জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ:
মিয়ানমারে রুজিদের জীবনে কখনো দুঃসময় আসেনি। সাজানো গোছানো আভিজাত্যের ছোঁয়ায় তাদের পরিপাটি পরিবারটি অনেকটা সমৃদ্ধ ছিলো। পূর্ব পুরুষদের সূত্রে রুজিদের পরিবারের অনেক খ্যাতি ছিল। ওপারের সুখ, স্বস্তি, জীবন ধারণ এপারে তারা যে কোন জীবনেই পাবেনা তাও ভালো করে জানা। তবু প্রাণে বাঁচার চেষ্টা ছিলো।

মিয়ানমারের হাচ্ছুরতার আলী তাইঞ্জা এলাকার আলী ভূট্টো ও ফাতেমা বেগমের তৃতীয় কন্যা রুজি। বয়স আট কি সাড়ে আট হবে।

রোহিঙ্গা কন্যা রুজির কাছে পুরো নাম জানতে চাইলে এটুকুই বলে। নামের আগে পরে আর কিছু আছে কিনা জানতে চাইলে উত্তর দিলো ‘মা জানে’। কিন্তু কোথায় তার মা? মমতায় মধুর ‘মা’ ডাকটি কি এই শিশু রুজির কন্ঠে আর কোন দিন ধ্বনিত হবে? উত্তর জানা যাক।

সেদিন ৩০ আগস্ট ২০১৭ খ্রিঃ বুধবার। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর চলা সহিংসতায় প্রাণে বাঁচতে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে সকাল থেকে প্রস্তুতি। দিনভর অপেক্ষায় নৌকা মেলেনি। এপারে আগে চলে আসা স্বজনরা রুজিদের জন্য পাঠিয়েছিল বড় একটি ফিশিং ট্রলার। রুজিদের নিতে যাওয়া ট্রলারটি ওপারে অপেক্ষমান হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের ভিড়ে রুজিদের খোঁজে নিতে ব্যর্থ হয়ে অন্যদের নিয়ে ফিরে আসে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মিয়ানমার সময় রাত ১১ টার দিকে অতিরিক্ত ভাড়ায় পাওয়া গিয়েছিল অন্য একটি নৌকা। চাচা, চাচি, ফুফু ও অন্যান্য স্বজনদের সাথে নৌকায় উঠলো রুজিসহ তার মা ও ছোট দুই ভাই বোন। নৌকাটি ঠিকটাক নাফনদ পাড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সৈকতের দিকে এগুচ্ছিল। ততক্ষণে ঘড়ির কাটায় বাংলাদেশ সময় রাত ১২ টা। শাহপরীর দ্বীপ মাঝের পাড়া সৈকতের তীরে ভিড়তে গিয়ে হঠাৎ সাগরের অথৈ জলে ডুবে যায় নৌকাটি। নৌকার ১৭ বয়স্ক ও ১৪ বা ১৫ শিশুর জীবন এক অনিশ্চিয়তায় সাগর জলে হাবুডুবু খাচ্ছিল।

নৌকা ডুবির ঘটনায় স্থানীয় কিছু লোক বুকে সাহস নিয়ে গভীর রাতে সাগর পাড়ে ছুটে গিয়েছিল সেদিন ( সাথে প্রতিবেদকও)। পূর্ণ জোয়ারে ভেসে আসছিল এক একটি শিশু ও নারীর মরদেহ, জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন অনেকে মুমূর্ষ অবস্থায়, কেউ কেউ সাঁতরিয়ে কুলে ওঠেছিল, আবার কেউ কেউ কুলে ফিরেছিল সৃষ্টিকর্তার অদৃষ্ট হাতে ভর করে। সে দলে ৮ বছরের কন্যা শিশু রুজির মতো আরো দু‘চার জন শিশু প্রাণ পেয়েছিল। উত্তাল সাগরের অথৈ জলে নৌকা ডুবিতে এই ক’জন অনুর্ধ্ব ১০ শিশুদের কূল ছোঁয়ার দৃশ্যটি হতবাক করেছিল সবাইকে।

স্থানীয় যুবকরা বুক ছুঁই ছুঁই পানিতে নেমে উদ্ধার করে আনার চেষ্টা করছিল রোহিঙ্গাদের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ততক্ষণে লাশের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঊনিশে। প্রায় ত্রিশ রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধ বোঝাই এই নৌকার বাকীরা সেদিন প্রাণ পেয়েছিল। তবে তা চোখের সামনে স্বজন হারিয়ে।

রোহিঙ্গা কন্যা শিশু রুজি কিভাবে প্রাণে বেঁচেছিল সে নিজেও জানেনা। কূলে ওঠে হন্যে হয়ে খুঁজেছিলো তার মা ও আদরে ছোট দুই ভাই বোনকে। রুজির মা মা ডাকে সৈকত তীরের সেদিনের আকাশ বাতাস যেন প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। এতো ডাকাডাকি খোঁজাখুঁজির পরও কোথাও দেখা মিলছিলনা মায়ের। অবশেষে লাশের স্তুপে এসে দেখা মিলেছিল মায়ের। মায়ের ঠিক ডানে বামে আদরের দুই ভাই বোন। কান্নায় কাতর হয়ে পড়েছিলো ছোট্ট শিশু রুজি। নৌকা ওঠা চারজনের তিনজনই যে নেই এই হতভাগিনীর !

রুজি প্রাণে বেঁচে স্থানীয় এক যুবকের সহায়তায় তার এক আত্মীয়কে খুঁজে পায় এবং তার কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৫ সেপ্টেম্বর কথা হয় রুজির সাথে। এতদিনে অনেক কিছু স্মৃতি থেকে মুছে গেছে তার। কিন্তু মা ও আদরে ছোট ভাই বোনের মৃত্যু শোক মুছেনি তার। মায়ের কথা মনে পড়লে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি।

রুজি জানিয়েছে, নৌকায় মায়ের দুই হাতে ছোট দুই ভাই বোন আর মায়ের হাত আগলে পাশে ছিলো রুজি। যখন নৌকাটি কাত হয়ে যাচ্ছিলেন তখন মা রুজিকে সহ তিন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সবাই তখন কাঁদছিলেন আর প্রার্থনা করছিলেন। নৌকাটি পুরোপুরি ডুবেই যাচ্ছিল। গভীর আঁধারে উত্তাল সাগর। তখনও মায়ের হাতের স্পর্শ আঁচ করতে পেয়েছিলেন রুজি। এরপর আচমকা ঢেউয়ের ধাক্কায় কে কোথায় ছিটকে পড়েছিল তার আর কিছুই মনে নেই। জীবিত মা ও ভাই বোনকে খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন তাদের মরদেহ।

বাঁচতে গিয়ে প্রাণ গিয়েছিল রুজির প্রিয় স্বজনদের। কে সান্তনা দেবে তাকে, আর কিবা সান্তনা দেবে ? এ বয়সে সে যে তার সবকিছুই হারিয়েছে। হতভাগিনী রোহিঙ্গা শিশু রুজির জীবনে আর কোনদিন যে তার মমতাময়ী মা ফিরে আসবেনা । সেদিনের আঁধার রাতের দুঃসহ স্মৃতি যে বারবার কাঁদায় রুজিকে।

মিয়ানমার নামক পৃথিবীর এই বর্বর রাষ্ট্রের মুসলিম নিধন অভিযানে বিপন্ন হয়ে পড়েছে মানবতা। সন্তান তার প্রিয় মা বাবাকে হারাচ্ছে, কতো মা সন্তান হারা শোকে কাতর, ভাই তার বোনকে, বোন হারাচ্ছে তার প্রিয় ভাইকে, কেউ না কেউ হারাচ্ছেন তার প্রিয় স্বজনকে। সভ্য পৃথিবীর কেউ চোখের জল ঢালছেন নিরবে আবার বিবেকহীন হয়ে তামাশার হাঁসি হাঁসছেন। তবে জয় হোক মানবতার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •