cbn  

সোহরাব হাসান, প্রথম আলো:

আওয়ামী লীগ নেতারা যে বলছেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে গেছেন দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে, তার পক্ষে কী কী তথ্য–প্রমাণ তাঁদের কাছে আছে আমরা জানি না। তবে এটুকু জানি যে কোনো ষড়যন্ত্র করতে লন্ডন বা নিউইয়র্ক যেতে হয় না। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা দেশেই ছিল।
বিএনপির প্রধান লন্ডন থাকতে তিনজন নেতাকে দেশ থেকে তলব করেছেন। ধারণা করা যায়, আগামী নির্বাচন নিয়ে দলের নীতিকৌশল চূড়ান্ত করতেই তিনি তাঁদের ডেকে পাঠিয়েছেন।
বিএনপির নেতারা প্রকাশ্যে যে কথাটি বলেন তা হলো খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্যই লন্ডনে গিয়েছেন এবং সেখানে যেহেতু দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা তারেক রহমান আছেন, তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। খালেদা জিয়া প্রায় দুই মাসের অনুপস্থিতিতে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে না যাওয়ায় দলের সমর্থক বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রকাশ্যে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। দলের শীর্ষ নেতা দীর্ঘদিনের জন্য বাইরে গেলে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ম মেনে চলে না।
আগস্ট শোকের মাস। সেই সঙ্গে বিএনপির জন্য কিছুটা অস্বস্তিরও। এবার ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকীতে বিএনপি নেত্রী দেশে ছিলেন না। দলের নেতারা কেউ কেক কেটে তাঁর জন্মদিন পালন করেননি। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্যার কারণেই তাঁরা কেক কাটা থেকে বিরত থেকেছেন। কারণ যা-ই হোক, জাতীয় শোক দিবসে কেক না কেটে বিএনপি নেতারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা ধন্যবাদ পেতে পারেন। সমালোচনার মুখে গত বছর থেকে কেক কাটার আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ আছে। কিন্তু এই কাজটি বিএনপি নেতারা মন থেকে মেনে নিয়েছেন বলে মনে হয় না। বিশেষ করে যখন দেখি কেক কেটে দলীয় নেত্রীকে জন্মদিন পালন না করার আহ্বান জানানোর অজুহাতে উপজেলা পর্যায়ের এক নেতার সদস্যপদ স্থগিত এবং তাঁর প্রতি কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়, তখনই খটকা লাগে।
প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় জাতীয় শোক দিবসের এক আলোচনা সভায় খালেদা জিয়াকে কেক কেটে জন্মদিন পালন না করার আহ্বান জানিয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম নিজামুল কবির। তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্ট মর্মাহত বেদনার দিন। আমি যে দলের সমর্থক, সে দলের প্রধান খালেদা জিয়ার আজ জন্মদিন। এই দিনটিতে জন্মদিন উদ্যাপন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্ক অবসানের জন্য আমার এই বক্তব্যটি সাংবাদিকদের মাধ্যমে দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে জানাতে চাই। খালেদা জিয়ার জন্মদিন নিয়ে বিভিন্ন কথা উঠেছে। সার্টিফিকেট খোঁজা হচ্ছে। খালেদা জিয়া আজকের দিনটি কেক কেটে উদ্যাপন না করে ঘরোয়া পরিবেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে পালন করতে পারতেন। সারা দেশের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিতেন, আমরা আর কেক কেটে জন্মদিন পালন করব না। তাহলে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ তাঁকে (খালেদা জিয়া) সমর্থন দিত। কিন্তু তা করা হয় না। আবার সরকার পরিবর্তন হলে বঙ্গবন্ধুর অবদানকেও ভুলে যায়। এটা হওয়া উচিত নয়। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে আমি মানুষ হিসেবে কোনো দিন অস্বীকার করতে পারব না।’ (প্রথম আলো, ১৬ আগস্ট ২০১৭)
বিএনপির নেতারা নিজামুলের এই বক্তব্যকে ভালোভাবে নিতে পারেননি। প্রথমে মঠবাড়িয়া উপজেলা কমিটি তাঁর পদ স্থগিত করে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়। তারপর পিরোজপুর জেলা কমিটিও একই পদক্ষেপ নেয়। কেবল তা-ই নয়, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাইনুল ইসলাম বলেছেন, ‘নিজামুল কবির নীতিবিবর্জিত লোক। তিনি এক-এগারোর সময় সংস্কারপন্থী ছিলেন। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিরোধিতা করে দল থেকে বহিষ্কার হন। পরবর্তী সময়ে ক্ষমা চেয়ে দলে ফিরে আসেন। এ ধরনের নীতিহীন লোকদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ আমরা এত দিন জানতাম মূল দল সহযোগীদের চালায়। এখানে দেখছি বিএনপিতে কে থাকবে, কে থাকবে না, ছাত্রদল নেতা সেটি ঠিক করে দিচ্ছেন।
১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক অনেক দিন থেকেই। তিনি প্রথম থেকে কেক কেটে সাড়ম্বরে জন্মদিন পালন করতেন না। ক্ষমতায় আসার কয়েক বছর পর ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালনের আঞ্জাম শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, ১৫ আগস্ট খালেদার জন্মদিন নয়। সনদ অনুযায়ী তাঁর জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মনে আঘাত দিতেই তিনি এই কাজটি করে থাকেন। আমরা যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই ১৫ আগস্টই তাঁর জন্মদিন, তারপরও বলব এই দিনে কেক কেটে জন্মদিন পালন করা উচিত নয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ তাঁর কারাগারে কেমন ছিলাম ২০০৭-২০০৮ বইয়ে ১৫ আগস্ট ২০০৮ সালের ডায়েরিতে তিনি লেখেন, ‘বিতর্কিত একটি জন্মদিন হিসেবে বেগম জিয়ার ৬৩তম জন্মদিন। সঠিক হলেও আমি হলে আমার জন্মদিন বোধ হয় এক দিন আগে বা এক দিন পরে পালন করতাম ও শেখ মুজিব হত্যা দিবসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতাম। এটি রুচিবোধের বিষয়। বেগম জিয়া তা করলে তিনি সকল শ্রেণির জনগণের কাছ থেকে আরও বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারতেন। তাঁর এই উদারতা তাঁকে আরও বেশি মহান করত (পৃষ্ঠা: ৩২৪-৩২৫)। মঠবাড়িয়ার বিএনপির নেতা ও মওদুদ আহমদের কথার মধ্যে কোনো ফারাক নেই।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা ঘটে, তখন দল হিসেবে বিএনপির জন্ম হয়নি। কিন্তু ২০০৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেই ২১ আগস্ট আরেকটি ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত হামলা হয়। আগের হামলা ছিল রাতের অন্ধকারে, আর পরেরটি ঘটে প্রকাশ্যে দিনের বেলায়। সেদিন আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা পুরো নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। বিএনপির নেতারা বলেন, ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড তাঁরা ঘটাননি; ঘটিয়েছে জঙ্গিরা। কিন্তু সেই ঘাতক জঙ্গিদের প্রতি বিএনপি সরকার ও দলের অবস্থান কী ছিল? তারা ঘাতকদের ধরে বিচারে সোপর্দ করেছেন? করেননি। বরং জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচাতে সচেষ্ট ছিলেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর হামলার মূল হোতা মাওলানা তাজউদ্দিনকে বাঁচাতে সীমান্ত পার করে দিয়েছেন। ঘটনার পরপরই সব আলামত মুছে ফেলা হয়েছে।
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এটি আওয়ামী লীগের কাজ। আওয়ামী লীগ জনগণের সহানুভূতি পেতেই নাকি গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে নানা তথ্য-উপাত্ত এবং আক্রমণে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে যে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি–বি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানই (ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলার দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে) এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী।
কিন্তু সেদিন বিএনপির মন্ত্রী-নেতারা আক্রান্ত মানুষের পক্ষে না দাঁড়িয়ে জঙ্গিদের পক্ষ নিয়েছিলেন। সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, প্রশাসন, গোয়েন্দা—সবাই একই সুরে কথা বলেছে। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিশনও দাবি করে বসল, এই হামলার পেছনে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী নেই। সীমান্তের ওপারের শক্তিশালী দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা সেখানে পলাতক সন্ত্রাসীদের দিয়ে এটি ঘটিয়েছে।
২০০৬ সালে প্রকৃত ঘটনা ফাঁস করে জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সিআইডি তাঁর পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০০৬)
পরবর্তীকালে তদন্তে বেরিয়ে আসে, সেই সময়ে সরকার কেবল অপরাধীদের বাঁচাতে নানা অপকৌশলের আশ্রয়ই নেয়নি; প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীসহ সরকার ও প্রশাসনের অনেকেই এই তৎপরতায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। অন্যতম জঙ্গি মাওলানা তাজউদ্দিন ছিলেন উপমন্ত্রী আবদুস সালামের ভাই। উপমন্ত্রীর বাসায় জঙ্গিরা একাধিকবার বৈঠক করেছে।
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন। এ নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকতে যেভাবে মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছিল, তাতে এই ধারণা অমূলক নয় যে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের একাংশ এর পেছনে ছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বছর এক সমাবেশে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে ইতিহাসের কলঙ্ক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেই কলঙ্কের হোতাদের ইন্ধনদাতা কিংবা তাঁদের নিরাপদে দেশ থেকে পার করে দেওয়া লোকদের ফের দলের নেতৃত্বে বসিয়ে কীভাবে বিএনপি সেই কলঙ্ক মুছে ফেলবে?
আসলে বিএনপি আগের অবস্থান থেকে বদলায়নি। বদলালেও তা এতটাই সূক্ষ্ম যে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়। এ কারণেই তাঁরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিভিন্ন কমিটিতে রেখে দলকে সুসংগঠিত করতে চাইছেন। তাঁরা মনে করছেন, আবদুস সালাম কিংবা লুৎফুজ্জামান বাবর ছাড়া বিএনপি অচল।
১৫ আগস্টের বিষয়ে নীরব থেকে বা ২১ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দলে নিয়ে যে রাজনৈতিক সমঝোতা বা সুস্থ গণতন্ত্র চর্চা সম্ভব নয়, সেই সরল সত্যটিও বিএনপি নেতারা স্বীকার করতে চাইছেন না।

-সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •