রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে সরকার

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:০৭

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


Rohingya refugees walk on the muddy path after crossing the Bangladesh-Myanmar border in Teknaf, Bangladesh, September 3, 2017. REUTERS/Mohammad Ponir Hossain

ডেস্ক নিউজ:
রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে বাংলাদেশ। সরকারের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, চীন বা রাশিয়ার মতো যেসব দেশ আগে এ ইস্যুতে কোনও কথা বলতো না, সেসব দেশও আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে এ বিষয়ে কথা বলছে। এমনকি নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে আলোচনা করতেও বাধা দেয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনীতিক বলেন, ‘মিয়ানমার যা ভেবেছিল তার চেয়ে কম সমর্থন পেয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সারা বিশ্বের কাছে মিথ্যা বলছে। চীন ও রাশিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। এই কারণে এই দু’টি দেশের অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন দ্রুত হলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো।’

ওই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘বর্তমানে রোহিঙ্গা নির্যাতন এত ব্যাপক আকারে হচ্ছে যে, এটি আর লুকানোও সম্ভব নয়। এ ঘটনার তদন্ত হবে। একদিন সবাই জানবে। এটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। এ নির্যাতনের ঘটনা সাংবাদিক, জাতিসংঘ বা অন্য কোনও সংস্থা প্রকাশ করলে তার প্রভাব মিয়ানমারের জন্য নেতিবাচক হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যে উন্মুক্ত আলোচনা হয়েছে, সেটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে সরকার।’ আন্তর্জাতিক চাপের কারণে মিয়ানমার এখন কিছুটা নমনীয় বলে তিনি মনে করেন।

সামনের দিনগুলোতে এটি অব্যাহত থাকবে বলে মনে করে এই কূটনীতিক বলেন, ‘মিয়ানমারের সহিংসতার ঘটনার প্রমাণ প্রতিদিন সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব প্রমাণ সবসময় মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। জাতিগত নিধনের ঘটনার প্রমাণও একদিন উন্মোচিত হবে।’ হিন্দু নিধন সংক্রান্ত জটিলতা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, তাও একদিন প্রকাশিত হবে। বর্তমানে যে দেশগুলো মিয়ানমানরকে সমর্থন দিচ্ছে, তখন সেসব দেশের পক্ষে ওই সমর্থন অব্যাহত রাখা মুশকিল হবে।’ তার মতে, নির্যাতন ইস্যুটি প্রকাশিত হলে এবং রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে এই সমস্যার সমাধান সহজ হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরেকজন কূটনীতিক বলেন, ‘মিয়ানমার বরাবরই সারা বিশ্ব থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। ২০১০ সালের পর থেকে ক্রমশই তারা নিজেদের উন্মুক্ত করছিল। কিন্তু সেটির বিপরীতচিত্র এখন দেখা যাচ্ছে, যেখানে তারা মাত্র কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভর করে সারা বিশ্বকে পরোয়া করছে না।’ রোহিঙ্গাদের কোনও পরিচিতি বা শিক্ষা নেই এবং সে কারণে তাদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালানোটা মিয়ানমারের জন্য কিছুটা সহজ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, মিয়ানমার সুবিধা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের পন্থা অবলম্বন করছে। ইন্দোনেশিয়ার সমর্থনের জন্য মিয়ানমার আসিয়ানকে ব্যবহার করছে, আবার বৌদ্ধদের সমর্থন পাওয়ার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করছে। একইভাবে চীন বা রাশিয়ার বা ভারতের সমর্থনের জন্য দেশটি অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। এর ফলে মিয়ানমার একটি অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘে আমাদের প্রচেষ্টা সময়োপযোগী ও যথার্থ। এর ফল আমরা কিছুটা সুফল পাচ্ছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই আন্তর্জাতিক চাপ যেন অব্যাহত থাকে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট থাকে, তার জন্য তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। আমরা চাই, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বহুপাক্ষিকভাবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে।’

একই মত প্রকাশ করে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক অ্যাটাশে শহিদুল হক বলেন, ‘দু’ভাবেই আমাদের যোগাযোগ রাখতে হবে।’তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমারের কিছু ব্যক্তির ওপর অবরোধ আরোপের জন্যও বাংলাদেশকে চেষ্টা করতে হবে। জাতিসংঘের মাধ্যমে অবরোধ আরোপ করা সম্ভব নয়, এটি করতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে।’ উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে আগ্রহী। তাদের ব্যক্তির ওপর অবরোধের আইন আছে। কয়েকদিন আগেও দেশটি একাধিক সিনেটর মিয়ানমারে অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন।’

উল্লেখ্য, ২৫ আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু হলে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মারা গেছে। এই ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠলেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা বন্ধ করেনি। এই ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দুই দফা রুদ্ধদ্বার ও গতকাল উন্মুক্ত আলোচনাও হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •