আজিম নিহাদ:
সীমান্ত উপজেলা উখিয়া-টেকনাফ ইয়াবার গেটওয়ে হিসেবে চিহ্নিত। পুলিশ ‘যুদ্ধ’ চালিয়ে টেকনাফে ইয়াবা পাচার ও ব্যবসা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসলেও উখিয়ায় ঠিক তার উল্টো চিত্র বিরাজ করছে। রহস্যজনক কারণে পুলিশের নিরবতার সুযোগে উখিয়ায় রমরমা চলছে ইয়াবা ব্যবসা।

উখিয়ায় অপ্রতিরোধ্য ইয়াবা ব্যবসার জন্য মাদকবিরোধী সচেতন মানুষ দায়ী করছেন উখিয়া থানার বর্তমান ওসি আবুল খায়েরকে। রোহিঙ্গা শিবিরে ভিআইপি প্রটোকল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের অযুহাতে ওসি ইয়াবা বিরোধী অভিযান এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ তুলছেন তারা। তবে দীর্ঘদিন পর উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়েরকে বদলী করা হয়েছে। উখিয়ায় ওসি হিসেবে যোগ দিচ্ছেন রামু থানার ওসি আবুল মনসুর।

দীর্ঘদিন পর নতুন ওসি পাওয়ায় ইয়াবা নির্মূলে কিছুটা হলেও আশা দেখছেন উখিয়ার সচেতন মানুষ। তাদের প্রত্যাশা ইয়াবা সা¤্রাজ্যে নতুন ওসি কিছুটা হলেও নাড়া দিবেন। ইয়াবার বিরুদ্ধে নতুন ওসি সোচ্চার হলে টেকনাফের মত উখিয়াতেও ধীরে ধীরে ইয়াবা নির্মূল কার্যক্রম অগ্রগতি পাবে বলে প্রত্যাশা তাদের।

অভিযোগ উঠেছে, প্রায় তিন বছর ধরে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে আছেন আবুল খায়ের। এই দীর্ঘ সময়ে উখিয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের তেমন কোন অভিযান দেখা যায়নি। এরফলে ইয়াবা বিরোধী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

তবে উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলছেন ভিন্ন কথা। তার দাবী, ইয়াবার বিরুদ্ধে পুলিশ বরাবরই কঠোর অবস্থানে। তেমনিভাবে উখিয়া থানাও সব সময় ইয়াবার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল এবং আছে। গত ৬ মাসে উখিয়া থানায় মাদক মামলা রুজু হয়েছে ১৬০টি। আর এসব মামলায় আসামী হয়েছে ২৭২ জন। প্রতিদিনই ইয়াবার বিরুদ্ধে ‘স্পেশালভাবে’ কাজ করে পুলিশ।

উখিয়ায় ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পর থেকে প্রায় ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। স্থানীয় নাগরিকের পাশাপাশি অতিরিক্ত এসব রোহিঙ্গাদের সামাল দিতে শুরু থেকেই হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে। তারপরও এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে বড় ধরণের কোন আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেনি। এরজন্য স্পেশালি উখিয়া থানা পুলিশ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করেন সচেতন মানুষ। আর রোহিঙ্গা আসার পুরো সময়টা সামালে নেতৃত্ব দিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের। একারণে ইয়াবা নির্মূলে ওসির বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে উদাসীনতার অভিযোগ নাকচ করছেন অনেকেই। তাদের দাবী, স্থানীয়দের পাশাপাশি এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা থাকা স্বত্বেও উখিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতটা খারাপ হয়নি। রোহিঙ্গাদের সামাল দেওয়ার পরও উখিয়া থানা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে যে ভূমিকা রেখেছে সেটাকে ‘খাটো’ করে দেখার সুযোগ নেই।

তবে সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে উখিয়া থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রশ্ন উঠে। ওসিকে টার্গেট করে সমালোচনাও হয়। ইয়াবা নির্মূলের জন্য তারা ওসিকে সরানোর দাবীও তুলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি জানান, উখিয়ার মরিচ্যা থেকে পালংখালী পর্যন্ত শত শত ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছে। পালংখালীর ৯ জন ইউপি সদস্যের মধ্যে আটজন চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী। সব ইয়াবা ব্যবসায়ীই বীরদর্পে বিচরণ করে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত রহস্যজনক।

কক্সবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘ওসি আবুল খায়েরের সময়ে উখিয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। নানা কারণে বা সীমাবদ্ধতার ফলে এটা হতে পারে। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের আরও বেশি প্রত্যাশা ছিল। এখন শোনা যাচ্ছে রামু থানার ওসি আবুল মনসুরকে উখিয়া থানায় বদলী করা হয়েছে। আমরা আশাকরি ওসি আবুল মনসুর জট বেঁধে থাকা ইয়াবা সা¤্রাজ্যে কিছুটা হলেও ধাক্কা দেবেন। কারণ ওসি আবুল মনসুর রামুতে মাদক এবং অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কিছু কাজ করেছেন। তাই উখিয়াবাসী আশা রাখতে পারে এবার অন্তত ইয়াবার বিরুদ্ধে কিছু একটা হবে।’

তিনি আরও বলেন, পাশর্^বর্তী টেকনাফে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ যোগদান করেই ইয়াবার বিরুদ্ধে যা করে দেখিয়েছেন সেটা রীতিমত অবাক করার মত। কিন্তু উখিয়াতে এধরণের অভিযান হয়নি কেন? এখন নতুন ওসিকে ঘিরে আমরা প্রত্যাশা রাখবো উখিয়ার ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবস্থাও যেন টেকনাফের মত হয়।

উখিয়া থানায় সদ্য বদলীর আদেশ পাওয়া (বর্তমানে রামু থানায়) ওসি আবুল মনসুর বলেন, ‘আমি যেখানে যায় না কেন আমার টার্গেট থাকে অপরাধ নির্মূল করা। তেমনিভাবে রামুতেও চেষ্টা করেছি। উখিয়ায় যোগদান করলেও আমার টার্গেট থাকবে অপরাধ নির্মূলের। তারমধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ইয়াবাকে। কোন অবস্থাতেই ইয়াবার বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের বর্তমান এসপি এবিএম মাসুদ হোসেন স্যার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছেন। স্যারের নির্দেশনায় উখিয়াতেও মাদকের সকল দুর্গ ভাঙতে চেষ্টা করবো।’

এদিকে গত ৭ জুলাই কক্সবাজারের কয়েকটি থানায় পুলিশে রদবদল করে আদেশ জারি করেন পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। এই আদেশে রামু থানার বর্তমান ওসি আবুল মনসুরকে উখিয়ার থানার ওসি এবং উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়েরকে রামু থানার ওসি হিসেবে বদলী করা হয়। এছাড়াও মহেশখালী থানার ওসি (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম চৌধুরীকে চকরিয়া থানার ওসি (তদন্ত) হিসেবে বদলী করা হয়। আর চকরিয়া থানার থানার ওসি (তদন্ত) আতিক উল্লাহকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক হিসেবে বদলী করা হয়।

মহেশখালী থানায় ওসি (তদন্ত) হিসেবে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক বাবুল আজাদকে। আদেশের তিনদিনের মধ্যে তাদেরকে যোগদান করতে বলা হয়। পুলিশে রদবদলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন।