সিবিএন ডেস্ক:
প্রণোদনার কোনো খরবই জানেন না প্রান্তিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক। প্রণোদনাবাবদ ঋণের জন্য আবেদন করতে হবে কি না, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বা কৃষি অফিস থেকে সুপারিশ লাগবে কি না, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে ফার্মের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক কি না, এসবের কোনো খবর প্রান্তিক কৃষকের কাছে নেই।

অথচ করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণগ্রহীতাদের আবেদন কম সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। কোনো কোনো স্থানে প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে তালিকা করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কীসের তালিকা তাও কোনো কৃষক বলতে পারেন না

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দেশের কৃষকরা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে গত ২৬ মার্চ থেকে ছুটি ঘোষণার পর পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। গাড়ি, ট্রাক, নৌ-পরিবহন, বিমান, এমনকি ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পোল্ট্রি মুরগির ৩৫ টাকার বাচ্চা ১ টাকা, গরুর দুধ ১০ টাকা লিটার, বেগুন ২ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হয়। জমিতে, হাটে-বাজারে সবজি ও তরমুজের গড়াগড়ি, জমিতে বাঙ্গি ফেটে নষ্টসহ নানাভাবে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই দীর্ঘ ছুটিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সরকার তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। গত ১৮ জুন এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণগ্রহীতাদের আবেদন কম সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। কোনো কোনো স্থানে প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে তালিকা করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কীসের তালিকা তাও কোনো কৃষক বলতে পারেন না।

কথা হয় শেরপুর জেলার ডেইরি খামারি তৌহিদুর রহমান পাপ্পুর সঙ্গে। প্রণোদনা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এক মাসের অধিক সময় হলো প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা করা হয়েছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও একটা তালিকা করা হয়েছে। কোন তালিকা কোন কাজে লাগবে তা এখন পর্যন্ত বলতে পারছি না। প্রণোদনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার বিষয়েও আমাদের কোনো কিছু জানা নেই। ঋণের জন্য কেউ ব্যাংকে আবেদন করতেও বলেনি।

তিনি বলেন, ডেইরি খামারিদের বিষয়ে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিস বেশি কিছু জানে না। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ঋণের বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে সহযোগিতা করা উচিত।

পাবনা জেলার সাথিয়া উপজেলার খামারি বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে লোকজন এসে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা তৈরি করে নিয়ে গেছে। কিন্ত লোন বা প্রণোদনার টাকা সম্পর্কে তারা কিছুই বলেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা প্রসঙ্গে আমরা কিছুই জানি না। এদিকে আমরা খুব কষ্টে আছি। মিল্কভিটা এখন পর্যন্ত পুরো দুধ নেয় না। যারা সমবায়ভুক্ত খামারি তাদের কাছ থেকে অর্ধেক দুধ নিচ্ছে। তাছাড়া দুধের দামের চেয়ে ভূষির দাম বেশি। এ অবস্থা কত দিন চলবে, তা জানি না। তবে খামারিদের যে অবস্থা তাতে সরকারের সহযোগিতা না পেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।

সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুস সালাম এক প্রশ্নের জবাবে জাগো নিউজকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা বা প্রণোদনার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা এখন পর্যন্ত আসেনি। তবে নির্দেশনা এলে আমরা কৃষককে সহযোগিতা করতে পারব। সরকারের কোনো নির্দেশনা না থাকলে আমরা কিছুই করতে পারব না।

করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণগ্রহীতাদের আবেদন কম সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত বিতরণের ব্যবস্থা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে নির্দেশ দিয়েছে সে সম্পর্কে এই কৃষিবিদ কর্মকর্তা কিছু জানেন না বলে জানান এ প্রতিবেদককে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার পূবাইল কুদাবোর ‘তুষার পোল্ট্রি ’ খামারির মালিক সেলিনা পারভিন। করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসায়িকভাবে তার প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ১৪০ টাকার ব্রয়লার মুরগি ওই সময় (ছুটির) শুধু ৪০টাকা কেজি বিক্রি করতে হয়েছে। বিক্রি করতে না পারায় কয়েক হাজার মুরগি মারা গেছে। ওই এলাকায় তালিকা করার জন্য স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে কেউ যায়নি বলে জানান তিনি।

পণোদনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তবে বিভিন্ন জায়গা ও টেলিভিশনের খবরের মাধ্যমে জানতে পাই যে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সরকার ঋণ দেবে।

তিনি বলেন, কিছু দিন আগে কর্মসংস্থান ব্যাংকে কিস্তি দিতে গিয়েছিলাম। প্রণোদনা সম্পর্কে তারা কিছু বলতে পারেনি। তিন মাস ধরে ফার্ম বন্ধ, বিদ্যুতের লাইন কেটে দিতে বললেও তারা কেটে দিচ্ছে না। এই অবস্থায় তিন মাসের বিল এক সঙ্গে ধরিয়ে দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. হাবিবুল হক এক প্রশ্নের জবাবে জাগো নিউজকে বলেন, প্রণোদনাবাবদ লোন বা ঋণের বিষয়টি ব্যাংক দেখবে। যারা খামারি, ব্যাংকের সঙ্গে তারা লেনদেন করেন। ব্যাংকও তাদের খামার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। প্রণোদনার বিষয়ে খামারিরা স্বউদ্যোগে ব্যাংকে আবেদন করবেন লোনের জন্য। আমাদের কাছে কোনো খামারি এলে আমরা সুপারিশ করতে পারি। যে যে এলাকায় যে ব্যাংক আছে সেখানে যোগাযোগ করলে তারা আবেদন সম্পর্কে বলে দেবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নআয়ের পেশাজীবী কৃষক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষি খাতসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আবেদন করতে পারবেন।

সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর উপজেলার প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান (ইউএলও) এক প্রশ্নের জবাবে জাগো নিউজকে বলেন, প্রণোদনার লোনের বিষয়ে ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অন্য জেলা উপজেলায় অন্য ব্যাংকও এই লোন দেবে। তবে খামারিদের লোন দেয়ার বিষয়ে কিছু শর্ত থাকবে। যেমন:- প্রাণিসম্পদ অফিস ও কৃষি অফিসে তার প্রতিষ্ঠানের কোনো রেজিস্ট্রেশন আছে কি না।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিস তালিকা করেছে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের। তা ছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীও আলাদা একটি তালিকা করেছে। পোল্ট্রি , ডেইরি, হাসের খামার আর কৃষি উৎপাদন যে যেটাই করুকনা কেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাদের রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে। তাছাড়া লোনের জন্য সুপারিশ করা সম্ভব হবে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •