সিবিএন ডেস্ক:
করোনাকালে মানুষ যখন ঘরবন্দি হয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় দিন যাপন করছে, তখন একে একে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে থাকে। লকডাউনে যখন সব অচল, সবাই নিরাপদে থাকতে চাইছে, তখন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে খাবার,ওষুধসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য। ঘরবন্দি মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক রাখতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো যে অনন্য অবদান রেখেছে, তার ফলও পেয়েছে এই খাত। ই-কমার্সগুলোর মধ্যে বিশেষ করে গ্রোসারি কয়েকগুণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এরপরই ছিল প্রযুক্তিপণ্য বিশেষ করে গ্যাজেটস (ল্যাপটপ, রাউটার, মডেম, ওয়েবক্যাম, স্মার্টফোন ইত্যাদি) ইলেট্রিক আইটেম।
মানুষের কেনাকাটার অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে করোনা। করোনাকালে (ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত) দেশীয় ই-কমার্সে ১৬ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। দৈনন্দিন কাজকর্ম ও শপিং ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে পরিবর্তন আসায় মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাপন করছে। কয়েক বছর ধরে দেশে অনলাইনে লেনদেনও বেড়েছে। ধীরে ধীরে ব্যাংকিং, লজিস্টিক কমিউনিকেশন এবং পেমেন্ট মেথডের উন্নতির হাত ধরে ই-বিজনেস সেক্টরটির উন্নয়নের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশেষ করে ব্যাংকিং ক্ষেত্রটি ইন্টারনেট পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করছে। গ্রাহকদের কাছে এখন ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড সেবা এবং ডিজিটাল ওয়ালেট আরও বেশি সহজলভ্য হওয়ায় ক্যাশ অন ডেলিভারির (সিওডি) পরিসরও বাড়ছে। লকডাউনের পর লোকজন এগুলোর প্রতি আরও বেশি ঝুঁকছে। বর্তমানে এ ধরনের সেবা কারও কাছেই অপরিচিত নয়।
ই-কমার্সের এই প্রবৃদ্ধির রেশ ধরেই করোনা সংক্রমণের মাঝেও আসতে থাকে নতুন নতুন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, যা এখনও অব্যাহত আছে। করোনা যায়নি। নতুন নতুন কোম্পানিও আসা বন্ধ হয়নি, বরং বাড়ছে। নতুন আসা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে— সেরাবাংলা৬৪ ডট কম, সেলেক্সট্রা ডট কম ডট বিডি, বি৭১বিডি ডট কম, ধামাকা শপিং, আলিশামার্ট ডট কম ইত্যাদি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আজ থেকে ১০ বছর আগে বলেছিলাম, আগামীতে প্রচলিত ব্যবসা থাকবে না। প্রচলিত ব্যবসা ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তর হবে। এটাই ই-কমার্স। টুজি থেকে থ্রি-জি, তারপর ফোর-জিতে আমরা পৌঁছেছি। এরপরে ফাইভ-জিতে যাবো। নতুন সভ্যতা আসছে। সেই সভ্যতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। ই-কমার্স হতে পারে মূল হাতিয়ার। সবকিছু বদলে যাবে। বিপণন, বিক্রি সবকিছু।’ তিনি মনে করেন, ই-কমার্সে ভালো করতে হলে সেই দেশকে আগে বুঝতে হবে। আলিবাবা এভাবেই গ্রো করেছে। দেশের ক্রেতাদের মানসিকতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য— যে যত ভালোভাবে বুঝতে পারবে, সেই প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সে ভালো করবে। তিনি জানান, ই-কমার্সে কৃষিভিত্তিক ও কৃষিজাত পণ্যের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। গ্যাজেটসও এগিয়ে যাচ্ছে ই-কমার্সে। আমরা এখন প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদক দেশও। ফলে সবদিক দিয়ে মনে হয়েছে, বাংলাদেশি ই-কমার্সগুলো এ খাতে বেশি ভালো করবে। দেশে ই-কমার্সের উত্থান এবং বড় বড় কোম্পানির এগিয়ে আসা দেখে মন্ত্রী বলেন, ‘আগামীতে ই-কমার্সের শো-রুমই হবে ইন্টারনেট। গোডাউন বলে কিছু থাকবে না।’
ই-কমার্সে আগমন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বি৭১বিডি ডট কমের প্রধান নির্বাহী মো. মনিরুজ্জামান মৃধা বলেন, ‘দেশে তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় ই-কমার্স সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনলাইন শপে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে কোনও মধ্যস্বত্বভোগী নেই। এ কারণে ই-কমার্স নির্ভর আগামী গড়ার প্রত্যয়ে স্মার্ট জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ভবিষ্যতের ক্রেতারা ই-কমার্সকে বেছে নেবেন। এজন্যই ই-কমার্সে আসা।’
তিনি বলেন, ‘ই-কমার্স নিয়ে দিন দিন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। সে আগ্রহই মূলত একটি ই-কমার্সের মূল উপজীব্য। তাই প্রতিযোগিতার ভিড়ে পণ্যের দাম, মান, পণ্যের বিক্রয় পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা, ক্রেতাদের ভালো ভালো রিভিউ এবং সময়ে সময়ে ক্রেতাদের বিশেষ সুবিধার কথা ভেবে পণ্যের ওপর বিশেষ ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করাই হবে আমাদের প্রতিষ্ঠানের মূল হাতিয়ার ও কৌশল।’ তিনি মনে করেন, ই-কমার্সে ক্রেতা আনার চেয়ে ধরে রাখাই বড় কঠিন। এ প্রসঙ্গে বি৭১বিডি ডট কমের কৌশল হলো— প্রায় সব পণ্যেরই দাম ও মানের তারতম্য থাকে। বাজারে একটি পণ্য আসার কিছুদিন পর অন্য কোম্পানি বা ব্র্যান্ডের নতুন পণ্য নতুন নতুন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বাজারে হাজির হয়। সময়ে সময়ে বাজারে একই পণ্য বা উপকরণের ওপর আরও অনেক ভেরিয়েশন তৈরির বিষয়টি ক্রেতাদের জানানো প্রয়োজন। ক্রেতাদের সেসব পণ্যের উপকারিতা এবং উপযোগিতা সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে তাদের ধরে রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মো. মনিরুজ্জামান মৃধা বলেন, ‘আমরা ক্রেতা ধরে রাখার চেষ্টাই করবো।’
জানতে চাইলে নতুন ই-কমার্স সেলেক্সট্রা ডট কম ডট বিডির প্রধান নির্বাহী চৌধুরী ফাহরিয়ার বলেন, ‘‘আমরা বাজারে নতুন কিছু আনছি না। আমাদের মনে হচ্ছে, বাজারে একটি গ্যাপ রয়েছে। পণ্যের গুণগতমান, সেবার নির্ভরযোগ্যতা, বিস্তৃত কাস্টমার সার্ভিস ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সেই ‘গ্যাপ’ পূরণের চেষ্টা করছি। আমরা ক্রেতাদের প্রকৃতপক্ষে যা সরবরাহ করতে পারবো, তাই-ই অফার করছি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আসছিম যেন গ্রাহকরা তাদের পছন্দমতো পণ্য কিনতে পারেন। আমাদের ক্রেতাদের জন্য নিয়মিত বাড়তি কিছু সুবিধাসহ পণ্য ও ব্র্যান্ডের ক্যাম্পেইন বিস্তৃত করা হবে।’ তিনি আরও জানান, ইন্টারনেটবিহীন (যারা ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে) ক্রেতাদের নিয়ে আমরা বিস্তারিত পরিকল্পনা শুরু করেছি। এ ধরনের গ্রাহকদের সেবা দিতে দেশজুড়ে ‘সেলস হাব’ গড়ে তোলা এবং সেলস এজেন্ট নিয়োগের পরিকল্পনা করছি আমরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘গত বছর দেশে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বর্তমানে প্রতিদিন ই-কমার্সে অর্ডার পড়ছে এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৫০ হাজারের মতো। এরমধ্যে গ্রোসারি বেশি। এর পরেই রয়েছে ইলেক্ট্রনিক আইটেম ও গ্যাজেটস।’ তিনি আরও জানান, ই-ক্যাবের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারের মতো। ফেসবুক নির্ভর (এফ কমার্স) ই-কমার্স পেজের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে বলে তার ধারণা।
ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘নতুন নতুন কোম্পানি ই-কমার্সে আসছে। আমরা স্বাগতম জানাই। উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, এটা ভালো দিক। ঢাকার বাইরেও ই-কমার্স তৈরি হচ্ছে। সবাই প্রতিষ্ঠা পাক, দাঁড়িয়ে যাক এটাই চাই।’ তবে সবাইকে নিয়ম মানার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ই-কমার্স চালুর আগে যেন উদ্যোক্তারা ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সার্টিফিকেট ও ই-ক্যাবের সদস্য পদ নিয়ে বাজারে নামেন। তাহলে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা যাবে সহজে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •