নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারের রামু উপজেলার প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম চাকমারকুল (চাকমারকুল মাদরাসা)-এর শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে বহিরাগত একটি চক্র। দ্বীনিশিক্ষা পরিপন্থী ওই কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নামের বহিস্কৃত একজন শিক্ষক। গত মাসখানেক সময় ধরে অব্যাহত চক্রান্তের অংশ হিসেবে শনিবার (২২ জুন) সকালে ক্লাস চলাকালীন সময়ে ক্লাসে ঢুকে শিক্ষকদের পাঠদানে বারণ ও নোটিশ বোর্ডে থেকে ক্লাস রুটিন ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। কমান্ডো স্টাইলে মাদরাসা থেকে নিয়ে গেছে শিক্ষক হাজিরা বহি। এছাড়া বেল (ঘণ্টা) বাজাতে বাধা ও শিক্ষকদের মুঠোফোনে হুমকির অভিযোগ উঠেছে বহিস্কৃত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। খবর পেয়ে শনিবার বিকাল সাড়ে ৩ টার দিকে রামু থানার পুলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইমতিয়াজ উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এসময় মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাকসহ শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থী এমন কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাককে সতর্ক করেছে পুলিশ কর্মকর্তা ইমতিয়াজ উদ্দিন। সেই সাথে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটালে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার সকাল দশটার দিকে দাওরায়ে হাদিসে মুসলিম শরীফের ক্লাস চলাকালে শিক্ষক মাওলানা সোলাইমান, জামাতে উলার তাফসীরে জালালাইন ক্লাস চলাকালে শিক্ষক মাওলানা হারুনুর রশিদ জাদীদকে ক্লাস নিতে বারণ করেন মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক। একইভাবে মাওলানা হারুনুর রশীদ কদিমের কক্ষে ঢুকে তাকে ক্লাস না নিতে হুমকি দেন। ঘন্টা বাজানোর দায়িত্বরত মাওলানা আজিজুর রহমানকেও ঘণ্টা বাজাতে নিষেধ করেন। এরকম আরো অসংখ্য অভিযোগ বহিষ্কৃত শিক্ষক মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে। তার কারণে একটি ঐতিহ্যবাহী মাদরাসার শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষকদের মানসম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম।
তিনি জানান, একই সাথে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসাবে কর্মরত থাকা, বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকাসহ প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে মাওলানা আব্দুর রাজ্জাককে গত ৭ মে পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তিনি আরও জানান, মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মাদরাসা সংলগ্ন কলঘর বাজারস্থ জালাল আহমদের বাড়িতে মাদরাসার স্বার্থ বিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করেন। নিজেকে মুহতামিম দাবি করে মাদরাসা ফটকে তালা লাগিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার কারণে কওমি মাদরাসার সংবিধানের ১৮ (ঙ) ধারায় প্রদত্ত মুহতামিমের ক্ষমতা বলে ২৬ (গ) এর ৩ ও ৪ উপধারা মোতাবেক শিক্ষক পদ থেকে আব্দুর রাজ্জাককে সাময়িক অব্যাহতি প্রদান করা হয়। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করেছে তিনি।
এদিকে, গত ১৫ মে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মাদ্রাসার বিরুদ্ধে মামলা করেন স্থানীয় জালাল আহমদ নামের এক ব্যক্তি। যার নং-এমআর ৫২৪/১৯। অথচ তিনি মাদরাসার শিক্ষক, কর্মচারী, অভিভাবক নন, এমনকি তার সঙ্গে মাদরাসায় কোন ধরণের সংশ্লিষ্টতা নাই। ২০ মে মামলার প্রথম শুনানি হয়। আদালতের আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে ২৬ মে আবেদন করেন মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম।
গত ১৭ জুন দ্বিতীয় শুনানিতে এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহজাহান আলী। সেই সঙ্গে মাদরাসার আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোন কর্মকান্ড হলে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে নির্দেশ দেয় আদালত।
এই নির্দেশনা অনুযায়ী মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান বলে মন্তব্য করছে স্থানীয়রা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বহিষ্কৃত শিক্ষক মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদিআরব অবস্থানকালে নিয়ম বহির্ভূতভাবে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।
শিক্ষকদের ক্লাসে হুমকি, রুটিন ছিঁড়ে ফেলা, হাজিরা বহি নিয়ে যাওয়াসহ নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, প্রশাসনকে চাপে রাখতে এবং আমার ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে এমনটা করেছি।
যদিওবা একজন আলেম হিসাবে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন কর্মকাণ্ড বিবেক সম্মত ও আইনসিদ্ধ হয়েছে কিনা? জানতে চাইলে কোন জবাব দিতে পারেননি মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা বলেন, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিক্ষাব্যবস্থা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তাই বিবাদমান দুই পক্ষকে নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আলেম-উলামা ও শিক্ষকদের নিয়ে বিধি মোতাবেক একটি কমিটি গঠন করে মাদরাসা পরিচালনার নির্দেশ দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিনি বলেন, দুই-একদিনের মধ্যে উভয়পক্ষকে ডাকা হবে। আশা করি, বিরাজমান সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে।
১৯৪৬ সালে চাকমারকুল মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে বর্তমানে এক হাজারের অধিক শিক্ষার্থী এবং প্রায় অর্ধশত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি ভিত্তিহীন কিছু অভিযোগের অবতারণা করে মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি চক্র ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
দক্ষ পরিচালনা পরিষদ ও কওমি মাদরাসা বিধি বিধান অনুসারে এই মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রম ও উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব ধরনের ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে এলাকাবাসী।