প্রসঙ্গ রোহিঙ্গা: ইতিহাস, জটিলতা ও বাস্তবতা

ukhi-04.jpg

মু: সুলতান আহমদ :

কমিউনিস্ট শাসিত রাষ্ট্র চীন রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিপক্ষে আজ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মিয়ানমার সরকারের অরাজকতার পক্ষে নিজেদের অবস্থান পূনর্ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিধর অনেক রাষ্ট্র যেখানে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক সন্ত্রাস দমনের নামে নিরীহ নারী-শিশু-আবাল-বৃদ্ধ তথা সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে, সেখানে চীন তাদের পূর্বেকার অবস্থানের মতোই বর্তমানেও একই গ্রহে বসে আছে। এতে বিশ্ববিবেক বিষ্মিত হলেও প্রকৃতপক্ষে বিষ্ময়ের কিছু নেই। কারণ, চীন একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, যেখানে মানবতা বড় নয়, সম্পদশালী ও শক্তিমত্ততাই বড়।

‘রোহিঙ্গা ইস্যুটি’ বিশ্ববিবেক কেন এত হালকাভাবে এতদিন ধরে দেখলো? রোহিঙ্গাদেরকে কেন এবং কীভাবে মিয়ানমার তাদের দেশের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করছে? নাগরিক পরিচয় নির্ধারণের জন্য যে কোন দেশ-রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনের পাশাপাশি অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য। জাতিসংঘ অবশ্যই এর সঠিক সমাধান বাতলে দিতে পারে। একটি দেশ যখন কোন পরাশক্তির অধীনতা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতা লাভ করে, স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যে সমস্ত জনগোষ্ঠী সেখানে বসবাস করে আসছিলো তাদেরকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি বাধ্য। চাই তারা যে জাতিগোষ্ঠীরই হোক। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলো, তখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দু’টি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলো। হিন্দু জাতির ভিত্তিতে ভারত ও মুসলিম জাতির ভিত্তিতে পাকিস্তান। কিন্তু আমরা দেখেছি অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠী এরপরেও পাকিস্তান রাষ্ট্রে রয়ে গেলো এবং একইভাবে অনেক মুসলমানও ভারত রাষ্ট্রে বসবাস করতে লাগলো। যথারীতি জাতিতাত্ত্বিকভাবে গঠিত রাষ্ট্র দু’টিও তাদেরকে স্ব-স্ব রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অল্পকিছুদিন আগে ভারত ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বড় জটিল সমস্যা ছিটমহলের সমাধান হলো। ছিটমহল সমস্যা সমাধান হওয়ার পূর্বে এসমস্ত এলাকার জনগোষ্ঠী কোন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি এবং স্বাভাবিক কারণে কোন রাষ্ট্রের কাছ থেকেও তারা মৌলিক অধিকার সমূহ থেকে বঞ্চিত ছিল। কিন্তু সমস্যা সমাধানের পর প্রথমে তাদের সুযোগ দেওয়া হলো তারা কোন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে চায়? এবং এরই ভিত্তিতে তারা স্বাধীনভাবে তাদের নাগরিকত্ব বাছাই করে নিতে সক্ষম হলো।

আজ এতদিন পরে মিয়ানমার কেন এই রোহিঙ্গাদেরকে প্রথমে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিলো এবং বর্তমানে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করতে লাগলো? তারাও কি এবার চীনের আদলে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গঠন করতে চায়? তারা কি রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাড়িয়ে দিয়ে শুধু সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তথা বৌদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করতে চায়? যদি চায় তাহলে বাংলাদেশে যে সমস্ত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করছেন, তাদেরকে মিয়ানমারে নিয়ে গিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিন।

আরএসও তথা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন কর্তৃক আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রস্তুতি নিয়ে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? অবশ্য একটি গোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রের কাছ থেকে দিনের পর দিন নাগরিক হিসেবে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে, যখন তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, সেখান থেকে উগ্রপন্থা গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়। আরএসও প্রতিষ্ঠার পেছনে মিয়ানমার রাষ্ট্র-ব্যবস্থাই দায়ী। যতদূর জানা যায়, এ রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর থেকেই তাদের নিজেদের মৌলিক অধিকার থেকে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে যাচ্ছে। তবে আরএসও সংগঠন যেভাবে মৌলিক আদায়ের নামে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাও যথাযথ নয়। আগে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের বঞ্চনার বিষয় তুলে ধরে তারপর সংগ্রামে নামা উচিত। যতদূর জানতে পারি, কেন তারা আজ অস্ত্র হাতে নিয়েছে, সে বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় সম্পূর্ণ অনবহিত। যথানিয়মে তাদের সংগ্রাম বা অস্ত্র হাতে নেওয়া হয় নাই, বিধায় তাদের অল্পসংখ্যক মানুষের জন্য আজ নিদারুণ কষ্টের স্বীকার বিশাল সাধারণ নিরীহ জনগোষ্ঠী।

বিশ্ব-বিবেকের কাছে প্রশ্ন, “এসব রোহিঙ্গা মুসলমানগুলো কি মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে আকাশ থেকে পড়েছে না মাটি ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে?” একদিকে মিয়ানমার রাষ্ট্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে গুলির ‍মুখে হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠন করে স্বদেশ ত্যাগে বাধ্য করছে, আবার অন্যদিকে আশ্রয়ের আশায় বাংলাদেশের সীমানা দিয়ে প্রবেশপথে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক তাদেরকে পুশব্যাক করছে। মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য যদি রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ভূমি না হয়, তবে তারা কেন তাদের ওপর এত অরাজকতার পরেও মাটি কামড়ে সেখানে পড়ে থাকতে চাইবে?

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা কক্সবাজারসহ পুরো বাংলাদেশে এখন একটি নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, “এরপরে কী ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর?” ১৯৭৫ সালের পর থেকেই একটি গোষ্ঠী তথা বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। সাধারণ অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী ও উঠতি কিশোরদের টার্গেট করে তারা তাদের রাজনৈতিক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। অথচ এ গোষ্ঠীর যারা নেতা, তাদের নিজেদের ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার মতো যোগ্যতা আছে কিনা তা-ই জানে না এবং কখনো এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিবেকের মাধ্যমে প্রশ্ন করে দেখেছে কিনা, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। এ গোষ্ঠী যে কোন উপায়েই তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চায়, প্রয়োজনে ধর্মকে বিকৃত ও বিকিয়ে দিয়ে হলেও। তাদের স্বপ্ন আসলে কোনদিন বাস্তবায়িত হবার নয়, তথাপি তারা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনে সহিংসতার আশ্রয় নিতে চায়। যদি মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সমস্ত রোহিঙ্গা মুসলমানকে স্বদেশভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশে চলে আসতেই হয়, তাহলে আরএসও তথা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের নেতা-কর্মীদেরও বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হতে হবে। প্রচলিত প্রবাদ: “ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে”। এ গোষ্ঠীর নেতা-কর্মীরা বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক দল ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে চায় তাদের সাথে মিশে গিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৭ সালের পঁচিশে আগস্টে মিয়ানমারে সংঘটিত ঘটনার পর থেকে আগত রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে ১৯৭৮ সালের পর এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচলক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে এবং এদেশের রাষ্ট্রীয় আইন-ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এদের অধিকাংশ বাংলাদেশের নাগরিকত্বও লাভ করেছে। এদের নাগরিকত্ব লাভের পেছনে রাষ্ট্রীয় আইন-ব্যবস্থার দুর্বলতা যেমন রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের তথাকথিত বিশেষ ইসলামী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দুর্ভিসন্ধিও কাজ করেছে। কারণ, এ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ অশিক্ষিত ও অন্যরা শিক্ষিত ধর্মান্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে আগত তিনলক্ষ জনগোষ্ঠীসহ এখন আটলক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এরাই একসময় বিশেষ ইসলামী রাজনৈতিক দল কর্তৃক ব্যবহৃত হয়ে বাংলাদেশকেও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে যেতে পারে এবং এর বিস্তার ঘটাবার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। তখন বাংলাদেশেও ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর দোহাই দিয়ে মুসলমান বিরোধী বিশ্বশক্তি বাংলাদেশকে ধ্বংস করার পায়তারা নিবে। বলা যায়, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক একটি ভবিষ্যৎ সংকটময় অবস্থা। ইতোমধ্যে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মুখে মুখেও এসমস্ত সম্ভাবনার কথা উচ্চারিত হচ্ছে।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর যে অরাজকতা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কেন জাতিসংঘসহ বিশ্বশান্তিকামী রাষ্ট্রসমূহ স্পষ্ট করে প্রশ্ন তুলে ধরতে পারছেনা? ‘সন্ত্রাস’ এখন পুরো বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রত্যেক রাষ্ট্রই সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠী নির্মূলের জন্য নির্দিষ্ট কর্মপন্থা নিয়ে কাজ করছে, এবং প্রয়োজনে নতুন নতুন তৈরি করছে। এসব কর্মপন্থা ও আইনপ্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য সাধারণ নিরীহ জনগণ যেন এর অপপ্রয়োগের শিকার না হয়। মিয়ানমার সরকার অবশ্যই ‘নিরাপত্তা স্থিতি’র জন্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু ছোট ছোট শিশু-কিশোর, মায়ের গর্ভের সন্তান, নিরীহ নারী-পুরুষ ও অক্ষম বয়স্ক ব্যক্তিরা কেন এ প্রয়োজনীয়-ব্যবস্থার নিষ্ঠুর পরিণতির শিকার হবে অথবা করুণ পরিণতি ভোগ করবে? এরাও কি সন্ত্রাসী? সেনাবাহিনী ও উন্মত্ত বৌদ্ধ তরুণদের কর্তৃক গ্রামের পর গ্রাম ঘেরাও করে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি নিক্ষেপ, কোপাকুপি, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও আগুন দিয়ে ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার নাম কি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান না জাতিগতভাবে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন ও নির্মূল অভিযান? পৃথিবীর কোন সভ্য রাষ্ট্রই এধরণের সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান সমর্থন করতে পারে না। আরও কতদিন সভ্য জাতিরাষ্ট্রসমূহ মিয়ানমারের এ অরাজকতা বিষয়ে চুপ করে থাকবে? কেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অতি-দ্রুত ব্যবস্থা নিবেনা?

লেখক : সহকারী অধ্যাপক , বাংলা বিভাগ ও এম এ এস গব্ষেক ।

Top