রোহিঙ্গাদের রুখে দাঁড়ানো শিখতে হবে, পালিয়ে আসলে হবে না

শেখ আদনান ফাহাদ

রোহিঙ্গা মুসলিমদের কেউ মানুষই মনে করছে না। ছোট শিশুদের পর্যন্ত গলা টিপে, বুটের তলায় পিষে, বুলেটের আঘাতে কিংবা সাগরে ভাসিয়ে হত্যা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীরা আমাদেরকে মানুষ মনে করেনি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা মাত্র নয় মাসে ৩০ লাখ (আরও বেশী হতে পারে) মানুষ হত্যা করেছিল। এরপরেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তিতে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলাম।

প্রতিবেশী ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ভারতের হাজারেরও বেশী সৈন্য বাংলাদেশের মাটিতে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। আমাদের এক কোটির মত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত। সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের অনেকে দাবি তুলে থাকেন যে, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত ওপেন করে দিতে হবে। মানবতাবাদ দিয়ে বিচার করলে, এমন দাবি সঠিক বলে মনে হয়। কিন্তু শুধু আবেগ দিয়ে অবস্থান নির্ণয় করা সঠিক হবে না বলে আমি মনে করি।

ভারতও ১৯৭১ সালে শুধু আবেগজনিত কারণে আমাদের পাশে এসে যুদ্ধ করেনি। পরিস্থিতি ও বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাজনিত দীর্ঘমেয়াদী বেনেফিট পাবে বলেই ভারত আমদের সহযোগী শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত যে আবেগ দিয়ে কাজ করেনা, তার প্রমাণ, দেশটি ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বর্বর সরকারের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করেছে। অথচ মিয়ানমারের সরকার বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক এক সংকট তৈরি করেছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালিয়ে মানবিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসতে বাধ্য করছে (ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে মিয়ানমারের ভূমিপুত্র রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে, এরা এখানে বংশবৃদ্ধি করছে)। অন্যদিকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের সীমান্তে গুলিবর্ষণ করছে, নতুন করে গণহত্যা চালাতে গিয়ে মর্টার শেল মেরেছে, মাস কয়েক আগে আমাদের এক বিজিবি সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে। এমন বিপদে আমাদের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র ভারত মিয়ানমারের সরকারের প্রতি তার সমর্থন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেছে।কারণ এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করা এবং নিজেদের অস্ত্র বাণিজ্য চাঙ্গা রাখতে মিয়ানমারকে দরকার ভারতের। তাই ১৯৭১ সালে আমাদের পাশে দাঁড়ালেও ভারত ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াবে না।

১৯৪৭ সালে সে সময়কার তরুণ মানবতাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন সমমনা অন্যান্যদের সাথে নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা, আসামের কাছার ও করিমগঞ্জ, দার্জিলিং এবং কলকাতা নিয়ে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক রাষ্ট্র কায়েমের আন্দোলন করে প্রায় সফল হয়ে যাচ্ছিলেন তখন কিন্তু এই ভারতের কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ইংরেজ প্রতিনিধি রেডক্লিফের সাথে দিল্লীতে এক গোপন মিটিংয়ে ভারতবর্ষকে নিজেদের মত করে ভাগ করে নিয়েছিল।

পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েমের সংগ্রামে পরিষ্কার টার্গেট স্থাপন করে ধীরে ধীরে এগিয়েছেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধু পূর্ব-পরিকল্পনাকেই বাস্তবায়ন করেছিলেন, এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। ভারত সরকারের সাথেও বঙ্গবন্ধুর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ১৯৬২ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু আগরতলা সীমান্ত দিয়ে দিল্লীতে জহরলাল নেহেরুর সাথে দেখা করে ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছিলেন। নেহেরু তখন বলেছিলেন, ‘তোমরা আগে প্রস্তুত হও, এখন আমরা কিছুই করতে পারবনা’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও ভারত একেবারে শেষের দিকে এসে সরাসরি আমাদের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছে।

এর আগে আমাদের ৩০ লাখ মানুষ পাকিস্তানীদের হাতে প্রাণ দিয়েছে। দুই লাখ মা-বোনের উপর অমানবিক, পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছে পাকিস্তানী হায়েনারা। আমাদের মুক্তিবাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পাকবাহিনীকে মোকাবেলা করেছে। ভারত প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা তখনই দিয়েছে, যখন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী বিপ্লবী নেতা তাজউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধানে মুজিবনগর সরকারের অধীনে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও ঘোষণায় মুক্তিবাহিনী, নব্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর বীর কর্মকর্তা ও সৈনিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানীদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি গেরিলা কৌশল-নির্ভর জনযুদ্ধ ছিল, এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা। ভারত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে অস্ত্র দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে সব সত্য। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য, আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিজেদের একটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন বলেই ভারত সহযোগিতা দিয়েছিল। ভারত যদি এতই আমাদের ‘ত্রাণকর্তা’ হয়ে থাকে, তাহলে দরকারের সময় পানি আটকে রেখে আর বন্যার মৌসুমে পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের দুর্যোগের কারণ হয় কেন? ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় কিংবা ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন ভারতের ভূমিকাও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

ইতিহাসের কালো গহ্বর থেকে তুলে এনে বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিতে জন্ম নিয়েছিলেন একজন বঙ্গবন্ধু মুজিব। তাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আমরা। স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন আমাদের। স্বাধীনতা কী জিনিস, তা রোহিঙ্গা মুসলিম, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, ভারতের কাশ্মীর, ভারতে গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে নিহত মুসলিম, ফিলিস্তিন কিংবা শ্রীলংকায় তামিলদের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়। আমার ছেলে সারারাত ঘুমিয়ে সকালে উঠে আলসেমিভরা কণ্ঠে আমার উপর পা রেখে আমাকে চুমু খায়, আমি তখন মনে মনে বলি, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের মালিক আমরা। এটা ভাবলেই মনের অনেক কষ্ট চলে যায়। আজ আমি যদি রোহিঙ্গা মুসলিম হতাম, তাহলে আমাকেও হত্যা করত বর্বর মিয়ানমার, আজ আমার বাড়ি ভারতে হলে, ঈদের আগে আতংক নিয়ে বসবাস করতে হত, আজও পাকিস্তান থাকলে না খেয়ে, বেকার হয়ে, পাকিস্তানী পুলিশ আর সেনাবাহিনীর বুলেট খেতে হত আমাদের। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক করার জন্য জাতির পিতার প্রতি বুকভরা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। এই অনুধাবন ভাষায় প্রকাশ করার মত না।

রোহিঙ্গাদের প্রতি শুধু না, বিশ্বের সব মজলুম মানুষের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আছে। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়াতে জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলনে অংশ নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুভাগে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে’। জাতির পিতার দিয়ে যাওয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরাও শোষিতের পক্ষে। কিন্তু আবেগ দেখাতে গিয়ে কাঁচা কাজ করলে হবেনা। বর্ডার আপনি ওপেন করে দিতে পারেন। এরা এখানে এসে থাকবে, বংশবৃদ্ধি করবে। কিন্তু নিজের জায়গা ছেড়ে আসলে কোনদিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আসবেনা রোহিঙ্গাদের। রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসাকে উৎসাহিত করা যাবেনা। মিয়ানমারের দানব সরকারও চায় ওরা পালিয়ে আসুক আর সীমান্ত খোলে দিই।

মিয়ানমারের বর্বর, সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে রোহিঙ্গাদের। স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের নামে হঠকারিতা করলেও হবেনা। এত কঠিন প্রক্রিয়া সম্পাদন করতে পারবে রোহিঙ্গারা? কাশ্মীর কি পারছে কিংবা ফিলিস্তিনিরা, কিংবা পাকিস্তানের বালুচরা? আমরা পেরেছিলাম, কারণ আমাদের নেতা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

লেখকঃ শিক্ষক ও সাংবাদিক

কক্সবাজার নিউজ সিবিএন’এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

সর্বশেষ সংবাদ

গর্জনিয়ার জমিদার ফরুক আহমদ শিকদারের সহধর্মিনীর ইন্তেকাল

মালিকবিহীন ৪০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার

আকিদা ঠিক করেন, সব ঠিক হয়ে যাবে -শাহ আহমদ শফি

গাজাসহ ডিআরসি কর্মকর্তা আটক

কক্সবাজার-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চূড়ান্ত প্রার্থী আলহাজ্ব ডাঃ মুহাম্মদ আমীন

চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে আধুনিক সিটি স্ক্যান মেশিন

খাশোগি হত্যায় ৫ সৌদি কর্মকর্তার ফাঁসির আদেশ

কেন শুরু হলো না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন?

মেরিন ড্রাইভ সড়কে যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ

জুমার দিনের দোয়া: নাজিমরা ফিরে আসুক কল্যাণের পথে

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা-নজরদারিতে এবার আর্মড পুলিশের নতুন ব্যাটালিয়ন

তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব, হচ্ছেনা বিশ্ব ইজতেমা

ঈদগাঁওতে পিএসপি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা

দেশপ্রেমিক আদর্শ জনগোষ্ঠী তৈরী করছে কওমি মাদ্রাসা -আহমদ শফী

১৯৯০ ব্যাচের ছাত্র নুর রহিমের মায়ের মৃত্যু, ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের শোক

ভোট আর পেছাচ্ছে না

নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ঈদগাঁওতে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল

চকরিয়া পৌর যুবলীগ নেতা ফরহাদ আর নেই, জানাজা সম্পন্ন

বেবী নাজনীন ছাড়া পেয়েছেন, নিপুনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে

চকরিয়ায় উগ্রবাদ ও সহিংসতা প্রতিরোধে কর্মশালা সম্পন্ন