কক্সবাজার ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে

শাহেদ মিজান, সিবিএন:
মায়ানমার থেকে নতুন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ছড়িয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত এলাকা উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি ছাড়িয়ে কক্সবাজার শহর বিভিন্ন উপজেলা, বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলা এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে। অনিবন্ধিত এসব রোহিঙ্গা ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের লোকজনের মাঝে আশংকা দেখা দিচ্ছে। কারণ রোহিঙ্গা এভাবে ছড়িয়ে পড়লে নিকট ভবিষ্যতে তার এদেশের মানুষের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গা ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অস্বাভাবিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গার আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থান করছে। উখিয়া ও টেকনাফ ছাড়াও কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে অনেক দিন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। আত্মীয়তার সূত্র ধরে নতুন আসা অনেক রোহিঙ্গা আগে আসা রোহিঙ্গাদের খোঁজ নিয়ে তাদের কাছে ছুটে চলছে। এভাবে গত কয়েকদিনে অর্ধলক্ষাধিক নতুন আসা রোহিঙ্গা ছড়িয়ে গেছে। এদের মধ্যে আবার অনেকে নিরুদ্দেশ হয়ে ছুটছে। নিরুদ্দেশ হওয়ারা অধিকাংশই ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার শহর ও শহরতলীর আশেপাশে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে। তারা শহরের বিভিন্ন এলাকায় পূর্ব পরিচিত বা নিকট আত্বীয় স্বজনের কাছে স্থান নিয়েছে। এর মধ্যে শহরের পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন পাড়ায় অধিকাংশ সংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

পাড়াতলী সাত্তার ঘোনা এলাকার ছৈয়দ আলম জানান, গত পাঁচ দিন ধরে সাত্তার ঘোনার পুরনো রোহিঙ্গাদের বাড়িতে নতুন আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে। সাত্তার ঘোনায় এখন প্রায় দু’হাজার নতুন রোহিঙ্গা এসে বলে দাবি করেন ছৈয়দ আলম। এছাড়াও শহরের পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন পাড়ায় এভাবে রোহিঙ্গারা ঢুকে পড়েছে। প্রতিদিন রোহিঙ্গারা আসছে সেখানে। এভাবে বৃহত্তর পাহাড়তলী এলাকার নুতন বাজার, জিয়া নগর,বাদশাঘোনা, মৌলবী পাড়া, ফাতের ঘোনা, আবদুল্লাহর ঘোনা, ইসলামপুর, অল্লা ঘোনা, আবু উকিলের ঘোনা,শাহ নূর পাড়া,বাচা মিয়ার ঘোনা, আদর্শ গ্রাম, টেকনাফ পাহাড় এলাকা, হালিমা পাড়া, নুরু সওদাগরের ঘোনা,সত্তর ঘোনা, সিরাজের ঘোনা, নজির হোসেনের ঘোনা,পল্লাইন্য কাটা, সমিতি ঘোনা এলাকায় কমপক্ষে ২০ হাজার রোহিঙ্গা এসেছে। যারা বেশির ভাগই বিভিন্ন বাসা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের অনেকে জানান, পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়া পাড়াসহ অন্যান্য গ্রামে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের পুরনো আসা আত্মীয়দের বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। একইভাবে শহরতলীর লিংকরোড, বাসটার্মিনাল, জেইলগেট এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

ঈদগাঁও থেকে স্থানীয় সংবাদকর্মী শাহিদ মোস্তফা জানান, ঈদগাঁও স্টেশনসহ গ্রামীণ এলাকায় মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নতুন রোহিঙ্গার দেখা মিলছে। গত কয়েকদিন ধরে ঈদগাঁও স্টেশনের দোকানে দোকানে ভিক্ষা করছে এসব রোহিঙ্গারা। এছাড়াও বাসাবাড়িতে গিয়েও ভিক্ষা ও অনেকে কাজের বিনিময়ে আশ্রয় চাচ্ছে।

চট্টগ্রাম থেকে সাজ্জাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, চট্টগ্রামেও নতুন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার দেখা মিলছে। বৃহস্পতিবার তিনি চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় তিন রোহিঙ্গা পরিবারকে স্বপরিবারে ভিক্ষা করতে দেখেছেন। অনেকে আবার কাজের ফরমায়েশ চাচ্ছেন।

সূত্র মতে, উখিয়া ও টেকনাফে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার মধ্য থেকে ছড়িয়ে পড়ারা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই কক্সবাজার ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে কিছু রোহিঙ্গা বান্দরবান শহরসহ অন্যান্য উপজেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। বান্দরবানের সব উপজেলায় আগে থেকেই অনেক বসবাস করছে। ছড়িয়ে পড়া নতুন রোহিঙ্গারা পুরনো আসা ওসব আত্মীয়দের কাছে আশ্রয় নিচ্ছে।

স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এমনি বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে। নতুনভাবে আসা রোহিঙ্গারাও যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে পর্যটন নগরী কক্সবাজরের পরিবেশ ভারী হয়ে যাবে। তাই সচেতন মহলের জোর দাবী দ্রুত এসব রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিয়ে এক জায়গায় রাখা হওক।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অনুপ্রবেশকারী সব রোহিঙ্গাকে বালুখালী নিয়ে গিয়ে একটি ছবিসহ তালিকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কাজটি চলছে। তাই রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া নিয়ে কঠোর রয়েছে প্রশাসন।

জনপ্রনিধিরা জানান, জেলা রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া বিষয়ে জেলা প্রশাসন থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কোনো ভাবে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া যাবে না। বাসাবাড়িও ভাড়া দেয়া যাবে না। তাদের মোটামুটি মানবিক পর্যায় থেকে সহযোগিতা করে ক্যাম্পে ফিরে উদ্বুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা সেভাবে কাজ করছে অনেকে জানিয়েছেন।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা পুলিশের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না। এ ব্যাপারে কক্সবাজারের মানুষ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।’

জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জন্য পাহারা দিচ্ছি। তারপরও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু রোহিঙ্গা ছড়িয়ে পড়ছে বলে জেনেছি। সব রোহিঙ্গাকে বালুখালীতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবো এবং সেখানে সবাইকে নিবন্ধন করা হবে।’

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •