আজাদ মনসুর
যদি বলি মেয়েরা বয়স লোকায়। কিন্তু পত্রিকা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ বা সম্পাদকমন্ডলীদের মধ্যে যারা নিয়োজিত তারাও পত্রিকার সার্কোলেশন সম্পর্কিত তথ্য গোপন রাখে। এমনকি ওই পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা মাঠ পর্যায়ের কেউ জানে না কাজ করা পত্রিকাটির সঠিক সার্কোলেশন কত? পত্রিকার ডিএফপি এবং সার্কোলেশনের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনের ধরণ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দর নির্ধারণসহ আনুষাঙ্গিক কর্মপরিধি ঠিক করে মালিকপক্ষ। কিন্তু কাগজে-কলমে হাজার হাজার সার্কোলেশন দেখিয়ে কতিপয় মালিকপক্ষ বিবিধ সুবিধা লুটে নেয় বৈকি। তবে ঢাকা শহরের অনেক পত্রিকার সার্কোলেশন ভাল পর্যায়ে থাকলেও কথা আর কাজে মিল থাকেনা। অনেক পত্রিকার সার্কোলেশন আরও খারাপ পর্যায়ে এমনকি ওই পত্রিকাগুলো অনিয়মিতও। টিকিয়ে থাকতে মাঝে মাঝে পত্রিকাগুলো কয়েক’শ কপি ছাপানো হয়।

গেল ষষ্ঠ পর্বে বলছিলাম পত্রিকাগুলোর প্রতিদিনের সার্কোলেশন কতো? কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথা’র আজকের সপ্তম পর্ব।

একজন সাংবাদিক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে রাজনৈতিক, আর্থিকসহ অন্যান্য বিষয়ে অভিযোগ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হলে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য অবশ্যই রিপোর্টের সঙ্গে থাকতে হবে। ঐ ব্যক্তির বক্তব্য ছাড়া সংবাদ প্রকাশ হতে পারে না।

দেখা যায়, অনেক সময় কিছু কিছু সংবাদপত্র ওইসব সংবাদ ছাপায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোন কর্তাদের বক্তব্য ছাড়া।

অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের কাছে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। পত্রিকা সংশ্লিষ্ট কেউ যাতে না জানে তারা পত্রিকার সার্কোলেশন নিয়ে মাতামাতি করে।

পত্রিকায় সংবাদ করলে তারা বলে-করুক। চাঁদাবাজি করার জায়গা পাচ্ছেনা। প্রতিদিন ১০০-২০০ কপি পত্রিকা ছাপিয়ে আমার কাছে সাংবাদিকতা করতে আসছে। প্রয়োজনে খুব ভোরে পত্রিকার দোকান এবং হকারদের কাছ থেকে সব পত্রিকা কিনে নিব। ইত্যাদি…

বলতে শুনেছি, এখন পথে পথে সাংবাদিক, ১০০ টিয়া দিলে রোই দে। ২০০ টিয়া দিলে আবার আঁরি দে (গ্রাম্য প্রবাদ) অর্থ্যাৎ- সাংবাদিকদের কেউ ১০০ টাকা দিলে রোপন করে, ২০০ টাকা দিলে রোপিত চারা তুলে দেয়।

প্রত্যেক দিন তু দেখছি অনেক সাংবাদিক পথে পথে পেপার বিক্রি করতে। যদি বলি, উখিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, পেকুয়াসহ অনেক উপজেলা ও সাংগঠনিক উপজেলাগুলোতে দৃশ্যমান অনেক সাংবাদিক নামধারী সংবাদপত্রের হকারগিরি করে পত্রিকা বিক্রি করছে। আসলে ব্যক্তির কথা মিল পেয়েছি।

কক্সবাজার সদর উপজেলা ঈদগাঁওতে আমার বাড়ি হওয়ায় আমি দেখেছি একজন পত্রিকার হকার তিনি আবার নিয়মিত সাংবাদিকতা করছে। উখিয়া উপজেলায় কর্মের কারণে অনেকদিন থেকেছি। ওখানেও পত্রিকার হকার কিন্তু সাংবাদিকতা করছে। দু’জনই কিন্তু আমার পরিচিত। এভাবে সাংবাদিকতার মান ক্ষুন্ন করছে কতিপয় সাংবাদিক নামধারী পত্রিকার হকার। এই হচ্ছে অবস্থা।

আমার সুযোগ হয়েছে কয়েকটি পত্রিকায় বার্তা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে দেখেছি পত্রিকার সার্কোলেশন কোন পর্যায়ে। বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের আগে সংবাদের দায়িত্ব শেষ করে চলে যেতে পারতাম। তখন পত্রিকার সার্কোলেশন নিয়ে মাথা ব্যথা করতাম না।

অনেকবার জানতে চেয়েছি, কর্তাবাবুরা বলতেন -আজ পত্রিকার সার্কোলেশন ৩০০০ হাজার। এই রকম আরও অনেক পত্রিকার সার্কোলেশন সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। জেনেছি ৩০০০, ৪০০০, ৫০০০ আবার কিছু কিছু পত্রিকার সার্কোলেশন নাকি ৭০০০ কপি। আফসোস! কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার আগে জানতে চাইতেন আপনার পত্রিকা কয়টি ছাপা হয়? তাই সার্কোলেশন সম্পর্কে বেশি নজরে আসে। তাই কৌতুহলও বাড়তে থাকে।
যখন বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে আসিন হলাম, তখন তো সংবাদ দিয়ে বাড়ি যাওয়া সুযোগ নেই।

বিভিন্ন উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ দেখা, বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা সংবাদ দেখা, কোন সংবাদটি যাবে কোন সংবাদটি যাবেনা এটা ঠিক করা, পত্রিকার ডেস্কের সংবাদ দেখা, কম্পিউটারে কম্পোজ ম্যানের টাইপ করা সংবাদ দেখা, কম্পিউটারে অপারেটরের সাথে পত্রিকা মেকাপসহ ট্রেসিং প্রিন্ট দেখা থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয়টি দেখভাল করা যখন দায়িত্বে বর্তায় তখনই সার্কোলেশনের আসল রহস্য উৎঘাটন করতে পারলাম।

আমি হলফ করে বলতে পারি, বর্তমানে দু’একটি পত্রিকা ছাড়া সবকটি পত্রিকা কিন্তু ৩০০ থেকে বেশি যদি ধরি ৫০০ কপি ছাপা হয়। এমনও আছে ৫০০ কপি তো দূরের কথা ২০০-৩০০ কপিই যথেষ্ট।

আপনাদের বুঝার সুবিধার জন্য ৩০০-৫০০ কপি কিভাবে বণ্টন হয় দেখুন। প্রত্যেক উপজেলা প্রতিনিধিদের জন্য ২০-৩০টি, যেহেতু পত্রিকাগুলো দু’জন করে প্রতিনিধি-সংবাদদাতা নিয়োগ দিয়েছে সেক্ষেত্রে সংবাদদাতার জন্য ২০-৩০, সাংগঠনিক উপজেলা প্রতিনিধি ঈদগাঁও ২০, ৩০, ৪০ অথবা ৫০ কপি। এই রকম কয়েকটি এলাকায় আলাদা সংবাদদাতা রয়েছে তাদের জন্য ১০-২০টি। বিভিন্ন অফিস আদালত বা সরকারি দপ্তরগুলোতে সৌজন্য কপি, অফিস কপি ও অন্যান্য কপি মিলেই ৩০০-৫০০ কপি বণ্টন হয়ে যায়। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা এমনও পত্রিকা আছে কক্সবাজারে ১৫০-২০০ কপি সংবাদ ছাপিয়ে দায় ছাড়েন এবং নিজেদেরকে সম্পাদক ও সম্পাদকমন্ডলীর অমুখ-তমুখ বলে সর্বত্র দাপিয়ে চলার মানসিকতায় পত্রিকা টিকিয়ে রেখেছেন বাবুরা।

আমার কথায় অনেকে একমত নাও হতে পারেন। আসলে বাস্তবতা তাই। পাঠক আজকের পর্ব শেষ করব একটি পত্রিকার অপমৃত্যুর খবর দিয়ে। সংগত কারণে ঘটনাটি আপনাদের জানা দরকার কোন এক সময় পড়ছিলাম ঠিক আমার সময়টি জানা নেই। কিন্তু পড়ে ভাল লাগছিল তাই নোট করে রাখছিলাম।

এক সময় কলকাতায় কোনো পত্রিকা ছিলনা। এই ব্যবসায় লাভবান হওয়া যাবে বলে হিকির পর্যবেক্ষণ ছিল। প্রায় আড়াই বছর একচেটিয়া ছাপাখানা চালানোর পর হিকি একটি পত্রিকা বের করলেন। পত্রিকার নাম দিলেন নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে।

১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি বের হওয়া এ পত্রিকার নাম দেন ‘হিকি’জ বেঙ্গল গেজেট’।

পত্রিকার মালিক এবং সম্পাদক ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি নিজেই। পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিন পরই সরকারি রোষে পড়েন। অবশ্য এখানে হিকির স্বেচ্ছাচারিতা ছিল অনেক বেশি। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বা ফিচারের মান যেমনই হোক না কেন, হিকি অল্পকালের মধ্যেই আবিষ্কার করেন তার হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। এই অস্ত্রের মাধ্যমে জনগণ পর্যন্ত যে কোনো বার্তা তার পক্ষেই বেশি পৌঁছানো সম্ভব। আর তাই খুব দ্রুত সে অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করলেন।
হিকির প্রচারিত খবরে গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস থেকে শুরু করে কোম্পানির যে কোনো কর্মচারীর সমালোচনা করতে শুরু করলেন। হেস্টিংসকে সাধারণত আক্রমণ করত তার স্ত্রীর নাম করে। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রুপ, কটাক্ষ এবং ভিত্তিহীন গুজব প্রকাশের কারণে জনগণের কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। হিকির সরকারবিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করে কোম্পানি-সরকারই বার্নার্ড মেসিংক এবং পিটার রিডকে পরোক্ষভাবে সাহায্য দিয়ে ‘দ্য ইন্ডিয়ান গেজেট’ পত্রিকা প্রকাশ করায়। সরকার ডাক বিভাগের মাধ্যমে এই পত্রিকা পাঠানোর সুযোগ দেয়। অন্যদিকে হিকির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। এরই জের ধরে পরের বছর হিকির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন হেস্টিংস। এতে হিকি কারাগারে গেলেও একইভাবে ‘বেঙ্গল গেজেট’-এর প্রকাশ অব্যাহত থাকে। ১৭৮২ সালে সরকার হিকির ছাপাখানার সব টাইপ কেড়ে নেয়। এভাবেই ভারতবর্ষের প্রথম পত্রিকার অপমৃত্যু ঘটে। চলবে…

আজাদ মনসুর (এম.এ, এলএল.বি) শেষবর্ষ
আইটি স্পেশালিষ্ট, প্রণেতা-কক্সবাজার সাংবাদিক কোষ, সভাপতি-কক্সবাজার সাংবাদিক সংসদ (সিএসএস)
azadcox90@gmail.com ০১৮৪৫-৬৯ ৫৯ ১৬