হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ:
দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রভাবে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ এর ছড়াছড়ি চলছে। ব্যাংক প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অনুপ্রবেশকারী লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব এবং প্রশাসনের নিরবতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত এলাকায় অসাধু চক্র ও সিন্ডিকেট তৎপর রয়েছে বলে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে। বলতে গেলে এখন পুরো সীমান্ত এলাকা জুড়ে প্রকাশ্যে মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ এর রমরমা বাণিজ্য চলছে। কেউই বৈদেশিক মুদ্রা আইনের তোয়াক্কা করছেনা। দালালদের হাতে কোটি কোটি মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ বিনিময় হচ্ছে। অথচ মুদ্রা বিনিময়ের জন্য এ পর্যন্ত কোন বুথ খোলা হয়নি।

জানা যায়, ২৪ আগস্টের পর মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে (সংশোধিত নাম রাখাইন স্টেট) সহিংস ঘটনার পর থেকে আরকানের মোট ১৭টি টাউনশীপের মধ্যে মংডু, বুচিদং ও আকিয়াব ৩টি মুসলিম অধ্যুষিত টাউনশীপ থেকে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমান টেকনাফ, উখিয়া এবং নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে তা অব্যাহত রয়েছে। বলতে গেলে এখন বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ৫৪ কিলোমিটার সীমান্ত অঘোষিতভাবে উম্মুক্ত রয়েছে। এদের প্রত্যেকের কাছে থাকে কম-বেশী সেদেশের মুদ্রা ‘কায়াট’।

অর্ধাহারে-অনাহারে পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে এবং দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়ে বহু কষ্টে দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের এরা প্রত্যেকেই থাকেন তীব্র ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত। অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশুদের অবস্থা তো আরও কাহিল। প্রথমেই অতি জরুরী হয়ে পড়ে নগদ বাংলাদেশী টাকা, খাবার, শিশু খাদ্য এবং পানির। এই প্রয়োজনীয় মুহুর্তে হাতের কাছে তা পাবার সুযোগ থাকেনা। ঠিক এ সময়ে উক্ত সামগ্রী নিয়ে সাহায্যে আসা ব্যক্তি বা প্রতিষ্টান সামনে পড়লে তো রক্ষা, নয়তো কিনে প্রয়োজন মেটানো ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। সাথে মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’। সহজে কেনারও নেই। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে চরম অসহায়ত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেমে পড়ে মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ ব্যবসায়ীরা।

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাস্ত-ভিটা, সহায়-সম্বল, ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল, মহিষ, হাঁস-মুরগি, বাড়ির নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ফেলে নাড়ি কাটা প্রিয় মাতৃভুমি ফেলে জীবনের তাগিদে চলে আসার সময় সকলেরই কাছে থাকে প্রচুর স্বর্ণালংকার এবং নগদ লক্ষ লক্ষ মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং নতুন পরিচয়হীন মাটিতে পা দিয়ে অতি প্রয়োজনের সময়ে মুদ্রা বিনিময় করার সুযোগ নেই। ৫৪ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে কোথাও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বুথ চালু করা হয়নি। আর এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে পুরানো রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় দালাল সিন্ডিকেট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলে দলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের প্রথম দিকে ১ লক্ষ মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ এর বিনিময়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশী মাত্র ২ হাজার টাকা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় এবং নিত্য নতুন সুবিধাবাদী দালাল সিন্ডিকেট অত্যন্ত লাভজনক এ ব্যবসায় নেমে পড়ার কারণে এখন বিনিময় দর কিছুটা উর্ধমুখী। ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে জানা গেছে বর্তমানে ১ লক্ষ মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ এর বদলে ৪ হাজার ৩০০ টাকা দেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারে বর্তমানে ৫০ কায়াট, ১০০ কায়াট, ২০০ কায়াট, ৫০০ কায়াট, ১০০০ কায়াট, ৫০০০ কায়াট, ১০,০০০ কায়াট চালু রয়েছে। ৫০ কায়াটের নিচে মুদ্রা নেই। পয়সাও এখন অচল।

এ ব্যাপারে টেকনাফের একটি ব্যাংকের ব্যাবস্থপকের সাথে যোগাযোগ করা হলে জানান, আর্ন্তজাতিক মুদ্রা বিনিময় হার অনুসারে বাংলাদেশী ১ টাকার সমমান মিয়ানমারের ১৬ থেকে ১৭ কায়াট। সে হিসাবে মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ দালাল সিন্ডিকেট চক্র দিয়েছে মাত্র ২ টাকা। আর এখন দিচ্ছে ৪ টাকা ৩ পয়সা। আকাশ-পাতাল তপাৎ। মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ দালাল সিন্ডিকেট চক্রের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছের অবস্থা। অসহায় রোহিঙ্গাদের শোষন করে কামানো হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

তাছাড়া সীমান্ত এলাকার স্বর্ণকারদের পোয়াবারো অবস্থা চলছে। প্রয়োজনের তাগিদে হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাঁদের ব্যবহৃত স্বর্ণালংকার দায়ে পড়ে নিরুপায় হয়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন। দুর্বলতার এ সুযোগে স্বর্ণালংকার ভাল মানের নয়, মেশানো ইত্যাদি বাহানা স্বর্ণকাররা দিয়ে নাম মাত্র মুল্যে কিনে নিচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা নিয়ে এত বেশী ব্যস্থ, এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এবং সুযোগ নেই। এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ ও এব্যাপারে এগিয়ে আসছেননা।

সীমান্ত অতিক্রম দলে দলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের প্রেক্ষিতে মুদ্রা বিনিময়ের জন্য বিশেষ বিবেচনায় বুথ স্থাপন বা অন্য কোন ব্যবস্থা আছে কি-না জানতে চাইলে রাষ্ট্রয়াত্ব বাংলাদেশ সোনালী ব্যাংক টেকনাফ শাখার ব্যবস্থাপক মোঃ ওসমান ২১ সেপ্টেম্বর রাতে বলেন ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সম্পর্কিত কোন নির্দেশনা আসেনি। তাছাড়া প্রচলিত নিয়ম অনুসারে মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ স্থানীয় কোন ব্যাংকেই বিনিময় করার সুযোগ নেই’।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বেকায়দায় ফেলে পানির দরে কিনে নেয়া মিয়ানমারের মুদ্রা ‘কায়াট’ বস্তায় ভরে দালাল সিন্ডিকেট চক্ররা টেকনাফ স্থল বন্দরে মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসা ট্রলারে করে স্ব-স্ব সিন্ডিকেটের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এব্যাপারে সম্পুর্ণ বে-খবর।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •