এম.আর. মাহমুদ
চকরিয়া উপজেলার উপকূল জুড়ে মৎস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত একসময়ের চকরিয়া সুন্দরবনের ৪৫৫৩০.৭০৮ একর চিংড়ি উৎপাদনের জমি থেকে প্রতিবছর ৩৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের চিংড়িসহ হরেক প্রজাতির মৎস্য উৎপাদন হলেও সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও ডাকাতের অত্যাচারে বিশাল চিংড়ি ভান্ডার অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বলে দাবী করেছেন চিংড়ি চাষিরা। এছাড়া মৎস্য উৎপাদন মৌসুম জুড়ে রয়েছে দখল-বেদখলের ঘটনা। সব মিলিয়ে পুরো মৎস্য ঘের এলাকা যেন “ডাকাতের গ্রাম”। যে কারণে মৎস্য চাষে জড়িত বেশিরভাগ চাষি পুঁজি বিনিয়োগ করে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত চিংড়ির লভ্যাংশ গোলায় তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কক্সবাজার বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন চকরিয়ার সুন্দরবন রেঞ্জের এ পরিমাণ জমিতে এক সময়ে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট (প্যারাবন) থাকলেও ১৯৭৮ সাল থেকে চিংড়ি চাষ শুরু হলে পর্যায়ক্রমে এসব প্যারাবন নিধন হতে হতে বর্তমানে প্যারাবনে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে বনবিভাগের কাগজে-কলমে সুন্দরবন রেঞ্জ (সিএস রেঞ্জ) হিসেবে থাকলেও কার্যত বনভূমি বলতে কিছুই নেই, আছে শুধু চিংড়িঘের। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় মাত্র ৩৯ জন ভাগ্যবান ধণাঢ্য ব্যক্তির নামে বিশাল চিংড়ি ভূমি লীজ দিয়ে চিংড়ি চাষের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরে সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি এরশাদের জামানায় সামরিক অধ্যাদেশ মূলে ৩৯ জন ধণাঢ্য ব্যক্তির নামে দেয়া লীজ বাতিল করে ১০, ১১ ও ৩০ একর বিশিষ্ট ঘের করে সর্বসাধারণকে চিংড়ি চাষের জন্য লীজ দেয়। এভাবে চিংড়ি চাষের ধারা অব্যাহত থাকলেও বর্তমানে আগের সেই চিত্র নেই বলা চলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চিংড়ি চাষি এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, চিংড়ি ঘেরে মাসে দু’বার মাছ ধরা হয়। যাকে চাষিরা স্থানীয় ভাষায় (জোঁ) হিসেবে বলে থাকেন। প্রতি জোঁ’তে ১০ একর ঘেরের জন্য এক হাজার টাকা ২০ একরের জন্য দুই হাজার টাকা ৩০ একরের জন্য তিন হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। সন্ত্রাসীরা যাকে “জিজিয়কর” হিসেবে দাবী করেন। সন্ত্রাসীদের নির্ধারিত পরিমাণ চাঁদা যথাসময়ে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে জোঁ’তে পাওয়া মাছগুলো লুট হয়ে যায় চোখের সামনে। প্রতিবাদ করলেই বিপদ।

চকরিয়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইফুর রহমান এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, এ উপজেলার উপকূলের খুটাখালীতে ২৫০টি চিংড়িঘের রয়েছে। যার জমির পরিমাণ ১১‘শ পয়েন্ট ৭৮, ডুলাহাজারা ৯৫টি জমির পরিমাণ ১০২.৫, সাহারবিল ৫০৪টি জমির পরিমাণ ৩৮৮০, চিরিংগা ১১০৫টি জমির পরিমাণ ৯৫৫৯, কোনাখালী ৭০টি জমির পরিমাণ ১০৬.৪, বদরখালী ২০২টি জমির পরিমাণ ৪৮১.৯, পশ্চিম বড় ভেওলা ২০০টি জমির পরিমাণ ২৩০টি ও ঢেমুশিয়া ৪৫টি জমির পরিমাণ ৬৮.৮৪ ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন ঘেরের সংখ্যা ৫৮৭টি জমির পরিমাণ ২৮৩৪ হেক্টর এর মধ্যে মৎস্য বিভাগের একটি প্রদর্শনী খামারসহ। চকরিয়ায় মোট চিংড়ি জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ৪‘শ ৮৯ হেক্টর। আর একরে জমির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৫‘শ ৩০ একর। এ বিপুল পরিমাণ জমিতে চিংড়ি উৎপাদন করে চাষিরা প্রতিবছর ৬৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার চিংড়িসহ অন্যান্য প্রজাতির মৎস্য উৎপাদন করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। এছাড়া চিংড়িঘের এলাকায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন ৭ হাজার একর চিংড়ি চাষের জমি এখনও জবর দখলদারদের দখলে রয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ পরিমাণ জমিতে প্রভাবশালী জবর দখলদারেরা চিংড়ি চাষ করলেও সরকার পাচ্ছে না কোন রাজস্ব। অপর একটি সূত্র মতে এসব জমি দখল বেদখল নিয়ে প্রতিনিয়ত সংঘাত সংঘর্ষ চলেই আসছে। মূলতঃ এ পরিমাণ জমি যে সময় যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের প্রভাবশালীরা ভোগ দখল করে থাকে। বিশিষ্ট চিংড়ি চাষি ও চকরিয়া উপজেলার বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান ছলিম উল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবী করেন, চিংড়ি ঘের এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় অপরাধীরা বিনা বাধায় লুটপাট, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি করে পার পাচ্ছে। চিংড়ি জোনে সওদাগর ঘোনা, পালাকাটা, ডুলাহাজারা ও কোরালখালীর ২ শতাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও দখল-বেদখলের ঘটনায় জড়িত। কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়ার সংসদ সদস্য হাজী মৌলভী মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, চকরিয়ার উপকূল থেকে চিংড়ি ও মৎস্য খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় নানা সমস্যা হচ্ছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও চাষিরা মৎস্য চাষ করে যাচ্ছে। চকরিয়ার চিংড়ি জোনে ডাকাত, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের উপদ্রব বেড়ে গেছে। সন্ত্রাসীদের নির্যাতন থেকে চিংড়ি চাষিদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। অপরদিকে অবৈধ জমি দখল-বেদখল ঠেকাতে অনেক প্রভাবশালী অস্ত্রধারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি জাফর আলম বলেন, স্থানীয় প্রকৃত চিংড়ি চাষীদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের চিংড়ি ঘের বরাদ্ধ দেয়ায় এসব সমস্যা হচ্ছে। যারা প্রকৃতপক্ষে চিংড়ি চাষি নয় তাদের ঘের গুলো বাতিল করে পুনরায় এলাকার চিংড়ি চাষিদের নামে বরাদ্ধ দেয়া হলে এ সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হবে। তিনি আরো বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক আধুনিক প্রযুক্তিতে চিংড়ি চাষ করার কথা বলে প্রায় ৩০০ একর চিংড়ি ঘেরের জমি লিজ নিলেও তারা সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করছে। বর্তমানে এ ঘেরের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করেনি। মামলা জনিত কারনে ঘেরটি তারা দখলে রেখেছে। এ ঘেরটি জরুরী ভিত্তিতে বাতিল করে চকরিয়ার প্রকৃত চিংড়ি চাষীদের নামে লিজ দেওয়া দরকার। চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অফিসার ইনচার্জ) বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবী করেন বিশাল চিংড়ি ঘের এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল নয় বলা চলে। পুলিশ যাওয়ার আগেই অপরাধিরা নৌ পথে পালিয়ে যায়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নৌযান বরাদ্ধ নেই। শত প্রতিকুলতার মধ্যেও পুলিশ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ঘের এলাকায় ত্রাস হিসেবে পরিচিত কোরালখালীর লুৎফুর রহমানসহ বেশ কজনকে আটক করা হয়েছে। অবশিষ্টদের আটকের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এম.আর মাহমুদ, প্রবীন সাংবাদিক, চকরিয়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •