শাহেদ মিজান, সিবিএন:
‘জন্মিলে মরিতে হইবে’ এই অমোঘ সত্যটি অস্বীকার বা পাশ কাটানো পৃথিবীর কোনো মানুষের সাধ্য নেই। সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে; পাড়ি দিতে হবে অনন্তের পথে। স্বাভাবিকভাবে এই অখন্ডনকেই মেনেই নিতে হয়। কিন্তু কিছু মানুষের চলে যাওয়া খুব বেশি অস্বাভাবিক হয়ে ধরা দেয় জগৎ সংসারে। এইসব মৃত্যুগুলো কোনোভাবেই মানা যায় না। জগতের কিছু মানুষের ওপারে যাওয়ার এই সত্য পৃথিবীকে কাঁপিয়ে যায়। কাঁদিয়ে যায় পৃথিবীর মানুষগুলোকে। তেমনটি একজন মানুষ রিফাত। বড় অসময়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশের পাড়ি জমালেন রিফাত। কি এমন অভিমান ছিলো যে, এমন অসময়ে তাকে চলে যেতে হবে? তাকে হারানোর শোকে মূহ্যমান মানুষগুলোকে হয়তো এই প্রশ্নটিই বিদ্ধ করছে! এক বুক অভিমান ছাড়া এই টগটগে যুবকের এত অসময়ে চলে কথা নয়! আর কোনো দিন ফিরবে না অনন্তের পথে যাত্রী রিফাত। তাই তার জমানো অভিমানটও কারো জানা হবে না কারো। মা-বাবার আদরের ধন, বন্ধুদের ‘সুইট’ রিফাত সবকিছু ছিন্ন করে ওপারের বাসিন্দা। তিনি আজ সবকিছুর উর্ধ্বে।

কথা হচ্ছিল রামুর সন্তান ও কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সদস্য রিফাতকে নিয়ে। তার মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থিতিতে এমন আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে কক্সবাজারের সর্বত্র। রিফাতের মৃত্যু কক্সবাজারের সর্বদলীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও সাধারণ মহলেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এমনকি রিফাতের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর সাথে সাথে কক্সবাজার ছাড়িয়ে দেশের অনেক স্থানে ছড়িয়ে গেছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) ভোর পৌনে চারটায় রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের শ্রীকূল গ্রামের নিজ বাড়িতে ঘুম থেকে জেগে হঠাৎ বমি করেন রিফাত। এর পরই কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর এবং অবিবাহিত ছিলেন। রিফাতের বাবার নাম সৈয়দ আহমদ। তিনি আমেরিকা প্রবাসী। মা খতিজা বেগম এবং এক মাত্র ছোট ভাই হাসান মাহমুদ আরফাতও বাবার সঙ্গে আমেরিকায় থাকেন। তাঁর মৃতুুর খবর শুনে দেশে ছুটে এসেছেন মা খতিজা বেগম। ১৯ আগষ্ট (শনিবার) বিকেল সাড়ে ৫টায় রামু খিজারি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে মরহুম রিফাতের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। দলমত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ রিফাতের জানাযায় অংশ নেন। বৃহস্পতিবার মৃত্যু দিন থেকে পুরো রামু ও রিফাতের পরিচিত মহলের সবখানে শোকের আবহ চলছে।

রিফাতের শোকে মূহ্যমান পরিচিতজনেরা নানাভাবে শোক প্রকাশ করছেন। তবে সব থেকে বেশি শোক প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ফেসবুক পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, পুরো ফেসবুকজুড়ে রিফাতের মৃত্যু খবরের অবিরত শোকগাঁতা। তার রাজনৈতিক সতীর্থসহ নানা শ্রেণি-পেশার লোকজন সমবেদনার সাথে শোক প্রকাশ করে যাচ্ছেন। জেলা ছাত্রলীগের সদস্য ও রামুর ত্যাগী ছাত্রলীগ নেতা হোসাইন মাহমুদ রিফাতের মৃত্যুর পর থেকে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরা ফেসবুক প্রোফাইলে নিজেদের ছবি পরিবর্তন করে রিফাতের ছবি ব্যাবহার করছেন। অনেকে আবার ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে লিখেছেন স্মৃতিচারণ করছেন ফেলে আসা দিনগুলোর। এক কথায় ফেসবুকে ঢুকলেই রিফাতের ছবি ও স্মৃতিকথা চোখে পড়ছে।
জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয় লিখেছেন, চির বিদায় রিফাত.. ওপারে ভাল থাকিস ……।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সহকারি পরিচালক ও আমাদের রামু ডটকমের সম্পাদক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু ফেসবুকে রিফাতকে নিয়ে এক পর্যায়ে লিখেছেন-‘রামুতে ছাত্র রাজনীতিতে দিনে দিনে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সে। রিফাতরা এভাবে চলে যায় বলে আজ তারুণ্যের বিপুল সম্ভবনাময় রাজনীতি খুব ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং নষ্টদের হাতে চলে যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়। অথচ রিফাতদের মত স্বপ্নবান, ভদ্র, ন¤্র তরুণ আমাদের রাজনীতি এবং সমাজের জন্য খুব বেশি দরকার।’

কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মোরশেদ হোসাইন তানিম ফেসবুকে লিখেছেন-শোক প্রকাশ করার মতো ভাষা নেই। হঠাৎ রিফাতের মৃত্যুর সংবাদ শুনে বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠলো। দুদিন আগে তাঁর সাথে বসে খাবার খেয়েছি, সুখ দুঃখের অনেক কথা বলেছি। বুধবার সন্ধ্যায় তাঁর জন্য আমাকে, তার উপস্থিতিতে এক প্রিয় দাদা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে দেখভাল করার জন্য অনুরোধ জানালো। আর আজ সে নেই। ভাবতেও অবাক লাগছে-কান্না পাচ্ছে।

রামু উপজেলা ছাত্রলীগের অভিভাবক আমজাদ আলী খাঁন রিফাতকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন-‘এভাবে হাসালি কেন ভাই। পুরো রামুকে কাঁদিয়ে। এই জনপদে তোর মত স্পষ্ট সম্ভাবনা আর কেও নাই।’

রামুর সিনিয়র সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ লিখেছেন- মূলত রিফাত দীর্ঘদিন ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে সবার কাছে হয়েছেন প্রিয়ভাজন। সমালোচনা বা কোন অপবাদ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং সদা হাস্যোজ্বল রিফাতের সততা, বিনয়ী স্বভাব ছিলো সবার কাছে অতি চেনা। বন্যাদূর্গত, শীতার্ত ও অসহায় মানুষেরও সহায় ছিলেন রিফাত। সাম্প্রতিক বন্যায় ছুটে গিয়েছিলেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে। অন্যের স্বপ্ন পূরণের বাসনায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়া এ ছাত্রনেতা নিজের স্বপ্ন পূরণের আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •