সমীকরণ ছিল, অবশ্যই জয়। একই সঙ্গে অন্যম্যাচের দিকেও নজর দিতে হতো তাদের। এমন এক সমীকরণের ম্যাচে কাজান এরেনায় এশিয়ান দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি হয় ডাই ম্যানশাফটরা। কিন্তু প্রথম থেকে একের পর এক আক্রমণ করেও কোরিয়ানদের রক্ষণদুর্গে ফাটল ধরাতে পারেনি জার্মানি। উল্টো ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে জার্মানদের জালে দু’বার বল জড়িয়ে দিলো দক্ষিণ কোরিয়া।

অথচ জার্মানি মানেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। এটা যেন বিশ্বকাপের একটা অঘোষিত নিয়ম। ১৯৩৮ সালে একবার মাত্র গ্রুপ পর্বের ম্যাচ থেকে বিদায় নিয়েছিল জার্মানরা। তাও সেবার গ্রুপ পর্ব মানেই ছিল নকআউট। এরপর ৮বার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে জার্মানি। চারবার জিতেছে বিশ্বকাপ। সেমিফাইনাল খেলেছে তারা মোট ১৩ বার। আর ১৯৩৮ ছাড়া বাকি সববারই তারা খেলেছে সর্বনিম্ন কোয়ার্টার ফাইনাল।

এমন একটি দল, এবার বিশ্বকাপে খেলতে এলো টপ ফেবারিটের মর্যাদা নিয়ে। কিন্তু কোচ জোয়াকিম লো এই দলটিকে কোনোভাবেই ঘোচাতে পারলেন না। শুরু থেকেই কেন যেন ছন্নছাড়া মনে হচ্ছিল। একে তো ডিফেন্সে অনেক বেশি দুর্বল। অন্যদিকে আক্রমণে উঠে আসলেও গোল দেয়ার মত যেন কেউ নেই। ফিনিশারের দারুণ অভাব। যে কারণে, শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো তাদের।

Germany

অথচ বল দখলের লড়াইয়ে পুরো ম্যাচে ৭৪ ভাগই ছিল জার্মানদের কাছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ছিল মাত্র ২৬ ভাগ। পোস্ট লক্ষ্যে কোরিয়া শট নিয়েছে মোট ১০টি। এর মধ্যে ৫টি অন টার্গেট এবং দুটি গোল। জার্মানি শট নিয়েছে ১৯টি। কোনোটিই কাজে লাগেনি। দক্ষিণ কোরিয়া পাস দিছে মাত্র ২৪৭টি এবং জার্মানি পাস দিয়েছিল ৬৯৭টি।

শুরু থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার গোলমুখে মুহূর্মুহু আক্রমণ। খেলার ৬ষ্ঠ মিনিটেই দারুণ এক আক্রমণ করে জার্মানি। মার্কো রেউসের ডান পায়ের শট বারের পাশ দিয়ে চলে যায় বাইরে। ১৪ মিনিটেই টনি ক্রুসের দারুণ এক ক্রস থেকে অসাধারণ হেড নেন স্যামি খেদিরা। কিন্তু দুভাগ্য জার্মানির। সেই বল ঠেকিয়ে দেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোলরক্ষক।

দুই মিনিট পর আবারও আক্রমণ। এবার মেসুত ওজিলের ক্রস থেকে দারুণ এক হেড নেন নিকলাস শুলে। তবে তার সেই হেড ফিরিয়ে দেন দক্ষিণ কোরিয়ান ডিফেন্ডাররা।

১৯ মিনিটে বক্সের সামনে ফ্রি কিক পেয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কিক নেন জাং উ ইয়ং। এতটাই বুদ্ধিদীপ্ত যে, মানবপ্রাচীর ভেদ করে বল চলে গেলো সোজা ম্যানুয়েল নুয়্যারের কাছে। বলের শট এতটাই তীব্র ছিল যে, নুয়্যার সেই বল ধরে রাখতে পারলে না। হাত ফসকে বের হয়ে যায়। সন হিউং মিন চেষ্টা করেন ফিরতি বলে পা লাগানোর। শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে নুয়্যার কোনোমতে বাঁচিয়ে দেন জার্মানিকে।

এক মিনিট পরই কর্ণার কিক থেকে ভেসে আসা বলে দারুণ এক শট নেন সন হিউং মিন। কিন্তু তার এই শটটি চলে যায় বারের ওপর দিয়ে। বেঁচে যায় জার্মানি। ২৫ মিনিটে লি ইয়ংয়ের ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে হেড করেন লি জায়ে সুং। কিন্তু জার্মান ডিফেন্ডাররা ফিরিয়ে দেন সেই হেড। তার খানিক পরই দারুণ এক সুযোগ পেয়েছিলেন সন হিউং মিন। কিন্তু তার নেয়া ডান পায়ের শটটি চলে যায় জার্মানির গোল পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে।

Germany

৩৩ মিনিটে গোল লক্ষ্যে শট নিয়ে ছিলেন মার্কো রেউস। বল পাস দিয়েছিলেন গোরেজৎকা। কিন্তু রেউসের শটটি চলে যায় পোস্টের বাইরে। ৩৯ মিনিটে গোলের দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন লিওন গোরেৎজকা। টনি ক্রুসের কর্ণার কিক থেকে ভেসে আসা বলে হেড নিয়েছিলেন গোরেৎজকা। কিন্তু সেই বলটি রুখে দেন গোলরক্ষক। ওই প্রায় একই সময়ে ম্যাট হ্যামেলসের শট গোলমুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক জো হিউন।

প্রথমার্ধের ইনজুরি সময়ে (৪৫+৩) সন হিউং মিনের ডান পায়ের দুর্দান্ত এক শট বক্সের বাইরে চলে যায়। বেঁচে যায় জার্মানি। বলটি সোজা গেলে হয়তো বা পোস্টেও যেতে পারতো।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেয় জার্মানি। যে কারণে ৪৭ মিনিটেই দুর্দান্ত এক গোলের সুযোগ পেয়েছিল জার্মানরা। জশুয়া কিমিচের ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে গোরেজৎকা অসাধারণ এক হেড নেন। বল নিশ্চিত জালে প্রবেশ করে যাচ্ছিল। কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়েন দক্ষিণ কোরিয়ার গোলরক্ষক। অসাধারণ দক্ষতায় বলকে পাঠিয়ে দিলেন বাইরে। নিশ্চিত গোল বঞ্চিত হলো জার্মানরা।

৪৯ মিনিটে পোস্ট লক্ষ্যে শট নেন টনি ক্রুস কিন্তু বল চলে যায় বক্সের বাইরে দিয়ে। ৫১ মিনিটে টিমো ওয়ার্নারের ডান পায়ের শট পোস্টের সামনে চলে এলেও মেসুত ওজিল মিস করেন। ৬৮ মিনিটে আরও একবার দক্ষিণ কোরিয়াকে বাঁচিয়ে দিলেন গোলরক্ষক জো হিউন। মারিও গোজের পাওয়ার হেড। পোস্টের ঠিক নিচ দিয়ে জালে প্রবেশের মুঠে লাফ দিয়ে উঠে পাঞ্জ করলেন গোলরক্ষক।

Germany

২ মিনিট পর, খেলার ৭০ মিনিটে টনি ক্রুস বাম পায়ের শট নেন। কিন্তু তার এই শটটি চলে যায় পোস্টের ওপর দিয়ে। ৭৮ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে গোলের দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন সন হিউং মিন। লি জায়ে সুংয়ের পাস থেকে বল পেয়েছিলেন সন। কিন্তু পোস্টের কাছে গিয়েও বলটি হারিয়ে ফেলেন তিনি।

৮২ মিনিটে সুযোগ পেয়েছিলেন থমাস মুলার। জশুয়া কিমিচের পাস থেকে বল পেয়ে দারুণ এক হেড নিয়েছিলেন মুলার। কিন্তু বক্সের ওপর দিয়ে চলে যায় সেই বলটি। এক মিনিট পরই মার্কো রেউস শট নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ডান পায়ের শট চলে অনেক বাইরে দিয়ে। ৮৭ মিনিটে নিশ্চিত আরও একটি গোল মিস করে ফেলেন ম্যাট হ্যামেলস। মেসুত ওজিলের ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে সঠিকভাবে মাথায় বলটাই লাগাতে পারেননি।

পরের মিনিটে টনি ক্রুসের দারুণ এক শট বাম পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে বাঁচিয়ে দেন গোলরক্ষক জো হিউন। এরপর অতিরিক্ত সময়ে গোল করে জার্মানিকে বিদায় করে দেন কিম ইয়ং গুন। পরে দ্বিতীয় গোল করেন সন হিউং মিন।