মোহাম্মদ শাহজাহান

এক।

আমি অর্থাৎ এই নিবন্ধের লেখক একজন অধম। তবে অধম থেকে উত্তম হয়ে উঠার জন্য সবসময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

দুই।

নিজে অধম হলেও জীবনে দীর্ঘকাল অন্যকে উত্তম করে তোলবার দায়িত্ব তথা শিক্ষকতার মহান দায়িত্ব পালন করেছি। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। নিজের ছাত্রজীবন আর শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক শাস্তি সম্পর্কে কিছু কথা বয়ান করছি এখানে।

তিন।

অধমের শিক্ষার হাতেখড়ি তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় ও উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। এই তিন বিদ্যালয়েই তখনকার দিনে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকেরা অমনোযোগী বা পিছিয়ে-থাকা শিক্ষার্থীদের বেতাতেন অর্থাৎ পেটাতেন। আর তাঁরা তা করতেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কল্যাণের কথা ভেবেই। কিন্তু প্রায় ত্রিশ বছর আগের সেই স্মৃতি রোমন্থনে যা পাই, তাতে ওই বেতানো বা পেটানো দিয়ে আখেরে কোন লাভ হয়েছে বলে প্রমাণ পাই না। বরং সতীর্থদের মধ্যে যারা যত বেশি মার খেয়েছেন, তারা ততটাই বেশি ছিটকে পড়েছেন শিক্ষা-জীবন থেকে। আর তার বিপরীতে, স্যারদের পেঁদানি না-খাওয়া সতীর্থরাই শেষমেশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।

চার।

শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকেই পিটিয়েছি। এখন ওইসব শিক্ষার্থীদের সাথে দেখা হলে লজ্জিত হই; মনে মনে মহান আল্লাহর নিকট আর ওদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই।

পাঁচ।

বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপর ফলহীন শারীরিক শাস্তির ভয়াবহতা বন্ধের প্রার্থনায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাষ্ট) নামক দেশীয় একটি মানবাধিকার সংস্থা মহামান্য হাইকোর্টে একটি রীট মোকাদ্দমা দায়ের করেছিল। মহামান্য হাইকোর্ট ওই মোকাদ্দমার রায় প্রচার করেছেন। যা বিখ্যাত আইন সাময়িকী ঢাকা ল’ রিপোর্টস (ডিএলআর) এর ৬৩ তম ভলিইয়ূম-এ ৬৪৩ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। ওই রায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপর সকল ধরণের শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ/অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও পরিপত্র জারি করে বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তি এবং মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ করেছে। উক্ত রায় ও পরিপত্রে কোন শিক্ষক/শিক্ষিকা কর্তৃক কোন শিক্ষার্থী শারীরিক শাস্তি বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে ওই শিক্ষক/শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মোকাদ্দমাসহ প্রযোজ্য আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

ছয়।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, কিছুতেই যেন রোধ করা যাচ্ছে না বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তির বিষয়টি। শিক্ষক সমাজের অনেকেই কেন জানি মানতে পারছেন না ওই রায় কিংবা পরিপত্র। কিংবা উপলদ্ধি করছেন না শিক্ষার্থীদের উপর এর ভয়ানক কুফল। এক ধরণের শিক্ষক/শিক্ষিকা কোমলমতি শিশুদের উপর শারীরিক শাস্তি আরোপ করেই চলেছেন। যা যুগপৎ দুঃখজনক ও বেআইনি।

সাত।

বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তি আর নয়,

শিক্ষক/শিক্ষিকাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির হোক উদয়।।

মোহাম্মদ শাহজাহানঃ আইনজীবী, অনুবাদক ও কলামিষ্ট। মুঠোফোনঃ ০১৮২৭৬৫৬৮১৬