আমান উল্লাহ আমান, টেকনাফ:
বৃষ্টিতে ভিজছে আর রোদে পুড়ছে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। কেউ ছাতা মাথায় আবার কেউ ত্রিপল দিয়ে রোদ আর বৃষ্টি হতে শিশু-মহিলাদের রক্ষার চেষ্টা করছে। সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গুলি থেকে প্রাণে বাঁচতে দলে দলে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের করুন আর্তনাদ সীমান্ত নগরী টেকনাফের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তাদের অনিশ্চিত গন্তব্য ও যাত্রা কোথায় জানা নেই। চোখে মুখে আতংক ও বিষন্নভাব। যেখানে পারে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। ক্ষুদার যন্ত্রনায় ছটপট করছে শিশুরা। অবুঝ শিশুদের কান্না থামাতে শান্তনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছে মা-বাবা। এসব শিশুদের কান্না মিশে যাচ্ছে হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের শোরগোলে। পুরুষদের নিরুপায় নির্বাক চাহনি অশ্রুজলে ছল ছল করছে।
প্রান বাঁচাতে আসা রোহিঙ্গাদের একেক পরিবারে ৭ জন থেকে ১২ জন সদস্য। নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেশী। রয়েছে বৃদ্ধ পিতা-মাতা, শশুড়-শাশুড়ী। শত কষ্টে তাদের নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে।
হাঁটতে পারেনা। দানা খাদ্যও গিলতে পারেনা। বয়স ৯০ পেরিয়েছে। যেন অবুঝ শিশু। মা ছোট্ট সন্তানকে কোলে তুলে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে আর অনেক সন্তান বৃদ্ধ মা-বাবাকে কাঁধে তুলে ছুঁটছে ওই প্রান্ত থেকে এপ্রান্তে। ছেলেদের এই ভালবাসা ও রোহিঙ্গাদের হৃদয় বিদারক এসব মমতাবোধ টেকনাফ-উখিয়ার পুরো সীমান্ত জুড়ে।
এমন কয়েকজন রোহিঙ্গা পরিবারের সাথে এপ্রতিবেদকের কথা হয়। মায়েনা খাতুন (৮০)। মংডুর মেরুল্লা গ্রামের মৃত ইসমাইলের স্ত্রী। বয়সের ভারে নুয়ে চলতে পারেনা। দানা খাদ্য খেতে পারেনা। তার ছেলে লেড়– মিয়া (৪৮) মাকে কাঁধে বহন করে পরিবারের ১১ জন সদস্য নিয়ে ঘর থেকে ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় বেরিয়েছে। পাহাড় ও ধানক্ষেতে লুকিয়ে বিভিষীকাময় দিন-রাত কাঠিয়েছে। বর্মী সেনাবাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য রেখে হেঁটে হেঁটে বহু কষ্টে ১২ দিন পর মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদ্বিয়া সীমান্তে পৌঁছেছে। সেখান থেকে একদিন পর জনপ্রতি ৯ হাজার টাকা দিয়ে গত বৃহস্পতিবার টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী সৈকত দিয়ে এপারে চলে আসে। লম্বা এসব পথগুলো লেড়– মিয়া তার বৃদ্ধ মাকে কাঁধে বহন করে অতিক্রম করেছে। লেড়–মিয়া আরো জানান, প্রতি মুহুর্তে আতংক নিয়ে প্রাণপন ছুঁটেছি। এখন অন্তত আর সেই বিভীষীকাময় দিন-রাত ও ভয় নেই। বৃদ্ধ মা’সহ পুরো পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এখন যেখানে বাংলাদেশ সরকার আশ্রয়ের ঠাঁই দিবেন সেখানে রয়ে যাব।
শুধু লেড়– মিয়া কেন? এভাবে মংডুর গদুচছরার নাতীর কাঁদে ভর করে শহর মুল্লুক (৯৫), ছেলেদের কাঁধে ভর করে মংডু থানার উদং গ্রামের শামারূপ বিবি (৯০), হাইচ্ছুরাতা গ্রামের সোনা বিবি (৮৮), বুছিডং থানার খানছামা পাড়ার আবদুর রহিম (১১০) বৃদ্ধ মা-বাবাকে জীবন বাজি রেখে ছেলেরা এপারে নিয়ে এসেছেন।
২৫ বছর ধরে মংডুর লম্বাঘোনা মিডল স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন মাষ্টার আবদুর রহিম (৮৯)। ৫ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদ্বিয়া সীমান্ত থেকে নাফ নদী পেরিয়ে শাহপরীরদ্বীপ সীমান্ত দিয়ে এপারে ঢুকেন। তিনি জানান, সেনাদের বর্বরতা ও অত্যাচারের শুরুর দিন থেকে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। হঠাৎ করে চারদিক থেকে সেনাদের এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষন এবং ঘরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এসময় পালাতে গিয়ে তার নাতি আবদুস সালাম (২৫) ও আমির হোছনের (৮) শরীরে গুলি লেগে মৃত্যু হয়েছে। সে সময় দিকবেদিক ছুটে কে কোথায় খবর নেওয়ার সময় পায়নি। পরে সেনারা চলে গেলে মৃতদেহগুলো দাফন করা হয়। এখন পরিবারের ১১ সদস্য নিয়ে এপারে চলে আসি। এবারের মতো এমন বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতন রাখাইন রাজ্যে আর দেখেননি বলেও জানান তিনি।
তাদের মতো দলে দলে আসা রোহিঙ্গাদের পরিবারের করুন দশা বর্ননার ভাষা হারিয়েছে অনেকে। শোকে কাতর অনেক পরিবার। এই অবস্থায় সহায় সম্বল রেখে সীমান্ত পাড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা অর্ধহারে অনাহারে বসে আছে প্রধান সড়কের পাশে ও টেকনাফ বাস স্ট্যান্ডে। এসময় বৃষ্টি হলে ভিজছে আর রোদ হলে পুড়ছে। কিছুক্ষণ পরপর গাড়ী যোগে নিজ গন্তব্যের দিকে ছুঁটছে অসহায় এই রোহিঙ্গা পরিবারগুলো।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •