মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার সদর উপজেলার ১০৮ টি ভোট কেন্দ্রে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) এ ভোটারদের ভোট গ্রহনের মহড়া সম্পন্ন হয়েছে। সরকরি ভাষায় এটাকে বলে ‘মকভোটিং’। শুক্রবার সদর উপজেলার ১০৮ টি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম-এর মাধ্যমে ভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করে ভোটারদের জন্য সরাসরি অনুশীলনমূলক এই ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভোটকেন্দ্র গুলোতে সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত পরীক্ষামূলক এ অনুশীলন ইভিএম ভোট প্রক্রিয়া চলে। সেজন্য প্রত্যেক ভোট কেন্দ্রে বৃহস্পতিবারই ইভিএম মেশিন, কম্পিউটার, ডিজিটাল ব্যালট ইউনিট, এসডি কার্ড সহ আনুসাঙ্গিক সকল সাপুর্টিং মেশিনারিজ পাঠানো ও ফিটিং করে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। দু’দিন আগেই ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দেয়ার ব্যপারে ভোটারদের প্রেক্টিক্যাল অনুশীলন হওয়ায় ইভিএম-এ কোন ত্রুটি দেখা দিলে, তা সংশোধনের ব্যবস্থা থাকবে।

বিষয়টি সহকারি রিটার্নিং অফিসার সিবিএন-কে নিশ্চিত করে বলেছেন-শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া মকভোটিং এ কোথাও ইভিএম মেশিনে ত্রুটির খবর পাওয়া যায়নি। সবকেন্দ্রে ভোটের মহড়া সুষ্ঠুভাবে হয়েছে। তিনি জানান-এই অনুশীলন ইভিএম ভোটে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল নির্বাচনী কর্মকর্তা ছাড়াও ইভিএম বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ানেরা একসাথে কাজ করেছে। ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং ও টেকনেশিয়ান টিমও কাজ করছে। তবে বেশ ক’টি ভোট কেন্দ্রে খবর নিয়ে দেখা গেছে-ভোটারদের উপস্থিতি একেবারে হতাব্যান্ঞ্জক। মকভোটিং এ সবখানেই শতকরা ১০ ভাগেরও কম ভোটার উপস্থিতি ছিল। কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ডের আবুবকর ছিদ্দিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুক্রবার বিকেল চার টার দিকে গিয়ে দেখা গেছে-এ কেন্দ্রের ২৫০৩ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ৬৩ জন ভোটার প্রশিক্ষণমূলক অনুশীলন ভোট দিয়েছে। এই ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ও জেলা পল্লী উন্নয়ন কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিডি মোঃ মহিউদ্দিন শরীফ জানান, তাঁর ভোট কেন্দ্রে ইভিএম-এ ভোট গ্রহনে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়নি। একই কেন্দ্রের সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ও কক্সবাজার সিটি কলেজের কম্পিউটার প্রদর্শক কলেজের মোহাম্মদ মুহিদুল্লাহ জানান-মকভোট দেয়ার জন্য ভোটার যারা এসেছিল, তাদের ভোট দেয়ার আগ্রহ খুব বেশী। আরেক সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ও পশ্চিম চৌফলদন্ডী হাকিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দ্বীন মুহাম্মদ জানান-ভোটারদের ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিতে আমরা উৎসাহিত করছি। ভোটারদের প্রেক্টিক্যাললি মকভোটিং শেখানো হচ্ছে। কক্সবাজারের দায়িত্বে থাকা বান্দারবান জেলা নির্বাচন অফিসার শাহাদাত হোসেন, চকরিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার সাখাওয়াত হোসেন, পেকুয়া ও মহেশখালী নির্বাচন অফিসার আবু বকর ছিদ্দিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করে সার্বিক বিষয়াদি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

কক্সবাজার সদর উপজেলায় মোট ১০ টি ইউনিয়ন ও একটি পরৌসভা রয়েছে। মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১০৮ টি। ভোট কক্ষ রয়েছে ৫২০ টি। ভোটার রয়েছে মোট ২৫৬৬৪৪ জন। তারমধ্যে পুরূষ ভোটার ১৩৫৪৪২ জন এবং মহিলা ভোটার ১২১২০২ জন। প্রত্যেক ভোট কেন্দ্রের জন্য একজন করে প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১২ জন অতিরিক্ত প্রিজাইডিং অফিসারকে যেকোন সময় আপদকালীন দায়িত্বপালনের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে স্টেনবাই রাখা হয়েছে। কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন-আওয়ামীলীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের কায়সারুল হক জুয়েল, স্বতন্ত্র প্রার্থী আনারস প্রতীকের সেলিম আকবর, ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুল আবছার, লাঙ্গল প্রতীকের অধ্যাপক আতিকুর রহমান ও মটর সাইকেল প্রতীকের আবদুল্লাহ আল মোর্শেদ (তারেক বিন মোকতার)। এছাড়া ৮ জন পুরূষ ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ৩ জন মহিলা ভাইসচেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সদর উপজেলায় রোববার ৩১ মার্চ সকাল ৮ টা থেকে বিরতিহীনভাবে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত ইভিএম-এ প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহন করা হবে। কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার শিমুল শর্মা জানান-সদর উপজেলায় মোট ১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দায়িত্বপালনের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব কুমার বিশ্বাসকে সদর উপজেলা নির্বাচনে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি শুক্রবার ২৯ মার্চ সকাল থেকেই ২ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন বলে অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল আদালতের সিনিয়র বেন্ঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ আমির হোসেন সিবিএন-কে জানিয়েছেন। তিনি নির্বাচনী অপরাধ ও অভিযোগ সমুহ আমলে নিয়ে দোষীদের জরিমানা, সতর্ক করা সহ বিভিন্ন বিচারিক কার্যক্রমের দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিজিবি, র‍্যাব, আনসার সদস্যও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শুক্রবার বিকেল থেকেই তারা সকলে দায়িত্ব পালন শুরু করছেন। শনিবার রাত থেকেই সদর উপজেলার সর্বত্র মোটর সাইকেল চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শনিবার বিকেল থেকে অত্যাবশ্যকীয় যানবাহন ছাড়া অন্য সকল প্রকার যান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। আশেপাশের নৌএলাকায় নৌযান চলাচলও বন্ধ রাখা হবে। পাশ পাওয়া গণমাধ্যম কর্মী, পর্যবেক্ষক, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্যরা ভোটকেন্দ্র এলাকায় যেতে পারবেননা। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের শুক্রবার রাতের মধ্যেই কক্সবাজার সদর উপজেলা এলাকা ত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যান্য উপজেলার পর্যটকদের শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যতদূর সম্ভব কক্সবাজার সদর উপজেলার ভৌগলিক এলাকা এড়িয়ে যেতে নির্বাচন কমিশন থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন গ্রহনের দিন রোববার ৩১ মার্চ কক্সবাজার সদর উপজেলায় জনপ্রশাসন মন্ত্রনায়ের এক প্রজ্ঞাপনে ইতিমধ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে। এ দিন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ও অত্যাবশ্যকীয় অফিস ছাড়া সকল সরকারী, বেসরকারি, আধাসরকারী, স্বায়তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, সংস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এদিকে নির্বাচনে কোন ধরনের গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা, সন্ত্রাস, পরিবেশকে অশান্ত করতে চাইলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে বলে উল্লেখ করে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.বি.এম মাসুদ হোসেন বিপিএম সিবিএন-কে জানান-নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের নিরাপত্তামূলক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী কোন পক্ষকে কোন প্রভাব বিস্তার করতে সুযোগ দেয়া হবেনা উল্লেখ করে তিনি বলেন-অন্ত্যন্ত শান্তিপুর্ণ, ভীতিমুক্ত, নিরাপদ ও ভোটারবান্ধব পরিবেশে ভোট গ্রহন করা হবে ইনশাল্লাহ। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এসপি এ.বি.এম মাসুদ হোসেন বিপিএম আরো জানান-সদর উপজেলার সর্বত্র বৃহস্পতিবার থেকেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। পাশছাড়া কোন বহিরাগত আসলেই আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন-গত ১৮ মার্চ ও ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত জোলার অন্য ৬টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের মতোই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল সদস্য ভয়ভীতি, হুমকি উপেক্ষা করে কঠোর ও পেশাদারিত্বের সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে ইনশাল্লাহ। পুলিশ সুপার জানান-নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারী সকল পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার জন্য শনিবার কক্সবাজার পুলিশ লাইনে ব্রিফিং প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া শুক্রবার সকাল সকাল সাড়ে আটটায় জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ের শহীদ এ.টি.এম জাফর আলম সম্মেলন কক্ষে নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ অফসার সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহনযোগ্য করার ব্যাপার প্রয়োজনীয় ব্রিফিং দিয়েছেন।