মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

দেশের অন্যতম শিল্প গ্রুপ নিরিবিলি গ্রুপের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তা, শিল্পপতি আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমানের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী রবিবার ৮ মার্চ। কক্সবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের গর্বিত জনক ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেগম সালেহা খানমের স্বামী আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৬ সালের এই দিনে ঢাকাস্থ গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান।

শিল্প অঙ্গনে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য আনার মৌলিক কারিগর হিসাবে পরিচিত মরহুম মোস্তাফিজুর রহমানের আধুনিক মৎস্য খামার, বাগদা চিংড়ি পোনা হ্যাচারী ও নার্সারী, মৎস্য খাদ্য উৎপাদন শিল্প, লবণ শিল্প, রাবার প্লানটেশন, আবাসন শিল্প, ডেইরী ও পোলেট্রি শিল্প সহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠায় অবদান ছিল নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এসব প্রতিষ্ঠান গড়ায় তিনি ছিলেন একজন পাইওনিয়ার। বিশেষ করে বাগদা চিংড়ি হ্যাচারী প্রতিষ্ঠা, হাইব্রীড তেলাপিয়া মাছ উৎপাদন, ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে লবণ উৎপাদনের জনক হিসাবে শিল্পজগতে তিনি বেশ সুপরিচিত। যেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়াও কক্সবাজারের বিভিন্নস্থানে মরহুম আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান অনেক ধর্মীয়, শিক্ষা, সামাজিক ও কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সৃষ্টিশীল, অদম্য সাহসী ও অসাধারণ মেধাবী মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে গড়া এসব প্রতিষ্ঠান তৈরী করছে অসংখ্য আলোকিত মানুষ। প্রতিষ্ঠান গুলো নিরবে আলোর জ্যোতি ছড়াচ্ছে অবিরাম।

বিভিন্ন নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় এই সৃজনশীল ও দূরদর্শী মানুষটির প্রদত্ত থিওরি ও কনসেপ্ট আজো অনুকরণ-অনুসরণ করছে। কোন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় মোস্তাফিজুর রহমান হাত দিলে তিনি আর পেছনে থাকাতেন না। অপ্রতিরোধ্য মোস্তাফিজুর রহমান সে প্রতিষ্ঠানে ক্ষতি হলে সেটাকে তিনি এক ধরনের বিনিয়োগ মনে করতেন এবং ক্ষতি হওয়া ঐ প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত নাহওয়া পর্যন্ত তিনি তার হাল ছাড়তেননা। নাছোড়বান্দা মরহুম মোস্তাফিজুর রহমানকে পরাজয়ের গ্লানি কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। হতাশা ও ক্লান্তি তাঁর কোনসময় সাথী হতে পারেনি। ‘ঝু্ঁকি’ নামক শব্দটি মোস্তাফিজুর রহমানের জীবন অভিধানে ছিলোনা। দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন ও আত্মপ্রত্যয়ী এ মানুষটি কখনো কোন উদ্যোগের কাছে হার মানেননি। তাঁর পথচলায় অনেকসময় কাঁটা দেখা গেলেও তাতে তিনি থাকতেন অবিচল ও অটল। সৃষ্টিতে স্বপ্নবাজ, উন্নয়নে অপ্রতিরোধ্য, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার তীব্র আকাঙ্খা, বিনির্মাণের সচল চাকা ছিল মোস্তাফিজুর রহমানের নিত্যসঙ্গী। অভিষ্ঠ লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত তিনি ক্লান্ত হতেন না। অনন্য মানবিক গুনাবলীসম্পন্ন মোস্তাফিজুর রহমান মেধা ও মননে পুরো কক্সবাজারবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের চিন্তা করতেন সবসময়। কক্সবাজার যেকোন সমস্যা, সংকটকে তিনি নিজের সমস্যা, সংকট মনে করে সমাধানে এগিয়ে যেতেন শত বাধাঁ উপেক্ষা করে। কেউ সমালোচনা করছেন কিনা-সেটা বড় কথা নয়, সমস্যার সমাধান করতেই হবে, এ প্রত্যয় ছিলো তাঁর কাছে বড় বিষয়। এরকম অনেক সমস্যার সমাধানও করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। কক্সবাজার ভিত্তিক তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্প ও কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান সমুহ তার সরব সাক্ষী। মানব কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করাকে তিনি দায়িত্ব মনে করতেন। এজন্য তিনি ছিলেন একজন সোসাল ইঞ্জিনিয়ার।

কক্সবাজার সদর উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম গোমাতলী’র বুনিয়াদি পরিবারের মরহুম আলহাজ্ব আসদ আলী সিকদার ও মরহুমা ছকিনা খাতুনের পুত্র মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৩৮ সালের ১২ এপ্রিল জম্মগ্রহন করেন। তিনি একদিকে ছিলেন-সৃষ্টিশীল পরিকল্পিত শিল্প গড়ার কারিগর, অন্যদিকে-কল্যাণকর ও মহৎ প্রতিষ্ঠান গড়ার একজন নির্ভেজাল আদর্শ মানুষ। কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নেও তিনি অবদান রেখেছেন প্রতিটি পরতে পরতে।

কক্সবাজাররে মতো একটি মফস্বল শহরে অসম সুযোগ নিয়ে তিনি রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্য করে কক্সবাজারকে সুপরিচিত করেছেন-বিশ্বব্যাপী। সমৃদ্ধ করেছেন রাষ্ট্রীয় তহবিল। পরিকল্পনায় দূরদর্শী ও বাস্তবতায় বিশ্বাসী এই অসাধারণ ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটি মূলত চিকিৎসা বিজ্ঞানের গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি এমবিবিএস-এর একজন মেধাবী ও কৃতি ছাত্র হয়েও সৃষ্টিশীল শিল্প কারখানা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনে তার অদম্য সাহসিকতা ও দৃঢ় মনোবল ছিল সত্যিকার অর্থে অনুসরণযোগ্য।

জীবদ্দশায় তিনি তাঁর অসাধারণ কর্মের স্বীকৃতিসরূপ অর্জন করেছেন জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় স্বর্ণ পদক সহ অনেক মূল্যবান প্রাপ্তি। দক্ষ, সফল ও বলিষ্ঠ শিল্প সংগঠক মোস্তাফিজুর রহমানের চিন্তা, চেতনা, কর্মে উৎসাহ ও প্রেরণা পেয়ে গড়ে তোলা তৎকালীন অনেক তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা আজ দেশের সুপরিচিত, বিখ্যাত শিল্পপতি ও সফল উদ্যোক্তা। অবিশ্বাস্য পরিশ্রমী এই মানুষটি তাঁর হাতেগড়া নিরিবিলি শিল্প গ্রুপকে তিল তিল করে দেশের একটি বিখ্যাত ও স্বনামধন্য একটি শিল্পগ্রুপ হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজ জেলা কক্সবাজার ভিত্তিক শিল্পগ্রুপ গড়ে তোলার মতো কঠিন কাজটি তিনি করেছেন দুঃসাহসিক অভিযাত্রায়। নিখাদ দেশপ্রেমসম্পন্ন মোস্তাফিজুর রহমান প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বনির্ভর করতে তার কাজেকর্মে দৃষ্টান্ত রেখেছেন অহরহ। ব্যক্তিগত জীবনে স্বজ্জন, অমায়িক, সদালাপী ও বন্ধুবৎসল মোস্তাফিজুর রহমান ৪ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের গর্বিত জনক। দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধশীল, স্বপ্নবাজ মোস্তাফিজুর রহমানের চতুর্থ মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। মহান আল্লাহরাব্বুল আলামীন মরহুম মোস্তাফিজুর রহমানের কৃতকর্ম সমুহকে কবুল করে নিয়ে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন। আমীন।

(লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা।)