class="post-template-default single single-post postid-96241 single-format-standard custom-background">

‘আরাকান স্যালভেশন আর্মি’ কি রোহিঙ্গাদের মুক্তি আনতে পারবে?

5ca8a17bff491723a141c3561f2e9229-59b7d6659acdf.jpg

ডেস্ক নিউজ: 
‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’-এআরএসএ নামের এক গোষ্ঠী নিজেদেরকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষাকারী দাবি করলেও মিয়ানমার সরকার তাদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে আসছে শুরু থেকেই। ২৫ আগস্ট ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে সমন্বিত হামলা চালিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্যকে হত্যার দায় শিকার করে তারা। ‘গত বছরের অক্টোবরেও রাখাইনে পুলিশ ফাঁড়ির ওপর হামলার ঘটনার জন্য দায়ী করা হচ্ছিল এই গোষ্ঠীটিকে। এআরএসএ নামের গোষ্ঠীটি সন্ত্রাসবাদী? নাকি তারা রোহিঙ্গাদের মুক্তির লড়াইয়ে সামিল হয়েছে? মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কী ভূমিকা নিতে পারে সংগঠনটি?

১৭ আগস্ট সাউথ এশিয়া মনিটর-এর প্রতিবেদক ল্যারি জাগান স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানান। এর কয়েকদিনের মাথায় সাবেক জাতিসংঘ-মহাসচিব কফি আনানের মিয়ানমার সফরের মধ্যেই ২৫ আগস্ট বেশকিছু পুলিশ চেকপোস্টে হামলা হয়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ শতাধিক মানুষ নিহত হন। হামলার একদিনের মাথায় হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে এআরএসএ-এর প্রধান নেতা আতাউল্লাহ জুনুনির মুখপাত্র আবদুল্লাহ’র সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। কফি আনানের সফরের মধ্যেই কেন এমন হামলা; এমন প্রশ্নের উত্তরে আবদুল্লাহ বলেন, ‘মংডু এবং রাথেডুং এলাকার গ্রামগুলোতে আগেই সরকারি সেনা অভিযান চলছিল। কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তিদের বেঁধে ফেলা হয়। ২৫ জনের বেশি গুলিতে নিহত হন। পুরোপুরি ঘিরে ফেলা হয় জায়ে দি পায়েইন গ্রাম। এসব আঘাতের জবাব দিতেই এআরএসএ ওই সময় হামলার সিদ্ধান্ত নেয় । আত্মরক্ষার আর কোনও বিকল্প ছিল না।’

মিয়ানমারের সরকার ইতোমধ্যেই এআরএসএ-কে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী ঘোষণা করেছে। তারা বলছে, এই গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছে রোহিঙ্গা জিহাদীরা, যারা বিদেশে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। তবে সংগঠনটি কত বড়, এদের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, তার কোনো পরিস্কার ধারণা তাদের কাছেও নেই। মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের ধারণা, এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছে ‘আতাউল্লাহ’ নামে একজন রোহিঙ্গা। সংগঠনটির নেতা আতাউল্লাহ ‘আবু আমর জুনুনি’ নামেও পরিচিত।

বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি আগে ইংরেজিতে ‘ফেইথ মুভমেন্ট’ নামে তাদের তৎপরতা চালাতো। স্থানীয়ভাবে এটি পরিচিত ছিল ‘হারাকাহ আল ইয়াক’ নামে। আতাউল্লাহর বাবা রাখাইন থেকে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। সেখানেই আতাউল্লাহর জন্ম। তিনি বেড়ে উঠেছেন মক্কায়। সেখানে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। ২০১২ সালে আতাউল্লাহ সৌদি আরব থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর সম্প্রতি আরাকানে নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর তার নাম শোনা যায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-আইসিজি তাদের এক রিপোর্টে বলছে, সংগঠনটি মূলত গড়ে উঠেছে সৌদি আরবে চলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের হাতে। মক্কায় থাকে এমন বিশজন নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা সংগঠনটি গড়ে তোলে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারতে এদের যোগাযোগ রয়েছে। আরাকানে যারা এই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত, তাদের আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ আছে বলে মনে করা হয়। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই সংগঠনটির প্রতি সমর্থন এবং সহানুভূতি আছে। আইসিজির প্রতিবেদনে বলা হয়, এআরএসএ এখন রোহিঙ্গাদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য সম্প্রতি গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘আসলে মিয়ানমার আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে ভয় পায়। গ্রামে ওরা থাকলে মিয়ানমারের সেনারা হামলার সাহসই পায় না। গ্রামে তখনই হামলা হয়, যখন সেখানে কেবল নিরস্ত্র বেসামরিকরা থাকে। ওই বিজিবি সদস্য গার্ডিয়ানের কাছে দাবি করেন, আদতে বেসামরিকদেরই হত্যার টার্গেট নেওয়া হয়েছে।’

কার্যত আশির দশকের গোড়া থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে আশ্রয় নেয়। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রোহিঙ্গাদের এমন সংকটে পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী পাকিস্তান ও সৌদি আরবের ধনিক শ্রেণীর সদস্যরা। তাদের বিদ্রোহেও অর্থায়ন করতে অনেকে রাজি হন। মধ্যপ্রাচ্য ও বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে এই অর্থ গিয়ে পৌঁছায় মিয়ানমারে। সেখানেই প্রশিক্ষণ পান বিদ্রোহী সেনারা। তবে এশিয়া টাইমসের সাক্ষাৎকারে আতাউল্লাহ বলেন, এআরএসএ ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তার আহ্বান, তাদেরকে ‘সন্ত্রাসবাদী ভাবা’ কিংবা ‘মিয়ানমার সরকারের ফাঁদে পড়ছে’ জাতীয় প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকুন। তবে আবদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলে এশিয়ান টাইমস-এর সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইক উইনচেস্টারের মনে হয়েছে, হয় আরসা কফি আনানের প্রতিবেদনে কী আছে তা জানত না, নতুবা এ সফরকালে রোহিঙ্গা সমস্যার দিকে বিশ্বের মনোযোগের সুযোগ নিয়ে তারা নাটকীয়ভাবে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা চালিয়েছে।

এআরএসএ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধানই চায়, দাবি করেন আবদুল্লাহ। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার চাই। আমরা বিশ্বাস করি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াবে। পূর্ণমাত্রার গণহত্যার ঠিক পূর্ববর্তী অবস্থানে রয়েছি আমরা। বেসামরিক জনগণকে আমাদের বাঁচাতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা সংগ্রামের চিন্তা নেই আমাদের। আর রাখাইনরাও আরাকানেরই সন্তান। তাদের প্রতি আমাদের বার্তা, আমরা একসঙ্গে বাঁচতে পারি। আরাকান রোহিঙ্গা ও রাখাইন দুই সম্প্রদায়েরই আবাস। ‘সম্প্রতি এরআরএসএ’র এক তরফাভাবে ঘোষিত অস্ত্রবিরতির বিবৃতিতেও মিয়ানমারে জাতি-র্ধম-নির্বিশেষে সবার জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, এআরএসএ’র হয়তো কয়েকশ রোহিঙ্গা সদস্য রয়েছে। বিদেশি কেউ যোগ দিয়েছে কিনা এমন প্রমাণ নেই। মানবিক সহায়তার কথা চিন্তা করে রবিবার আরাকান আর্মি অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনায় যেতে রাজি হয়নি সরকার। তাই সেনাবাহিনী ও এআরএসএ’র মধ্যকার দ্বন্দ্বকে লড়াই বলা যায় না। নিগৃহীত রোহিঙ্গাদের মুক্তির কথা বলা হলেও এআরএসএ’র হামলায় আদতে লাভ হয়েছে মিয়ানমার রাষ্ট্রের। এখন সব রোহিঙ্গা পুরুষকেই সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করার অজুহাত পেয়েছে সরকার। তারা এই অজুহাতকে নির্বিচারি অভিযানের সপক্ষে যুক্তি হিসেবে হাজির করছে।’

আরাকান আর্মির ওই হামলার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও জ্বলছে রোহিঙ্গাদের গ্রাম। জাতিসংঘ এরইমধ্যে সহস্রাধিক বেসমারিক নিহতের আশঙ্কা জানিয়েছে। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। তাই প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতা নিশ্চিতে আদৌ কী কোনও ভূমিকা নিতে পেরেছে এআরএসএ? নাকি তাদের কর্মকাণ্ড মিয়ানমারকে আরও বড় পরিসরে রোহিঙ্গা নিধনের সুযোগ করে দিচ্ছে?

Top