হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর

একের পর এক খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ লোমহর্ষক ঘটনাবলী সংঘটিত হচ্ছে। দিন দিন পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে। বাড়ছে নির্মমতা। কাঁদছে মানবতা। লোপ পেতে বসেছে নৈতিকতা। যেন আইয়্যামে জাহেলিয়াতের পদধ্বনিই শুনতে পাচ্ছি। অপরাধীদের বিষাক্ত ছোবল থেকে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কোনটাই রেহাই পাচ্ছেনা। ছদ্মবেশী এসব পাপিষ্ঠ মানুষদের নগ্নথাবা থেকে রেহাই পাচ্ছেনা শিশু-কিশোর, তরুণী থেকে শুরু করে ৯০ বছরের বৃদ্ধাও। যেখানে আদর্শিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত সুমানুষ তৈরী হওয়ার কথা সেরকম অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আজ শিক্ষক ছদ্মবেশী অমানুষদের অনৈতিক ও অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছে স্বয়ং শিক্ষার্থীরাই।

সাম্প্রতিক সময়ে এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষের যৌন লিপ্সার শিকার হওয়ার পরিণতিতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ছাত্রীর করুণ মৃত্যু, প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিতা হয়ে ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, একটি প্রাইভেট কলেজের অধ্যক্ষ কর্তৃক ২০ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ, প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক নির্মমভাবে শিশু শিক্ষার্থীকে হত্যা, মাদ্রাসা প্রধানের মুখোশধারণ করে ১২ জন শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ইত্যাদি লোমহর্ষক ঘটনা ও চাঞ্চল্যকর খবরে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যেখান থেকে মানবিক চেতনাবোধের উজ্জীবন, আদর্শের বিকাশ ও নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশ হওয়ার কথা সেই পাঠশালায় কেন এমন বর্বরতার মহড়া! যারা নীতি-নৈতিকতার অতন্দ্র প্রহরী মানুষ গড়ার কারিগর নামক সেই শিক্ষকদের কাতারে এমন নরপশুদের অনুপ্রবেশ! যাদের স্নেহ- মমতার নির্মল পরশে, পাঠশালার পবিত্র ক্যাম্পাসে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের উন্নত আদর্শ, মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রভাবে আলোকিত মানুষ হয়ে বেড়ে উঠার কথা তাদের হাতেই কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীর নির্মম হত্যাকান্ড!

মাদকাসক্তিসহ সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে ওয়াজ করায় সর্বোচ্চ সম্মানের পাত্র ইমাম সাহেবের ওপর চেয়ারম্যান কর্তৃক বর্বর কায়দায় নির্মম নির্যাতন! যারা আদর্শিক অভিযাত্রায় পথনির্দেশক সে রকম অনেকের আদর্শচ্যুতি! সেবার মানসিকতা পরিহার করে স্বার্থান্ধতা ও ক্ষোভের বশবতী হয়ে সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসকদের ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালনের নামে অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসা বঞ্চিত করা এমনকি অনেক রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া! দেশের এক উচ্চ শিক্ষায়তন যেখানে মাদকের কুফল ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়দীপ্ত সুনাগরিক গড়ার কথা সেখানে অতিরিক্ত মাদক সেবনে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু! দিবালোকে রাজপথে কুপিয়ে তরুণ রিফাতকে নির্মমভাবে হত্যা, দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত কিশোর ভ্যান চালক শাহীনকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তার জীবিকার একমাত্র সম্বল ভ্যানটি ছিনতাই, আপন মা কর্তৃক নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে কুপিয়ে হত্যা। সর্বোপরী সর্বত্র মাদক, অশ্লীলতা, বেহায়পনা, দূর্নীতি, দূরাচার, মিথ্যাচারের সয়লাব! মানবিক মূল্যবোধের এমন বিপর্যয়, নৈতিকতার চরম এ অবক্ষয় যেন জাহেলী যুগের বর্বরতার পদধ্বনি।

সম্প্রতি একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ড, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টিসহ ভয়াবহ দূর্যোগ, দুর্বিপাক এসব পাপাচারেরই ভয়াবহ পরিণাম। এরকম করুণ ও সঙ্কটময় পরিস্থিতির উত্তরণে আমাদের প্রয়োজন পাপাচার ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করা। শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার সাথে সাথে আত্মশুদ্ধিরও প্রশিক্ষণ দেয়া। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে চারিত্রিক গুণাবলীকেই প্রাধান্য দেয়া। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে নেতৃস্থানীয় ওলামায়েকেরামের সম্মিলিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা। জেনারেল শিক্ষাধারা ও আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে সহশিক্ষার প্রচলতি পদ্ধতি পরিবর্তন করা এবং স্বতন্ত্র মহিলা মাদ্রাসা ও মহিলা, বালিকা বিদ্যালয়গুলো পুরুষমুক্ত ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ধর্মীয় চেতনাবোধ জাগ্রত করা, ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা । বিজ্ঞাপন ও বিনোদনের নামে নগ্ন ছবি প্রদর্শনী, প্রযুক্তির অপব্যবহার, যৌন উদ্দীপক কুরুচিপূর্ণ সাহিত্য রচনা ও পাঠ নিষিদ্ধ করা। নগ্ন পোশাকের অপসংস্কৃতি রোধ এবং শালীন লেবাস পরিধান ও পর্দার বিধান বাস্তবায়নে যত্নবান হওয়া। কারাগারে বন্দী অপরাধীদের মধ্যেও আত্মশুদ্ধিও অনুশোচনাবোধ জাগ্রতকারী পদক্ষেপ নেয়া। শিক্ষক, চিকিৎসক ও জনপ্রতিনিধি সকলের মধ্যে সেবার মানসিকতা ও নৈতিক কর্তব্যবোধ সৃষ্টি করা। অভিভাবকদের নিজেদের সন্তান -সন্ততিদের পড়া-লেখাসহ সার্বিক বিষয়ে যথাযথ দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা, পারিবারিক পাঠশালায় সন্তানদের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষায় গড়ে তোলা। অন্যায়-অনাচারের সাথে যেই জড়িত হোক যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। সর্বোপরি সবরকমের অন্যায়- অবিচার, দূর্নীতি, দূরাচারের বিরুদ্ধে যার যার অবস্থান থেকে দূর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

লেখক – খতীব শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউট জামে মসজিদ, কক্সবাজার। সভাপতি রামু লেখক ফোরাম।