cbn  

সেলিম উদ্দিন, ঈদগাঁও:
দিবা- রাত্রি থেমে থেমে বৃষ্টি আর হালকা বাতাসের মধ্যে দিয়ে জোয়ারের পানিতে ফের প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজার সদরের পোকখালী ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ গোমাতলী। গত রবিবার-সোমবার প্রবল জোয়ারের পানিতে উত্তর-পূর্ব-পশ্চিম গোমাতলীর বিভিন্ন এলাকার ২শতাধিক বসত বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। অথৈই পানিতে তলিয়ে গেছে চিংড়ি ঘের, ফসলের ক্ষেত, বসতবাড়ি,শিক্ষা প্রতিষ্টানও চলাচল রাস্তা।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত ৩০মে ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাত থেকে উঠে দাঁড়ানোর আগেই আরেক মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া থেমে থেমে বর্ষণ তলিয়ে গেছে গ্রামের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে জোয়ারের পানি। এতে প্লাবিত হচ্ছে উপকূলের গোমাতলীর গ্রামের পর গ্রাম। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে এখানকার ২০ হজার মানুষ। জোয়ারের পানিতে গ্রামীণ জনপদের মানুষের দুর্ভোগ ব্যাপক আকার ধারন করেছে। ভাঙন দিয়েই জোয়ারের পানি ঢুকে পুরো গোমাতলীর ৮ গ্রাম পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। গ্রামীণ রাস্তা ঘাট ভেঙ্গে-চুরে ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়নের গোমাতলীতে ১শ মিটার ভাঙ্গনকৃত বেড়ীবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় জোয়ার ভাটার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে গোমাতলীর শত শত পরিবার। যার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় রয়েছে। গত বছর ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে এলাকার ৬ নং ¯ুইস গেইটের বেড়ীবাঁধটি ভেঙ্গে যায়। সংস্কার না হওয়ায় পূর্ণিমার জোয়ারে লবণ মাঠ, চিংড়ি ঘের, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চলাচল রাস্তা তলিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীরা যেতে পারে না স্কুল মাদ্রাসায়। ভেসে গিয়েছিল প্রায় দুই হাজার একর মাঠের লবণ। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রায় কয়েক কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্থ ¯ুইস গেইট দিয়ে জোয়ারের পানি নিয়মিত প্রবেশ করার কারণে এলাকার ডি ব্লক, এ ব্লক, সি ব্লক ঘোনায় চলছে জোয়ার ভাটা। লবণাক্ত পানি ঢুকে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, বীজতলা, চিংড়িঘের, লবণ মাঠ ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, ইউনিয়নের গোমাতলী এলাকার ৬নং স্লুইস গেইট এলাকা ভাঙ্গনের কারনে ওই পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে। এতে করে এলাকার বিপুল সংখ্যক চিংড়ি চাষী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলে জানান ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন।

রাজঘাট এলাকার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দীন জানান, রোয়ানুর তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বেঁড়িবাধটি দীর্ঘদিন মেরামত না করায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে জোয়ার ভাটায় চলছে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম।

গোমাতলী সমবায় কৃষি ও মোহাজের উপনিবেশ সমিতির ম্যানেজিং কমিটির সদস্য নুরুল আজিম জানান, জোয়ারের পানির কারনে ওই এলাকার উত্তর গোমাতলী, আজিমপাড়া, কাটাখালী ও রাজঘাট এলাকার কয়েক হাজার মানুষের দুর্ভোগ যেন পিছু ছাড়ছেনা।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, জোয়ারের পানিতে গোমাতলীর প্রায় সর্বত্র গ্রামীণ যাতায়াত ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ভেঙ্গে গেছে বাড়ি ঘর, গাছপালা। পানি বন্দী রয়েছে ৮ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ। জোয়ারের পানির তোড়ে এসব গ্রামীণ সড়কসহ আরো অনেক সড়কের এইচবিবি বা বিছানো ইটের অনেকাংশ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে উঠে গিয়ে পাশ্ববর্তী খাদে পড়ে রয়েছে। গোমাতলীর ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো দাবি, আমরা কারো করুণা চাই না, ত্রাণ চাই না। আমরা চাই স্থায়ী বেড়িবাঁধ। পোকখালী স্লুইচগেইট থেকে ৬নং স্লুইচ পর্যন্ত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের অবশিষ্ট জমি,স্কুল-মাদ্রাসা,মসজিদ-কবরস্থান,বাড়ি-ঘর রক্ষা করা হোক।

রোয়ানু-মোরায় বেড়িবাঁধ ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে কথা হয় মাষ্টার আয়ুব আলীর সাথে তিনি বলেন, ৬ নং স্লুইচের বেড়িবাঁধ ভাঙনে এখানকার হাজার পরিবার গৃহহারা হয়। সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন অমুক করে দেব, তমুক করে দেব বলে চলে যায়। কাজের কাজ কিছুই হয়না। আমরা ত্রাণ চাই না, চাই গোমাতলীতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ, স্থায়ী সমাধান। তিনি আরো জানান, জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধটি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। মহেষখালী নদী তীরের এই বেড়িবাঁধটি বর্তমানে ভাঙতে ভাঙতে একেবারে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এই বাঁধটি টেকসই বাঁধে রূপান্তর করা না হলে গোমাতলী রাজঘাট সড়কটি ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাবে।

ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার মাহমুদুল হক দুখু মিয়া বলেন, গোমাতলী বেড়িবাঁধ কাম সড়কের ওপর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু জোয়ারের পানিতে একটু একটু ভাঙতে ভাঙতে বর্তমানে একেবারে ভয়াবহতায় রূপ নিয়েছে ভাঙন। তাই বেড়িবাঁধটি টেকসইভাবে নির্মাণ করা না গেলে সামনে আমাদের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

পোকখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ জানান, বেড়িবাঁধের ৬ নং স্লুইচ গেইট পয়েন্টের বিশাল অংশ ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। এতে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে ওই এলাকার বহু বসতবাড়ি ও স্থাপনা। যে কোন মুহূর্তে এই বাঁধের অবশিষ্টাংশ তলিয়ে গেলে বৃহত্তর গোমাতলী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান জিএম রহিম উল্লাহ বলেন, কউক চেয়ারম্যান (অব:) কর্নেল ফোরকান আহমদ এবং আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই বেড়িবাঁধটি নিয়ে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছি। তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি, এই বাঁধটি রক্ষা করা না গেলে বৃহত্তর গোমাতলীবাসী বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা বেড়িবাঁধটি টেকসইভাবে নির্মাণে কাজে হাত দিয়েছেন।

এক তথ্যনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, ইউনিয়নের ১০ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ র্দীঘ ১৪ মাস ধরে পানিবন্দি। ইউনিয়নের র্পূব-পশ্চিম-উত্তর গোমাতলীর প্রায় ৫টি গ্রামে সুপেয় পানি ও ওষুধের জন্য হাহাকার চলছে। পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় বিপুলসংখ্যক গৃহহীন মানুষ বিভিন্ন উঁচু জায়গায় খোলা আকাশের নিচে গবাদি পশুর সঙ্গে রাত যাপন করছেন। সব মিলিয়ে গোমাতলীর বানভাসি মানুষ ভালো নেই। তারা জানেন না কবে নাগাদ পাউবো বেড়িবাঁধ সংস্কার করে আগের জীবনে ফিরবে। তাদের কাছে প্রতিটি দিন যেমন, তেমনই রাতও পাথরের মতো ভারি মনে হচ্ছে। একটি রাত যেন কয়েক দিনের মতো লম্বা সময় নিয়ে পার হচ্ছে। যার কারনে গোমাতলীর বানভাসি মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে অজানা আতঙ্ক। প্রতিদিনের জোয়ার ভাটায় ইউনিয়নের ২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। উত্তর গোমাতলী মোহাজের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম র্দীঘদিন ধরে বন্দ রয়েছে। ঐ এলাকার আজিম পাড়া গ্রামের গৃহিণী মরিয়ম খাতুন জানান, বাড়িতে পানি ওঠায় চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন তারা।

রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বানভাসীদের দুর্ভোগ দেখা যায়। অন্তত ২ হাজার পরিবার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। ঘরে ঘরে বিরাজ করছে শুকনা ও শিশু খাবারের সংকট। এসব দুর্গত মানুষের পাশে এখন পর্যন্ত দাঁড়ায়নি কোনো এনজিও। ফলে বন্যা দুর্গত মানুষরা এখন চরম সংকটে। ইউনিয়নের গোমাতলীতে এবারে সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ। জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। অনেকগুলো ভাঙ্গা দিয়ে লোকালয়ে জোয়ার ভাটার পানি উঠা নামা চলছে। এতে এ বর্ষা মৌসুমে কোটি টাকার চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। তবে ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে এখানে কাজ শুরুর কথা ছিল গত জুন মাস থেকে। কিছু জিও-ব্যাগ খালি টেংকার ছাড়া বেড়িবাঁধে মাটি ভরাটের দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি গত পৌন ২ মাসেও। বর্ষা মৌসুম ও বালি সংকটের অজুহাতে কাজ বন্ধ রেখেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। দরপত্রের শর্তানুযায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিষয়ে সন্দিহান এলাকাবাসী। বাপ-দাদার বসতভিটা, লবণ মাঠ-চিংড়ি ঘের ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার চিন্তায় ঘুম হারাম অনেকের।

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আতাউল গনি ওসমানী জানালেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গোমাতলী এলাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছেন তারা এলাকায় খুব একটা আসেন না। যে পরিমাণ কাজ করার কথা ছিল, তা করা হয়নি।

ভাঙা বেড়িবাঁধের সি ব্লক ৬ নং স্লুইচ দিয়ে আসা জোয়ারের পানিতে দুর্ভোগে পোহাতে হচ্ছে জানিয়ে গোমাতলী মোহাজের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এইচএম শফি উল্লাহ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বেড়িবাঁধ না হলে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা হবে না। বর্তমানে জোয়ার ভাটার কারনে স্কুলের শ্রেণী কার্যক্রম বন্দ রয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সাবিবুর রহমান বলেন, জরুরী বরাদ্দ দিয়ে বেড়িবাঁধের সব ভাঙনগুলো পুনঃনির্মাণ করার জন্য ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এতে অনিয়ম হলে ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •