মুফিদুল আলম
প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন
mofidulalam@yahoo. com


করোনাভাইরাস (COVID-19) বিশ্বব্যাপী এক আতঙ্কের নাম। এ ভাইরাসের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেনা নারী, শিশু, বৃদ্ধ, ডাক্তার, পুলিশ, আমলা, বুদ্ধিজীবিসহ কেউ। মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বড় হচ্ছে। যারা দুর্দান্ত প্রতাপে বিশ্বকে শাসন করেছে তারাও আজ বড় অসহায়। মহান সৃষ্টিকর্তাই সকলের একমাত্র ভরসা।

করোনাভাইরাসের প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায় চীনের উহান প্রদেশে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে। কী কারণে এর উত্থান হলো? কারাই এর উত্থান ঘটালো? এসবের সঠিক তথ্য এখনো অজানা। বিশ্ব মোড়লদের কথা-বার্তা শুনলে মনে হয় এটি একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। আবার জ্ঞানী গুণীদের কথা শুনলে বিশ্বাস গজায় যে, এসবই আমাদের পাপের ফল কিংবা হাতের কামাই। কারণ যাই হোক না কেন, এটা সত্য যে, প্রতিনিয়ত এ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, বৈশ্বিক ক্ষতি হচ্ছে মারাত্মকভাবে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী সনাক্ত হয় ৮ মার্চ, ২০২০ খ্রি. তারিখে। সময়ের পরিক্রমায় এ পর্যন্ত (২৯ জুন) আক্রান্ত সংখ্যা ১,৪১,৮০১ জন, মৃত্যুর সংখ্যা ১৭৮৩ জন, সুস্থতার হার ৪০.৭%, মৃত্যুর হার ১.৩%। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় ৬১-৭০ বছর বয়সী যার হার ৩০%। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। ঢাকার পরে চট্টগ্রামের স্থান। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় কক্সবাজার জেলা প্রথমে। দ্বিতীয় স্থানে আছে চট্টগ্রাম। বর্তমানে সারাদেশে ৭৩টি ল্যাবরেটরির মাধ্যমে করোনা টেস্ট হচ্ছে। চট্টগ্রামে টেস্ট সেন্টারের সংখ্যা ০৪টি।

এ ভাইরাস নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছে বলে মনে হয় না। করোনা নিয়ে সঠিক গবেষণা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ট্রায়াল এন্ড এরর ভিত্তিতে সবকিছু চলছে। আমাদের সাধারণ লোকজনের মনের ভাবনা কিছুটা বিপরীতমুখী। অনেকের চেহারা বা ভঙ্গিমা দেখলে মনে হয় কারোনা ভাইরাস- এটা কিছুই না। এটা কোন রোগই না। এর চেয়ে পরিবহন দুর্ঘটনায় সারাদেশে প্রতিদিন অনেক লোক মারা যায়। করোনার সাথে পরিবহন দুর্ঘটনাকে তুলনা করে করোনা ভাইরাসকে হাস্যকর একটা অবস্থানে নিয়ে যায়। অপরদিকে, এক দল লোক যারা মনে করে- করোনা মানে মৃত্যু, এটা একটি সামাজিক পাপ। এ থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই। করোনা আতংকে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। প্রকৃতপক্ষে দুটো দলই বিভ্রান্তিতে আছে। এক্ষেত্রে সঠিক উপলব্ধি দরকার। সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে।

করোনায় কারা বেশি আক্রান্ত হয়েছে? পুলিশ, আমলা, জজ-ব্যারিস্টার, সাধারণ জনগণ সে প্রশ্নে গেলাম না। কোন পেশার কতজন তাও উল্লেখ করলাম না। করোনার ক্ষতি মোটা দাগে দুই প্রকার: ১। জানের ক্ষতি ২। মালের ক্ষতি। এ পর্যন্ত অনেক লোক মারা গেছে করোনায়, প্রতিদিন মারা যাচ্ছে, হয়তো আরো মারা যাবে। পক্ষান্তরে, আর্থিক যে ক্ষতি হয়ে গেছে তা পুষিয়ে উঠা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, এ দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের অবদান ৫০%, শিল্পখাতের ৩৫%, কৃষি ১৪% ভাগ। করোনাকালে সেবাখাত একেবারেই বন্ধ ছিল। শিল্পখাতের অবস্থা আরো নাজুক। গার্মেন্টস একটি শক্তিশালী খাত। এউচ তে এর অবদান ১৮%। এ খাতেও একটি বড় ধাক্কা লেগেছে বলে মনে হয়। বিজিএমই এর মতে গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২০ কোটি ডলার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়। তাছাড়া রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিশালী হাতিয়ার। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে রেমিটেন্সের ধস নেমেছে। যদিও বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত রেমিটেন্সের অবস্থান ভালো। সর্বোপরি, করোনা আমাদের অর্থনীতিতে এক কথায় বলা যায়, সেবাখাত, শিল্পখাত বিশেষ করে গার্মেন্টন্স সেক্টরে বড় ধরনের আঘাত এনেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বর্তমান সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। তবে ফলাফল পেতে আরো কিছু সময় অপেক্ষায় থাকতে হবে।

করেনার থাবায় চট্টগ্রাম জেলা ক্ষত-বিক্ষত। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এর আওতার বাইরে নয়। সিটি কর্পোরেশন বহুভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। যেমন- ১। উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা, ২। রাজস্ব আহরণে শ্লত গতি, ৩। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত অর্থব্যয়, ৪। বিপুল অংকের স্থায়ী ব্যয় নির্বাহ ইত্যাদি।

এটা বলা হয় যে, রাজস্ব বিভাগ কর্পোরেশনের রক্ত সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু করোনা রাজস্ব বিভাগকে অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হয়ে বহুদিন যাবৎ গৃহবন্দী, রেড জোনের কারণে সার্কেল অফিস লকডাউন (৬নং সার্কেল), কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ভীতি বা আতংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে ট্রেড লাইসেন্স হালনাগাদ কার্যক্রম বন্ধ, ফেরিঘাট, পাবলিক টয়লেট, কসাইখানা ইত্যাদি ইজারা গ্রহণে ইজারা গ্রহীতাদের অনাগ্রহ। করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বেসরকারি আদায়। কারণ, এ অসহনীয় মহুর্তে জনগণের নিকট থেকে কর দাবী ও আদায় রীতিমত অত্যাচার বলে গণ্য হবে- এই বিবেচনায় সাধারণ জনগণের নিকট কর চাওয়া হয়নি।

সামনের দিনগুলোতে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসছে। বিগত অর্থ বৎসরে লকডাউন ছিল ৩ মাস। এই তিন মাসের ক্ষতি বিগত ৯ মাসের আদায় দিয়ে কিছুটা পার পাওয়া গেছে। কিন্তু চলতি অর্থ বছর (২০২০-২১) শুরু হলো রেডজোন, গ্রীণজোন, লকডাউন এসব দিয়ে। আর এ ধারা যদি বছরব্যাপী চলতে থাকে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হবে মারাত্মকভাবে। রাজস্ব আদায় ব্যাহত হলে এর তীব্র প্রভাব পড়বে দুটি বিষয়ের উপর। ১। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদান। ২। কর্পোরেশনের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ। এ দুটি খাতে সরকারি কোন বরাদ্দ নেই। কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল দিয়ে চলতে হয়। রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনয়ন সম্ভব না হলে বা পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে কর্পোরেশান চরম অর্থ সংকটে পড়বে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে কীভাবে এ সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবেলা করতে পারে? এ ক্ষেত্রে মোটাদাগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, চসিকে প্রায় ৯,০০০ কর্মকর্তা ও কর্মচারী (স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে)। প্রতিমাসে এ বিপুল সংখ্যক কর্মচারীর দায় মেটাতে প্রায় ১৮ কোটি টাকা রাজস্ব ব্যয় হয়। রাজস্ব আহরণ কোনভাবেই মাসিক ১৮ কোটি টাকায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে হয়না। সে ক্ষেত্রে যাচাই বাছাই করে অপ্রয়োজনীয় অস্থায়ী কিছু কর্মচারী ছাঁটাই করা যেতে পারে। যদিও জনপ্রতিনিধিদের জন্য এটা একটি কঠিন কাজ। বাস্তবতার কারণে এটা করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। ইতোমধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে।

দ্বিতীয়ত, সংক্রমন প্রতিরোধে সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিতকল্পে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নথি ব্যবস্থাপনার জন্য ই-নথি, ই-মেইল, হোয়াটস অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার ইত্যাদির ব্যবহার আবশ্যিক করতে হবে। অনলাইনে আবেদন গ্রহণ ও অন লাইনেই নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ দরকার। মাসিক সভাসহ সকল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জুম অ্যাপের মাধ্যমে নিষ্পন্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে সদাশয় সরকার এ বিষয়ে সবিশেষ তাগাদা দিয়েছেন। এটাকে কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

তৃতীয়ত, সামগ্রিকভাবে কাজের ধরণ বা পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অভ্যাস ও রুচির পরিবর্তন জরুরী। অভ্যাসগত ও মানসিক পরিবর্তন ছাড়া শারীরিক দুরত্ব বজায় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

চতুর্থত, যেহেতু রাজস্ব আহরণের পথে সমূহ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেহেতু যে কোন প্রকল্প গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে ‘আয় বুঝে ব্যয়’ করার নীতির অনুসরণ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আয় বাড়ানোর সুযোগ যেখানে সীমিত হয়ে আসছে, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ থাকা সমীচীন নহে।

পঞ্চমত, কিছু কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে এবং একইসাথে শক্তিশালী মনিটরিং এর ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে কেউ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে।

করোনা কতদিন থাকবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে এটা সহসা যাচ্ছেনা, এতটুকু অনুমান করা যায়। এজন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি থাকা দরকার। একই সাথে বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ জরুরী। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মাননীয় মেয়র একজন দক্ষ প্রশাসক, মাঠকর্মী ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি সঠিক সময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেন এবং আগামীতেও নিবেন-এটাই চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা।