চ্যানেল আই : প্রতি রোহিঙ্গা নারী পাচার করতে ৫০ হাজার টাকার বাজেট ছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্রের। তারা জবাবদিহি কিংবা আইনি ঝামেলা এড়াতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীদের টার্গেট করেছে।

ইতিমধ্যে ভুয়া পরিচয়ে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করে চার রোহিঙ্গা নারীর জন্য পাসপোর্টের আবেদন করা হয়েছিল। তবে পাসপোর্ট তৈরি হওয়ার আগেই ওই চার রোহিঙ্গা নারীসহ পাচারকারী চক্রের দুই সদস্যকে আটক করতে সক্ষম হয় র‌্যাব-৩।

উদ্ধার রোহিঙ্গা নারী হাসিনা বেগম (২৫) মিয়ানমারের মন্ডু শহরের বাগঘুনা এলাকার বাসীন্দা এবং বুশরা আক্তার (১৯), ছাবেকুন্নাহার (১৮) ও রুমা আক্তার (১৮) মিয়ানমারের ভুচি দং এলাকার বাসিন্দা। তারা সে দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর কক্সবাজারের উখিয়া বালুখালি ক্যাম্পে বসবাস করছিলো।

মঙ্গলবার রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে পাচারকারী চক্রের সদস্য আব্দুল হামিদকে (৩০) আটক করা হয়। পরে তার তথ্য অনুযায়ী কেরানীগঞ্জ থেকে পাসপোর্ট তৈরির দালাল রিয়াদ হোসেনকে (৩৪) আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৩৩ টি পাসপোর্টসহ বিপুল পরিমান ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের কপি, পাসপোর্টের ফরম ও একটি কম্পিউটার জব্দ করা হয়।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. এমরানুল হাসান।

আটকদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তিনি বলেন: কক্সবাজারের বাসিন্দা হামিদ গত প্রায় ১০ বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তায় মানবপাচার চক্রের সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছিল। ৯০ এর দশক থেকে হামিদ পরিবারসহ সৌদি আরবে বসবাস করছিলেন। পরবর্তী সময় ২০০৩ সালে পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে ফেরত আসলেও সেখানে থেকে যান হামিদ। এরপর ৬ মাস জেল খাটার পর ২০০৮ সালে দেশে ফিরে মানবপাচারের কাজে জড়িয়ে পড়েন।

শরনার্থী ক্যাম্পে অবস্থানকালে মানবপাচার চক্রের দালাল জাহিদের প্রলোভনে সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় চার নারী। মার্চের প্রথম সপ্তাহে দালাল জাহিদ ও মোমিনুলের সহায়তায় ঢাকায় এসে খিলগাঁওয়ে আটক হামিদের ভাড়া বাসায় এসে বসবাস শুরু করেন। কক্সবাজারের দালাল জাহিদ ও মোমিনুলও মিয়ানমারের বংশোদ্ভুত নাগরিক।

মার্চের প্রথম দিকে চার রোহিঙ্গা নারী ঢাকায় নিজের বাসায় আসার পর একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে তাদের পাসপোর্ট করার জন্য কেরানীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করে হামিদ।

হামিদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-৩ এর সিও আরো বলেন: সৌদি আরবে নারী পাচার করতে কোন টাকা লাগত না। এ কারণে খুব সহজেই অসহায় নারীদের প্রলুব্ধ করা যায়। সম্প্রতি চক্রটি রোহিঙ্গা নারীদের টার্গেট করে। কারণ, সেই দেশে নারীরা নির্যাতনের শিকার হলে জবাবদিহি করতে হবেনা এবং ভুক্তভোগীরা আইনী আশ্রয় নিতে পারবেনা।

প্রতিজন রোহিঙ্গা নাগরিক পাচারের ৫০ হাজার টাকা করে বাজেট চক্রটির। এর মধ্যে হামিদ ১৫ হাজার টাকা এবং তাদের ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়মিত পেতো।

আটক রিয়াদের কেরানীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের পাশে একটি ফটোকপির দোকান রয়েছে। সে নিজের ইচ্ছেমতো ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করে নিজেই প্রয়োজনীয় কাগজ সত্যায়িত করে পাসপোর্টের আবেদন করে দিতো।

উদ্ধার চার রোহিঙ্গা নাগরিককে ক্যাম্পে প্রত্যাবর্তন এবং আটক দুইজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীনের কথা জানিয়ে এমরানুল হাসান আরো বলেন: হামিদ এ পর্যন্ত ২০ বাংলাদেশী নারীকে পাচার করেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এর সাথে জড়িত কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির নামও এসেছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জব্দ হওয়া পাসপোর্টগুলো সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

এছাড়া, এ মামলার তদন্তভার র‌্যাব গ্রহন করবে, তদন্ত সাপেক্ষে চক্রের মূল উদঘাটনের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।