আমান উল্লাহ আমান, টেকনাফ:
যে বয়সে কাঁধে স্কুল ব্যাগ থাকার কথা সেই বয়সে কাঁধে ত্রাণের বস্তা নিয়ে ছুটছে রোহিঙ্গা শিশুরা। আবার কেউ কেউ সড়কের পাশে কিংবা ত্রাণের গাড়ী দেখলেই দুই হাত তুলে ত্রাণ ভিক্ষা চাইছে। টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের রইক্ষ্যং ও নোয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গিয়ে এসব চিত্র দেখা গেছে।

রইক্ষ্যং রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে চোখে পড়ে অসংখ্য অপ্রাপ্ত বয়সের শিশুরা ত্রান নিয়ে ছুটছে। ছেলেরা কাঁধে আরা মেয়েরা কোমরে করে ত্রাণের বস্তা নিয়ে যাচ্ছে। চলার পথে কথা হয় নুর ফাতেমার (১০) সাথে। এসময় তার কোমরে ত্রানের বস্তা। প্রায় ৪ কিলোমিটার হেঁেট তাকে রোহিঙ্গা শিবির থেকে হোয়াইক্যংয়ে ত্রাণের জন্য আসতে হয়েছে। আবার সেই গন্তব্যে পথচলা।

সে জানায়, ঘরে অসুস্থ বাবা বিছানায় ছটপট করছে। সে সবার বড়। বাধ্য হয়ে এত দূর হেঁটে এসে ত্রাণগুলো সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কষ্ট হলেও উপায় নেই। এসময় কিছু দুর গিয়ে পথি মধ্যে একটু জিরিয়ে নিয়ে ফের পথ চলা শুরু করে।

শুধু নুর ফাতেমা নয়। এমন হাজারো রোহিঙ্গা শিশুর কাঁধে ত্রাণের বস্তা দেখা গেছে। আবার অনেক শিশু পানির কলসী, জার ও বোতল নিয়ে পানি আনতে দেখা গেছে। কুয়া ও খাল থেকে শিশুরা পানি সংগ্রহ করে বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক এসব শিশুরা যেতে না চাইলেও পরিস্থিতি বাধ্য করেছে এসব কাজে নিয়োজিত হতে।

পানির কলসী কাঁধে মোঃ সলিম (১১) নামের এক শিশুর সাথে কথা হয়। সে জানায়, বাবা ত্রাণের জন্য গেছে। বাড়ীতে একটু পানিও নেই। তাছাড়া সময় মতো না গেলে পানি পাওয়াও মুশকিল। এতদুর থেকে ত্রাণ নিয়ে ফিরে বাবা পানি আনতে যাবেনা। তাই ভার নিয়ে নিজেই পানির জন্য ছুটছি।

শুধু তাই নই। অনেক শিশু সড়কের পাশে সারাক্ষণ দাড়িয়ে থেকে ত্রাণবাহী গাড়ীর দেখলেই পিছু পিছু ছুটছে। এসব শিশুদের কারো বাবা নেই, কারো মা নেই। আবার কারো কেউ নেই। তেমনি একজন হচ্ছেন রহিমা খাতুন (১০)। এদেশে এসে এক বেলা খেলেও আরেক বেলা খেতে পারেনি। শরীর হাড্ডিসার। চোখ দু’টো কোটরে ঢোকেছে। পরনের কাপড়গুলোও নোংরা। তার বাবা নেই। মাসহ পরিবারে ৪ জন রয়েছে। সে সবার বড়। তাই তার উপর চাপটা বেশী। গত কোরবান ঈদের আগের দিন এদেশে পালিয়ে এসে রইক্ষ্যং শিবিরে আর একটি পরিবারের সাথে শেয়ার করে ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে বসতি গেড়েছে। এরমধ্যে অনেকবার বৃষ্টিতে ভিজেছে আবার রোদে পুড়েছে। ধাক্কাধাক্কি দিয়েও একটি পলিথিন পায়নি। কারন বড় বড় হাতগুলোর মধ্যে এই ছোট্ট হাত দু’টি ত্রাণ দাতাদের নজরে আনতে পারেনি। অবশেষে ৫ দিন আগে একটি লাল রঙ্গের পলিথিন মিলেছে। রহিমা জানায়, এখন ত্রাণের জন্য একটি কার্ড পেয়েছে। এতে চাল, ডাল, আলু, শুকনো মাছসহ কয়েক ধরনের দ্রব্যাদি রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে রহিমা জানায়, রাখাইনে শান্তি ফিরলেই চলে যেতে চাই। সেখানে তাদের নিজস্ব ভুসম্পত্তি রয়েছে।

এভাবে কয়েকজন রোহিঙ্গা শিশুর সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাখাইনে থাকতে মক্তবে ও স্কুলে গেছে। সেনা ও মগের নির্যাতন থেকে বাঁচতে এদেশে পালিয়ে আসে। তারা পড়তে চাই এবং স্বপ্ন দেখে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য। তাই এদেশেও সুযোগ হলে স্কুলে যেতে চাই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •