বাংলাট্রিবিউন:

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে অংশ না নিয়েও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন জানাতে ক্ষমতাসীনদের পাশে থাকতে চায় ছোট ছোট কয়েকটি ইসলামি দল। দৃশ্যত নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বাড়ানোর চিন্তা থাকলেও কার্যত যেকোনও উপায়ে নৌকা মার্কার ফল ভোগ করতে চায় এই দলগুলো। এদের মধ্যে একাধিক দলের নিবন্ধন না থাকায় নিবন্ধন করা, নির্বাচনের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা, সরকারি ধর্মীয় কোনও প্রতিষ্ঠানে কাজ নেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় থাকতে নৌকার পক্ষে থাকার কৌশল নিচ্ছে ধর্মভিত্তিক অন্তত ছয় থেকে আটটি দল।
জানা গেছে, গত এক বছরের বেশি সময় ধরেই কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট করার চেষ্টা করছেন ১৪ দলীয় জোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল। বাংলা ট্রিবিউনে এ নিয়ে ‘তরিকতের নেতৃত্বে আসছে নতুন ইসলামি জোট!’ শিরোনামে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
এম এ আউয়ালের প্রচেষ্টা কিছুটা ঢিমেতালে হওয়ায় গত ছয় মাসে আওয়ামী লীগের কাছে বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিসবাহুর রহমান চৌধুরী ও গণতান্ত্রিক ইসলামী মুভমেন্টের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম খান একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাদের উদ্যোগে সাড়া দেয় কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা জাফরুল্লাহ খানও ছিলেন বলে প্রচার হয়। যদিও জাফরুল্লাহ খান এ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, মিসবাউর রহমান ও নুরুল ইসলামের সঙ্গে তার বৈঠক হলেও কোনও জোট হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘জোট হলে বৃহত্তর স্বার্থে জোট হবে, সেই জোটে আমরা যাব।’
জানা গেছে, এম এ আউয়ালের উদ্যোগে মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, সাবেক ছাত্র মজলিস সভাপতি মাওলানা রুহুল আমিন সাদী, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সাবেক কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাও আছেন। তরিকতের মহাসচিব তার উদ্যোগকে সফল করতে এরই মধ্যে মিসবাহুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। চলতি বছরের শুরুতে এই জোট হওয়ার কথা থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের সরাসরি সাড়া না পাওয়ায় এখনও জোটের প্রক্রিয়া চলছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি মিসবাহুর রহমানের সঙ্গে আটটি দলের বৈঠক হলেও আদতে তরিকত, খেলাফত আন্দোলন, ইমাম-ওলামা পরিষদসহ একটি বড় জোট করতে চান এম আউয়াল এমপি। এরই মধ্যে তারা কয়েকটি সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন বলেও সরকারের একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়।
জোট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা জানান, আওয়ামী লীগ ইসলামি ভাবধারার বিরুদ্ধে— এমন অভিযোগ প্রচলিত থাকলেও এই দলগুলো আগামী নির্বাচনে এর বিপরীত চিত্র দেখাতে চায়। ইসলামি দলগুলোও আওয়ামী লীগের পক্ষে— সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন বার্তা পৌঁছে দিতে চান এসব দলের নেতারা।
উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিসবাহুর রহমান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগকে নিয়ে একটি ভুল ধারণা ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি ও অনুভব করেছি, ইসলামের জন্য ও আলেম ওলামাদের কর্মসংস্থানের আওয়ামী লীগ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, গত ৫০ বছরে এমন পদক্ষেপ কেউ নেয়নি।’
পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে এম এ আউয়াল ও মিসবাহুর রহমান সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এ বিষয়ে এম এ আউয়াল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে একটি ইসলামি জোট করা সময়ের দাবি। ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত কিছু বলার সময় আসেনি।’
সূত্র জানায়, ইসলামি জোট করার নেপথ্যে আগামী নির্বাচনে প্রার্থিতা নিশ্চিত করা, অনিবন্ধিত দলগুলোর নিবন্ধন করানো এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো কাজ করছে। পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে মাদ্রাসা কোর্স চালু এবং সারাদেশে মসজিদ নির্মাণ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। ওই সব প্রকল্পে আলেমদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও সূত্রের দাবি।
মিসবাউর রহমানের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত মিলেছে। তবে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জোট করার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হয়নি। বলার মতো কোনও খবর নেই। গত সপ্তাহে পুরাতন বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এটি নিয়ে নিউজ হলেও ওই ধরনের কোনও জোট এখনও নিশ্চিত নয়।’
মিসবাহুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছি। যারা এসেছিলেন, তাদের অনেকেই আগে ২০ দলীয় জোটে ছিলেন।’
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির সদস্য মিসবাহুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘এরই মধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন দারুল আরকাম নামে প্রকল্প চালু করেছে। আশা করি, আগামীতে দেশের সবগুলো মসজিদে এই প্রকল্প চালু করতে পারব।’
মিসবাউর রহমান জানান, সরকারিভাবে দেশের প্রতিটি জেলায় দুইটি ও উপজেলায় একটি করে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। এতে অর্থ সহযোগিতা করছে সৌদি আরব। সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ চলছে, অনেকে জমি দানও করছেন।
এ বিষয়ে গণতান্ত্রিক ইসলামিক মুভমেন্টের নুরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আলোচনা চলছে, এখনও অব্যাহত আছে। কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি।’
জানতে চাইলে মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আগে জোট নিয়ে বিভিন্ন কথাই ছড়িয়ে পড়ে। চূড়ান্ত কিছু বলার সময় আসেনি।’
তবে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, জোট গঠনের বিষয়ে এখনও আওয়ামী লীগের কোনও সিগন্যাল পাননি উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে জোট একটি নাকি দু’টি হবে, নাকি শুধুমাত্র কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোকে নিয়েই জোট হবে— এসব বিষয় এখনও স্পষ্ট হয়নি। সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জোটের বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা জোট করার সম্মতি দেবে বলেও সূত্রের দাবি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এম এ আউয়াল বলেন, ‘জোট হবে রাজনৈতিক কারণে। রাজনৈতিক আবেদন থাকলে কার্যকর জোট হবে। এখানে অন্য কোনও স্বার্থ নেই।’
সূত্র জানায়, খেলাফত আন্দোলন, ইমাম-ওলামা পরিষদ, গণতান্ত্রিক ইসলামিক মুভেমন্ট, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলসহ অনেক দলেরই নিবন্ধন নেই। এছাড়া এই দলগুলোর দায়িত্বশীলদের নির্বাচনের চেয়ে দলের নিবন্ধন নিয়েই বেশি চিন্তা বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে জোটভুক্ত দলগুলোর নৌকাঘেঁষা রাজনীতির অন্যতম প্রধান কারণ কোনও না কোনোভাবেই নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া।
মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, ‘নিবন্ধন না থাকলে নিবন্ধন করাই তো নিয়ম। এখানে তো প্রত্যাশার কিছু্ নেই। নিয়ম মেনে রাজনীতি করলে নিবন্ধন কেন পাব না?’
নিবন্ধনের চিন্তা আরও পরে বলে জানান ইমাম-ওলামা পরিষদের আহ্বায়ক মাওলানা রুহুল আমীন সাদী। তিনি বলেন, ‘আগে দল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, এরপর নিবন্ধন।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •