কামরুল হাসান মামুন :

বৃষ্টি হলেই পর্যটন নগরীর বড় অংশ জলাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। গত ১০ বছরে জনবসতি বাড়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কাজ করে গেলেও এর কোনো সুরাহা মিলছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে পাহাড় কাটা, নালা ভরাট, ময়লা অপসারণে অব্যবস্থাপনা ও খাল দখলকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কক্সবাজার পৌরসভার ১২ টি ওয়ার্ডে পানি প্রবাহের জন্য মোট ১৪ টি ছরা বা নালা রয়েছে। অধিকাংশ ছরার উৎপত্তিস্থল পাহাড় থেকে। বর্ষা আসলেই শুরু হয় পাহাড় কাটার মহোৎসব, বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি সামান্য কেটে দিলেই মাটির স্তুপ ঢল হয়ে নেমে আসে নিম্নাঞ্চলে। এতে পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকির সাথে সাথে পলি মাটি এসে পতিত হয় নালা নর্দমার, ব্যাহত হয় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মৌখিক নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে এই সমস্যা সমাধানে গৃহীত হয়নি কোনো কর্যকরী পদক্ষেপ। শহরের তালিকাভুক্ত অবৈধ নালা দখলদারদের সংখ্যা ১২৯ থেকে ২০০ ছাড়িয়েছে। ফলস্বরূপ প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে শহরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

অল্প বৃষ্টিতেই শহরের ব্যস্ততম এলাকা বাজার ঘাটা, বার্মিজ মার্কেট, বড় বাজার, রুমালিয়ার ছরা, আলির জাহাল, ঝাউতলা গাড়ির মাঠ, বাহার ছড়াসহ প্রধান সড়ক ডুবে থাকে কোমর সমান পানিতে। নির্মাণাধীন অসমাপ্ত বাইপাস সড়কটিও বৃষ্টি পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তাঘাটের নাজুক অবস্থা।

এ বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনে কক্সবাজার পৌরসভা আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। পাহাড়ি ঢলে নালায় জমে থাকা মাটি খননের জন্য বার্ষার আগেই আমরা প্রস্তুতি নেওয়া ছিলো কিন্তু মহামারী করোনার কারণে লোকবল সংকট থাকায় তা হয়ে উঠেনি। খুব শীঘ্রই নালার পুনঃ খননসহ জলাবদ্ধতা দূরীকরণে কাজ করা হবে।

বর্ষার শুরুতেই শহরের ৪, ৫, ৬ নং ওয়ার্ডসহ বেশকিছু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের রুমালিয়ার ছরার বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান থাকলেও ৬ নং ওয়ার্ডের শ্যামরাই খালটি বেদখল করে সেখানে মাছ চাষ করার অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় এসএম পাড়া, বড়ুয়া পাড়া ও সিকদার পাড়ার অসংখ্য পরিবার পানি বন্দী হয়ে আছে।

পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের বার্মিজ মার্কেট, টেকপাড়া ও পেশকার পাড়া এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই শহরের অলি-গলি এমনকি বাড়ির ভিতরেও পানি জমে থাকে। পৌরবাসীর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা নিরসনের দাবী জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি।

পৌরসভার তরুণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম রুবেল জানান, পৌরশহরের ঘোনার পাড়া, বৈদ্য ঘোনা এলাকার পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসে বার্মিক মার্কেট-টেকপাড়ার নালায়; এতে পলি মাটিতে নালা পূর্ণ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ৪ নং ওয়ার্ডের স্লুইসগেটটি অনেক দিন ধরে বিকল। মতবিনিময় সভায় মাননীয় জেলা প্রশাসক মহোদয়কে বিষয়টি অবহিত করার পর তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)কে এটি মেরামতের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে বাঁকখালী নদীর মহেশখালী চ্যানেল হতে পূর্বে দিকে ২০৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার বরাদ্দকৃত ২৮ কিলোমিটার পর্যন্ত নদী খননের প্রকল্পটিতে ড্রেজিং এর নামে চলছে অনিয়ম।

অভিযোগ উঠেছে, নদী খননের মাটি-বালি বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও ড্রেজিং এর বালি দিয়ে টাকার বিনিময়ে অবৈধ ভাবে জমি ভরাট করা হচ্ছে। পেশকার পাড়ার পশ্চিম অংশে জমি ভরাটের কারণে পৌরসভার নালাটি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, এতে পানি নিষ্কাশন ব্যহত হয়ে আশেপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভার চিত্র সচক্ষে দেখলে বুঝা যায় এটা কি আসলেই স্বাস্থ্যকর নগরী কি-না!

স্থায়ী বাসিন্দা, নগরীতে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ নানামহলে অভিযোগ উঠলেও নির্বিকার আছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে জনদূর্ভোগ বাড়ছে ব্যাপক আকারে।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এর একজন কর্মকর্তা জানান, কউক এর কাজ হচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তর করা। পৌর এলাকার দায়িত্ব পৌরসভা কর্তৃপক্ষের, কউক কক্সবাজার এর উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে কাজ থাকে। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে কউক এর পক্ষ থেকে পৌরসভায় দুটি এস্কোভেটরও দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক সংগঠন ও সচেতন মহলের দাবি, একটি দীর্ঘ মেয়াদি মাস্টার প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন, রাস্তাঘাট মেরামতসহ জনদূর্ভোগ নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।