ডেস্ক নিউজ:
সংবিধানের বিধান বাস্তবায়ন করার পক্ষে আন্দোলনই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিতে সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের কয়েকজন আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতাবিষয়ক ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে বিএনপি জনমত তৈরি করতে পারলে এর সুফল ঘরে তুলতে পারবে দলটি। এজন্য দলটিকে ইসির স্বাধীনতা বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে হবে। ইসির স্বাধীনতা ইস্যুতে জনমত গড়ে তোলাও অনেক সহজ হবে। সহায়ক সরকারের দাবিতে না গিয়ে বরং ইসির স্বাধীনতাবিষয়ক সংবিধানের অনুচ্ছেদটি হুবহু নিশ্চিত করার আন্দোলন করলে বিএনপির জন্য তা সুফল বয়ে আনতে পারে।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানসম্মতভাবেই নির্বাচন হলেও চাইলে সুযোগ নিতে পারে বিএনপি। আর তা হলো সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ। এটা নিশ্চিত করতে জনমত তৈরি করতে পারলে সমান অধিকার ভোগ করবে সব রাজনৈতিক দল।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক সামসুর রেহমানও মনে করেন, ‘সংবিধানের মধ্যে থেকেই বিএনপিসহ সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করা সম্ভব।’ বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী চাইলে সংবিধান সংশোধন না করেই নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব থাকার সুযোগ করে দিতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, সরকার নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা করবে। তফসিল ঘোষণার পর সরকার কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ না করে বদলি পদায়নসহ কোনও কাজ করতে পারবে না। বরং ওই সময় নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন যা চাইবে, তা দিতে বাধ্য থাকবে সরকার। যা ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে রয়েছে। এসব বিষয় কিতাবে লিপিবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করা উচিত বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর। সংবিধানে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে সহায়ক সরকার ছাড়া সাংবিধানিক সুবিধা আপনা-আপনিই ঘরে আসবে বিএনপির। তাতে চাপ সৃষ্টি হবে আওয়ামী লীগের ওপরই।’

আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে সহায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির চেয়ে বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি অবস্থান নিলে সরকার হয়তো সমঝোতায় আসতে পারে। কিন্তু বিএনপি জনসমর্থিত দল হলেও সংসদে প্রতিনিধি না থাকায় দলটির পক্ষে সরকারকে সহায়ক সরকারে বাধ্য করা কঠিন হবে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে গেলে সংবিধানের ভেতরে থেকে বিএনপির লাভবান হওয়ার মতো আরও একাধিক ধারা সংবিধানে রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে তারা সংবিধানের ১২৩ (৩) ও ১২৬ অনুচ্ছেদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ১২৩ (৩) এ বলা আছে—‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনও কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; আর এটাও সুযোগ এনে দিতে পারে বিএনপিকে।’ আইনজীবীরা বলছেন, পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেখানে সংসদের কোনও ভূমিকা থাকবে না। এক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনদের মনোবলে চিড় ধরবে। এক্ষেত্রে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকাংশে নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য হবে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রায় সমান অবস্থান থাকবে।

এদিকে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ এই অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভাগ ও দফতরগুলো কার্যত, ইসির অধীনে চলে যাবে। এক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইসির নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য ইসি সচিবালয়ের সদ্যবিদায়ী সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাহী বিভাগের কর্মচারীরা ইসির আদেশ মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন। তাদের দায়িত্ব হবে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিকে সহযোগিতা করা। দায়িত্ব পালনে কোনও কর্মচারীর অবহেলা পাওয়া গেলে ইসি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিতে পারবে।’

এদিকে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘১১৮ (৪) অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন বিএনপির সামনে বড় সুযোগ। একটি প্রভাবমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানে এই অনুচ্ছেদের বাস্তবায়নই যথেষ্ট। তবে সেটা বিএনপির আদায় করে নেওয়ার মতো রাজনৈতিক শক্তি থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অসাংবিধানিক কিছু না চেয়ে ইসিকে সংবিধান যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তা নিয়ে দর কষাকষি করলেই লাভবান হবে বিএনপি।’

ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ইসি সম্পূর্ণ প্রস্তুত, সে বিষয়ে রোডম্যাপে জানিয়েছে কমিশন। ফলে সেই প্রস্তুতি কী ও কতখানি কার্যকর, তা জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারে বিএনপি। তার ব্যতিক্রম ঘটলে আদালত তো রয়েছেনই।’

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানে কোনও বিষয়েই ব্যাপকভাবে বলা থাকে না। কিন্তু এখানে ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।’

এ অনুচ্ছেদকে পর্যালোচনায় দেখা যায়, নির্বাচনের সময় কমিশন নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলের সমভাবে অধিকার নিশ্চিত করতে, কোনও রাজনৈতিক দলই যেন কোনোভাবে প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি না পড়ে, তা নিশ্চিত করাসহ সরকারের প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা সমভাবে নিশ্চিত করা হবে ইসির দায়িত্ব। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে সুবিধা বিএনপিও পাবে।

এদিকে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বিষয়ে গত ১৬ জুলাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদর রোডম্যাপ প্রকাশকালে বলেন, ‘ইসির জন্য যেসব আইন-কানুন রয়েছে, সেগুলো আমাদের জন্য যথেষ্ট। তবে দেখার বিষয় হচ্ছে, আমরা এটার প্রয়োগ করতে পারছি কিনা। তার জন্য আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আবার সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদেরও দায়িত্ব রয়েছে সুযোগসুবিধা গ্রহণ করা। তারা এগিয়ে এলে আমাদের নির্বাচনি আইন-কানুন প্রয়োগ করতে সুবিধা হয়।’

অধ্যাপক তারেক সামসুর রেহমান বলেন, ‘এগুলো সংবিধানে থাকা ফাঁক-ফোকর। তবে এজন্য বিএনপিকে নমনীয় হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকেও কিছুটা ছাড় দিতে হবে। যেহেতু বিএনপি সংসদে নেই, সেহেতু ৩ থেকে ৪টি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেই উপ-নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। নিরপেক্ষতার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ওই সরকারের কেউ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।’ এতে ১০ সদস্যের ছোট মন্ত্রিসভা থাকবে এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো থেকেই তাদের নেওয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •