বিশেষ প্রতিবেদক:
আজ রাত পেরোলেই রামু উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। শুক্রবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের প্রচারণা কাজ। নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আজ শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে পাঠিয়ে দেবে।  নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দুইজন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩ জন প্রার্থী রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসীল অনুযায়ী তৃতীয় ধাপে রবিবার (২৪ মার্চ) রামুর ভোট গ্রহণ। নির্বাচনে কারা হবেন উপজেলা পরিষদের অভিভাবক এনিয়ে হাট-বাজার আর দোকান-পাট থেকে শুরু করে সর্বত্র চলছে নানা আলোচনা।
বিশেষ করে চেয়ারম্যান পদকে ঘিরে চলছে নানামুখি হিসেব নিকেষ। কারণ, বলতে গেলে দুই প্রার্থীই সাবেক রাষ্ট্রদূত আলহাজ্ব ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী পরিবারের শক্তি। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে লড়ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম। তাকে সমর্থন যোগাচ্ছেন স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল।
আওয়ামী লীগের কিছু অংশের দাবী, শিক্ষাখাতে বিশেষ অবদানের জন্য ৩ বার জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রিয়াজ উল আলম। ক্ষমতার সুষ্ঠু ব্যবহার ও জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি জনগনের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন। এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের আশির্বাদপুষ্ট হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে উপজেলাবাসীর কাছে সুপরিচিতি হন।
উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রিয়াজ উল আলমের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল (আনারস)। তার সঙ্গে রয়েছে উপজেলার ১১ টি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতৃবৃন্দ। অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাকে সমর্থন দিয়েছে।
ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টানা ১০ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সোহেল সরওয়ার কাজল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে যথেষ্ট কাজ করেছেন। ঘরে ঘরে সরকারের সেবাধর্মী কাজসমূহ পৌঁছিয়ে দিতে পেরেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের হলেও অন্যদলের লোকজনের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেন। একচোখা নীতিতে বিশ্বাসী না হওয়ায় এবারের নির্বাচনে কাজলকে এগিয়ে রাখছে ভোটাররেরা।
ফঁতেকারকুলের সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ আবদুল মতলব জানিয়েছেন, সোহেল সরওয়ার কাজল বর্নাঢ্য রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী সাবেক রাষ্ট্রদূত, সংসদ সদস্য এবং কক্সবাজার জেলা শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক ছিলেন। পিতার সুনাম এবং নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কাজ করছেন কাজল।
ভোটারদের মতে, জননেতা কাজল ইতিপূর্বে রামু উপজেলা পরিষদ এবং সদর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। দীর্ঘদিন রামু উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর ছোট বোন নাজনীন সরওয়ার কাবেরী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনিও বড় ভাইয়ের আনারস প্রতীকের পক্ষে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি ঘরানার ভোট আদায়ের কৌশল হিসাবে আনারস প্রতীক নিয়েছেন কাজল। কারণ গত নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী মরহুম আহমুদুল হক চৌধুরীর প্রতীক ছিল আনারস। সম্পর্কে মরহুম আহমুদুল হক চৌধুরী তার চাচা হয়। এবারে যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তাই তাদের অবস্থান থাকবে নৌকার বিপক্ষে। আর আনারস হচ্ছে বিএনপি’র আবেগের প্রতীক। তাই আনারস প্রতীকে ভোট দিয়ে বিএনপি তাদের মনের জ্বালা মিটাতে পারে। অন্যদিকে এই উপজেলায় জামাতের বিশাল একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে সেই ভোট কোনভাবেই নৌকা মার্কায় যাবেনা। কওমী ও বা বেসরকারী মাদরাসা কেন্দ্রিক ভোটগুলোর অধিকাংশ নৌকার বিপক্ষে।
সরেজমিন খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার ১১ টি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা কর্মীরা কাজলের পক্ষে কাজ করছে। প্রার্থীতা নিয়ে কারো মতবিরোধ নেই। স্থানীয় এমপির প্রভাবমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কাজলের আনারস মার্কার বিজয় ঠেকিয়ে রাখা যাবেনা বলে সাধারণ ভোটাররা মত দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী রিয়াজ উল আলমের সাথে মাঠে নেতিবাচক আলোচনা ও প্রচুর ভুল বুঝাবুঝি রয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার ভাগাভাগিসহ লোকমুখে বদনাম এখনো শোনা যায়। সরকারী কোন পদে না থাকাতে কাজলের বিরুদ্ধে তেমন সমালোচনা নেই বলে মনে করে রামুবাসী।
একটি সুত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন বঞ্চিত হন সোহেল সরওয়ার কাজল। যেকারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনক্ষুণ্ন হয়েছে। তারা ভোটের মাধ্যমে তার জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত বলে জানান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম মণ্ডল।
এই নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন ৪জন। এরা হলেন, বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান আলী হোসেন (টিউবওয়েল), উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও রামু উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি সালাহ উদ্দিন (তালা), ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক হেলাল উদ্দিন (উড়োজাহাজ) এবং আওয়ামীলীগ নেতা আবদুল্লাহ সিকদার (চশমা)।
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ জন। এরা হলেন, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মুসরাত জাহান মুন্নি (প্রজাপতি), রামু উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোয়ারা ইসলাম নেভি (ফুটবল) এবং উপজেলা যুব মহিলা লীগের সভাপতি আফসানা জেসমিন পপি (কলসি)।
রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ১লাখ ৫৮ হাজার ১৮ জন। সেখানে ৮১ হাজার ৪১০ জন পুরুষ এবং ৭৬ হাজার ৬০৮ নারী ভোটার। মোট ভোট কেন্দ্র সংখ্যা ৬১টি।