জাহাঙ্গীর আলম বকুল :

বরগুনায় স্ত্রী ও বহু পথচারীর সামনে প্রকাশ্যে যুবক রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যাকারী সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে ‘নয়ন বন্ড’র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে। এতে বিচারবহির্ভূত হলেও দ্রুত এবং শর্টকাট উপায়ে খুনির শাস্তি হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের ‘শাস্তিযোগ্য’ অপরাধীকে শাস্তি কার্যকরের শর্টকাট পথ এটি। আইন-আদালতে যাওয়া লাগে না। বাদীকে ১৫-২০ ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে টাকা উড়ানো লাগে না। একেবারে নগদে ‘শাস্তি’।

এদেশে কেউ যদি প্রকাশ্যে খুন করে এবং সেই খুনের যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং উপযুক্ত সাক্ষীও থাকে, তারপরও বিচার শেষে অপরাধীর শাস্তি হতে এক/দেড় যুগ লেগে যায়। আর অপরাধী যদি বিত্তশালী-ক্ষমতাবান হয়, তবে শাস্তি দেওয়া আরো দুষ্কর। আদালতে মামলার জট এবং বিচারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়।

যার স্বামী, সন্তান বা আপনজন খুন হয়, তাকেই অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয় এবং আইনজীবীদের পেছনে টাকা উড়াতে হয়। যেন আপনজন হারিয়ে তিনি অপরাধ করে ফেলেছেন। সেই হিসাবে রিফাত শরীফের হত্যাকারীর দ্রুত উপযুক্ত ‘শাস্তি’ হয়েছে। তবে অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত চলছে।

রিফাত শরীফকে যেভাবে দিবালোকে বহু মানুষের সামনে ফিল্মি স্টাইলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এবং হত্যার ভিডিও যখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অনেকে নয়নের ক্রসফায়ার দাবিও তোলেন। তার মৃত্যুর সংবাদ জড়িয়ে পড়লে প্রায় সকলে ফেসবুকে বা গণমাধ্যমে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। নয়ন বন্ড অন্তত আরেক রিফাত শরীফকে খুন করতে পারবে না, এটা ভেবে সবাই কিছুটা স্বস্তি অনুভাব করছে।

কিন্তু এক নয়ন অধ্যায়ের সমাপ্তিতে পুলকিত হওয়ার সুযোগ কি আছে? এরা একজন না। বহু নয়ন সমাজে রয়ে গেছে এবং বহু ‘নয়ন বন্ড’ প্রতিনিয়ত ‘তৈরি’ হচ্ছে। এদের কত জনকে ক্রসফায়ারে দেবেন? প্রতিনিয়ত ক্রসফায়ারের আতঙ্ক ছড়ানো সভ্য সমাজের সঙ্গে যায় না। কার্যত ক্রসফায়ার কোনো সমাধান নয়। ক্রসফায়ার দগদগে ঘা-এর উপরে মলমের প্রলেপ দেয়ার মতো, তাতে ক্ষতের উপরিভাগ সাময়িক শুকিয়ে যায় বটে। কিন্তু ভেতরের পচন অব্যাহত থাকে। সুষ্ঠু সমাজ নির্মাণ করতে হলে ভেতরের পচনরোধ করতে হবে। নয়ন বন্ডদের উৎপাদন রুখতে হবে।

রিফাত শরীফের হত্যার আরো দু-একটি ভিডিও ইন্টারনেটে এসেছে। এতে ঘটনার ভেতরের ঘটনাও প্রকাশ পাচ্ছে। তবে ঘটনা বা ভেতরের ঘটনাই- যা থাকুক না কেন, তাই বলে একজন মানুষকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা জায়েজ হতে পারে না। হত্যার বিচারে অন্য প্রসঙ্গ আসতে পারে না। তেমনি বিচারবহির্ভূত হত্যাও সমর্থন করা যায় না। দরকার দ্রুত বিচারের মাধ্যমে যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

নয়ন বন্ড বা রিফাত ফরাজীরা কেউ খুনী হয়ে জন্ম নেয়নি। তারা এই সমাজেই আরো পাঁচ জনের মতো আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছে। অথচ এরা তাদেরই সমবয়সী আরেকজনকে নির্দ্বিধায় কোপাল, তাদের হাত একটুও কাঁপল না। তাদের মনে একটু দয়ারও সঞ্চার হলো না। একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ কি পারবে- খুন করা দূরে থাক, এভাবে খুন করতে দেখতে? তিনি ভয়ে কি আড়ষ্ট হবেন না, একটুকু দয়া তার মধ্যে জাগবে না?

রিফাত শরীফের রক্তাক্ত শরীর দেখে নয়ন বন্ডদের মনে এতটুকু দয়ার উদ্রেক হয়নি। ভয়ও লাগেনি। বরং হত্যা করতে পেরে রোমাঞ্চ অনুভাব করেছে। হত্যার পর হলিউডের ভিলেনদের মতো স্বাভাবিক ছিল। স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পালিয়েছে। হত্যার পর তাদের অনুশোচনা জাগেনি। নয়ন তার মাকে বলেছে- ‘খুন করেছি, ঠিক করেছি।’ এই নয়ন কিন্তু এক দিনে ‘তৈরি’ হয়নি।

ধরেই নিলাম, নয়ন বা রিফাত ফরাজীদের হৃদয় ‘নষ্ট’ হয়ে গিয়েছিল। সেখানে স্নেহ, প্রেম, দয়া-মায়া, ভালোবাসা ছিল না। কিন্তু তাদের আইনের ভয় কেন ছিল না। যখন তারা রিফাত শরীফকে কোপাচ্ছিল, তখন কেন মনে এই ভয় জাগল না- এর জন্য কঠোর শাস্তি পেতে হবে। কে বা কারা তাদের অভয় দিয়েছেন? দীর্ঘ দিন ধরে নয়ন বন্ডদের ‘অভয়ারণ্যে’ বাড়তে দিয়েছেন? তারা কি ‘খুনী’ নন?

পত্রিকায় এসেছে- নয়ন, রিফাত ফরাজীরা এমপি, চেয়ারম্যানদের কৃপাদৃষ্টিতে ছোটখাট কাজ করে বেড়াত। এই ‘করে বেড়াতে’ বেড়াতে তাদের মনে আইনের প্রতি ভয় দূরীভূত হয়। তাই হত্যার সময় আইনের ভয় ছিল না। নয়ন তো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার হৃদয় মরে গিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রভাবশালীরা কি রিফাত হত্যার জন্য নিজেদের একটুও অপরাধী মনে করেন?

খুনের জন্য শাস্তি সব সময় নয়নদের হয়। কারণ এদের ক্রসফায়ারে দেওয়া সহজ। এদের হত্যায় ‘আসল অপরাধীরা’ যেমন আড়ালে থেকে যায়, তেমনি সমাজের দগদগে ক্ষতের উপর মলম লাগানো হয়। এতে সমাজের সভ্যরা কয়েক দিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। কিন্তু ওই ‘কয়েক দিনই’ মাত্র। ততো দিনে আমাদের এই ‘উৎপাদনশীল সমাজ’ আরো নয়ন বন্ড ‘তৈরি’ করে ফেলে।

এর আগেও সিলেটে কলেজ ক্যাম্পাসে বহু মানুষের সামনে কলেজছাত্রীকে চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে জখম করা, নিজেদের কিশোরী মেয়ের দ্বারা ঢাকায় সস্ত্রীক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা, ফরিদপুরে কিশোর ছেলেকে নতুন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কিনে না দেয়ায় আগুনে পুড়িয়ে বাবাকে হত্যা- এমন বহু ঘটনা সমাজের ক্ষতকে বাব বার সামনে নিয়ে এসেছে। প্রত্যেকবার অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু অপরাধ সংঘটনের ‘কারণ’ খুঁজে, তা করার চেষ্টা করা হয়নি।

নয়ন-রিফাত ফরাজীরা খুনী। তারা নিকৃষ্ট অপরাধ করেছে। কিন্তু সব দায় তাদের কাঁধে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকার সুযোগ নেই। এই সমাজে নয়নরা বড় হয়েছে, এই সমাজ তাদের ‘মানুষ’ বানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আমাদের সন্তানদের ‘মানুষ’ বানাতে ব্যর্থ হয়েছি। কিছুটা দায় আমাদেরও।

সামাজিক সংস্কৃতিতে বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ, পরিবারে মিলেমিশে ভাবের আদান-প্রদানে বড় হওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। সমাজ-পরিবার থেকে শিশুরা সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং মুরব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা করার শিক্ষা পাচ্ছে না। এখানকার এই যান্ত্রিক-ব্যস্ত নাগরিক জীবনে মানুষে-মানুষে ভাবের আদান-প্রদান কমে যাচ্ছে। মানুষ এখন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে হারিয়ে ফেলছে স্নেহ-মমতার পারিবারিক আবহ, শিশুরা থাকছে না সামাজিক অনুশাসনের মধ্যে।

আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে, তথ্য-প্রযুক্তির বিস্তারে পারিবারিক জীবনে অস্থিরতা বেড়েছে। নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ বিলুপ্ত হচ্ছে। পরিবার থেকে বিতাড়িত হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং অনুশাসন। নয়নদের ‘বেড়ে ওঠা’র ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এই ‘বেড়ে ওঠা’ রোধ করা না গেয়ে রিফাত শরীফদের হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যাবে না।

এক চিত্রশিল্পী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে ঠিক করলেন- তার পেশাগত জীবনের শুরুর ছবিটা সবচেয়ে নিষ্পাপ প্রাণির আঁকবেন। তিনি খুঁজে বের করলেন সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি শিশুকে। সেই সবচেয়ে নিষ্পাপ। তিনি তার ছবি আঁকলেন। ওই শিল্পী দীর্ঘ কর্মজীবন পাড়ি দিয়ে শেষ বয়সে পৌঁছালেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন- শেষ ছবিটি আঁকবেন পাপিষ্ঠ, কুৎসিত কোনো প্রাণির। তিনি ফাঁসি কার্যকর হতে যাওয়া এক ব্যক্তির ছবি আঁকলেন।

ওই নিষ্পাপ শিশু এবং ফাঁসি কার্যকর হতে যাওয়া মানুষটি ছিল একই ব্যক্তি।

লেখকঃ সাংবাদিক।

 

-রাইজিংবিডি