ডা.মুহাম্মদ শাহজাহান নাজির:
কয়েকদিন ধরে মনটা কেবল এলোমেলো, অগোছালো, অস্থির অস্থির, পালায় পালায় ভাব। কিছুতেই কোন বিষয়ে মনোস্থির করা যাচ্ছে না। তার মধ্যে ২ টি বিষয় মেনে নেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

১.মেডিকেল হোস্টেল জীবনে দেখতাম যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পড়ার সুযোগ পেত, তারা যে আদর্শই ধারণ করুক না কেন, তাদের মধ্যে মনের একটা আলাদা মিল থাকতো। ৬ বছরে মনে হতো এদের চেয়ে আপন পৃথিবীতে আর কেউ নাই। বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কলেজের ছাত্রদের বেলা ও মনে হয় এটা চিরন্তন সত্য। সে রকম ই একজন বন্ধু, কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম গ্রামের সন্তান, ডাঃ নুরুল হক, চট্টগ্রামে গিয়ে তার কাছ থেকে সহযোগিতা পায়নি (বিগত ২০বছর ধরে) এরকম লোক কক্সবাজারে খুঁজে পাওয়া যাবে না, করোনায় তার মৃত্যুতে শোকাহত। যুদ্ধে স্বপক্ষীয় সেনা মরে যেতে দেখলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়।

২.করোনা এর মহামারিতে, প্রসব বেদনা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া রোগী কে বাঁচাতে চেয়েছিলেন ম্যাটস এর প্রিন্সিপাল ডা. রাকিব খান, কিন্তু অনেক চেষ্টা পর, তার ক্লিনিক থেকে রেফার করে খুলনা মেডিকেলে, সেখানে রোগীর মৃত্যু হয়, আর মৃত্যুর কারনে বয়োবৃদ্ধ এই ডাক্তার কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

#লিখতে চেয়েছিলাম, কক্সবাজারের লকডাউন ইফেক্ট নিয়ে, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহযোগিতায়, যে লকডাউন করা হল, তার সাফল্য অবশ্যই চোখে পড়ার মত। গত কয়েকদিনের কক্সবাজার শহরের রোগীর শতকরা হিসাব করলে দেখি৷ মানে কতটা স্যাম্পলে কতজন রোগী পজিটিভ হচ্ছে তার শতকরা
১৫/৬/২০ তারিখে ছিল ২৪.৫১%
১৬/৬/২০ তারিখে ছিল ১৫.৫৬%
১৭/৬/২০ তারিখে ছিল ১৩.৪৫% গত কাল
১৮/৬/২০ তারিখে তা ১০.০৪% তাহলে বুঝা যাচ্ছে
আমরা লকডাউনের সফলতা পাচ্ছি।

#এদিকে মেডিকেল কলেজের ল্যাবের কয়েক সপ্তাহের অক্লান্ত পরিশ্রমে জমে থাকা স্যাম্পল এখন, শুন্যের কোটায় নিয়ে আসছে। গতকাল ১ দিনেই ৭৫০ টেস্ট এর রেকর্ড করা হয়। তাই এখন থেকে ৪৮-৭২ ঘন্টার মধ্যে ( আন্তর্জাতিক নিয়মে) কক্সবাজার জেলায় ও রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব, যদি ঢাকা থেকে নিরবিচ্ছিন্ন পরীক্ষা করার কীট সরবরাহ থাকে, এজন্য প্রিন্সিপাল স্যার সহ, GO এবং NGO সংশ্লিষ্ট সবাই কে অভিনন্দন।

#এখন দরকার কক্সবাজার সদরের ৮১৮ তথা পুরো জেলার ১৮৬৪ রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এদের অধিকাংশই বাসায় চিকিৎসা নিতে পারবে কিন্তু নেওয়ার সময় স্বেচ্ছাসেবক লাগবে যাতে তাদের কাছ থেকে তাদের পরিবারে বা সমাজে সংক্রমণ না হয়, তাদের ও ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ।

#বাকি যে অংশের হাসপাতালে ভর্তি লাগবে তাদের, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য HFNC ও নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। করোনা জীবাণু নতুন, তাই আগে বলা হত ভেন্টিলেটর দিয়ে চিকিৎসা করা লাগবে। ইতালি ও আমেরিকায় দেখা গেল যে, রোগীদের ভেন্টিলেটরে যাদের ঢুকানো হচ্ছে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে, তাই গাইডলাইন ঠিক করা হল ভেন্টিলেটর নয়, HFNC দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে কভিড১৯ রোগীদের।

#কয়েকদিন আগে গরু মোটা তাজাকরনের যে ড্রাগ অসাধু ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছে, অনেক মানুষ ও মোটা হওয়ার জন্য সেটা খায়। সেটা খেয়ে কি কি অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে তা ভুক্তভোগীরা ই জানেন। সেটা খাওয়ার পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, যক্ষা সহ যাবতীয় ব্যাকটেরিয়া, করোনা সহ যাবতীয় ভাইরাস, ও অন্যান্য জীবাণু ঘটিত রোগ বেড়ে যাবে আগে থেকে খাওয়া শুরু করলে। সে ড্রাগ টা আবার করোনা রোগের শেষ সিরিয়াস সময়ে, যখন জীবাণু ও শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে যুদ্ধ চলে সেসময়ে প্রয়োগ করলে কিছুটা লাভ হয় বলে ইংল্যান্ড ভিত্তিক গবেষণায় প্রমাণিত। ঠিক কোন শেষ সময়ে দিতে হবে সেটা অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা ঠিক করা লাগবে। আগে থেকে খেলে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে সেটা নস্ট হবে সাথে আর ও অনেক রোগ দেখা দিবে।

#আগেই বলছি করোনা সবার জন্য নতুন ভাইরাস, একেক দিন, একেক চিকিৎসা আবিষ্কার হয়, তাই তার চিকিৎসার জন্য কোন সময় কোন মেশিন লাগে, বা কোন মেডিসিন লাগে বা লাগবে, সেটা গবেষণায় বলে দিতে হবে, তাই সরকারি ভাবে সব সময় সবকিছু যোগান দেয়া সম্ভব না ও হতে পারে। মহামারী নিয়ন্ত্রন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। যে দেশ সেভাবে এগিয়ে গেছে তারা সফল, অনেক ধনী দেশ নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে হিমশিম খাচ্ছে আবার অনেক মধ্যম আয়ের দেশ সফল। করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ সরকার ও জনগণের স্বদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

#প্লাজমা থেরাপি করোনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা। যে রোগীরা করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন তাদের শরীরে এন্টিবডি আছে, সেই এন্টিবডি নতুন রোগীর শরীরে দিলে ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে। তাই এই মূহুর্তে কক্সবাজারে দরকার একটা প্লাজমা সেফারেটর মেশিন। কক্সবাজারে একজন মেডিসিন প্রফেসর আছেন যিনি রক্ত রোগের উপর FCPS করা, তিনি বর্তমানে কলেজের অধ্যক্ষ ও । যেটা অন্য অনেক বিভাগীয় শহরে নাই।
আমাদের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী রা এগিয়ে আসছেন, কক্সবাজারের প্যাথলজি কনসালটেন্ট ডা. জিয়াউদ্দিন সহ কয়েকজন ডাক্তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, আমরা সফল হব ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

ডা.মুহাম্মদ শাহজাহান নাজির
সহকারী অধ্যাপক
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন।
১৯/৬/২০২০