কেরামত আলীর বৈশাখ বিপত্তি

আতিকুর রহমান মানিক
কয়েকদিন আগে থেকেই ঘ্যানঘ্যান করছিল কেরামত আলীর বউ। ঘটা করে  পয়লা বৈশাখ পালন করবে, বাসন্তী রং শাড়ী পরে ঘুরবে, পান্তা ইলিশ খাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কাঠখোট্টা টাইপের কেরামত তেমন একটা সাড়া না দেয়ায় এই ঘ্যানঘ্যানানিটা সকাল থেকে অবশেষে প্যানপ্যানানিতে রূপ নিয়েছে। আসলে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে চারদিকের পরিবেশ পরিস্হিতি দেখে কেমন যেন দো-টানায় ভূগে কেরামত।
বছর ঘুরে আজ আবারো ফিরে এসেছে পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব আজ। এ দিনটা বর্ষবরন, পারষ্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়েই উদযাপন করা হয়। কিন্তু হাল আমলের ঘটা করে বর্ষবরন ও পরবর্তী সারা বছরের কর্মকান্ড নিয়ে কেরামতের মনে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। সে চিন্তা করে, জাতি হিসাবে আমাদের রয়েছে নিজস্ব সোনালী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। আবহমান বাংলার হাজারো বছরের এ সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও পোষাক-পরিচ্ছদের সারা বছর ধার না ধারলেও পহেলা বৈশাখে নববর্ষ বরণের দিন আমরা হঠাৎ করেই যেন সবাই এক দিনের জন্য বাঙালী হয়ে যায়। এই একদিন যেন সবার  বাঙ্গালীয়ানা উপচে পড়ে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দেশাত্ববোধক গান গেয়ে ফতুয়া-পাঞ্জাবী পরে ১লা বৈশাখে একদিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে বাঙালী সাঁজার চেষ্টা করলেও এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা বিরাট প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার বটে। কারণ আবহমান বাংলার হাজারো বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ লোকজ ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি বাদ দিয়ে সারা বছর আমদানী করা বিজাতীয় সংস্কৃতি নিয়েই পড়ে থাকেন অনেকে। তাই দেখা যায়, কাপড় কিনতে গেলে ভিনদেশী জিন্স, ইতালিয়ান সু, কোরিয়ান শার্ট ও ফ্রান্সের পারফিউম-কসমেটিক্স সহ রাজ্যের হাবিজাবি বিদেশী জিনিস চড়া দামে কিনে বড়াই করে। অথচ বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত কাপড় ও গার্মেন্টস সামগ্রী সারাবিশ্বে পরম সমাদৃত। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানী করে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। কিন্তু মানসম্মত দেশীয় এসব পণ্যের পরিবর্তে “বিদেশী” জিনিসের চাহিদাই বেশী। ফাস্টফুড শপ এ খেতে গেলে দেশী খাবার বাদ দিয়ে অন্তন, নুডুলস, পিজা, বার্গার ও হটডগ সহ বিদঘুটে নাম এবং স্বাদের বিদেশী খাবার অর্ডার করার হুজুগ দেখা যায়। আব্বা-আম্মা-চাচা-চাচীর বদলে ডেডি-মাম্মি-আংকেল-আন্টি স্থান দখল করে নিয়েছে এখন। টিভি দেখার সময় ভারতীয় চ্যানেল দেখা নিয়ে টিপতে টিপতে রিমোটের বারটা বাজে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, ভারতীয় বিভিন্ন সিরিয়াল দেখার জন্য দাম্পত্য কলহের জের ধরে অনেক সংসার ভেঙ্গে গেছে। হাল আমলের ছেলে মেয়েদের পোশাক পরিচ্ছদ দেখলে রুচির দৈন্যতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। যে কাপড়ে যত বেশি তালি-জোড়া দেয়া থাকে তা ততই চড়া দামে বিক্রি হয়, এটা নাকি ফ্যাশন। চুল কাটার সময় ভিনদেশী বিভিন্ন নায়ক-নায়িকাকে অনুসরণ করে বিদঘুটে ঐ সব স্টাইলে চুল কাটার ফলে অনেককে বানর, হনুমান, ভল্লুক ও কাঠবিড়ালীর মনুষ্য সংস্করণ মনে হয়। বিয়ের আনন্দ অনুষ্ঠানের সময় বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গান-হঁলার পরিবর্তে আলমিরা সাইজের সাউন্ড বক্সে ইংরেজী ও হিন্দিগান বাজে। আর এসব লারে-লাপ্পা গানের তালে তালে মুরুব্বীদের সামনেই ধেই-ধেই করে বেশরম নাচ নাচে তরুণ তরুণীরা। আজকাল এসব নাকি ফ্যাশন। এভাবেই চলছে আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা, যেখানে প্রতিক্ষনেই ভিনদেশী (অপ)সংস্কৃতির নগ্ন আগ্রাসন। চাপাশে সারা বছর এসবইতো দেখে আসছে কেরামত। এমতাবস্থায় কেবলমাত্র পহেলা বৈশাখে ঢাক-ঢোল, সানাই বাজিয়ে একদিনের জন্য বাঙ্গালী সেঁজে পান্তা ইলিশ খাওয়ার পর ডায়রিয়া বাধানোর পরদিন থেকেই আবারো ভিনদেশী স্টাইল-সংস্কৃতি অনুসরণ করা কতটুকু গ্রহণযোগ্য? পহেলা বৈশাখের সকালে বসে বসে এসবই ভাবছিল কেরামত আলী। কিন্তু কোন সমাধান মাথায় এলনা। অবশেষে বউয়ের তাড়ায় বাজার করার জন্য বাসা থেকে বের হল সে। রাস্তায় বেরিয়ে কিছুদুর যাওয়ার পর হঠাৎ দেখল,   বাঘ-ভাল্লুক, শুকর-কুকুর ও সিংহ-হায়েনাসহ আরো বিভিন্ন জন্তু জানোয়ারেরর বিরাট একটা পাল এগিয়ে আসছে। মাংশাসী এসব পশুকে রাস্তায় দেখে ভয় পেয়ে গেল সে। উচ্চস্বরে মুসিবতের দোয়া পড়ে পিছন দিকে ভো-দৌঁড় দিয়ে পাশের গলিতে ঢুকে গেল কেরামত আলী। নিরাপদ দুরত্বে গিয়ে পেছন ফিরল সে। ভাল করে খেয়াল করার পর অবাক হয়ে দেখল, এরা আসলে সবাই মানুষ। বাঘ-ভাল্লুকের মুখোশ লাগিয়ে মিছিলে বের হয়েছে, আবার এটা নাকি “মঙ্গল শুভযাত্রা”! মঙ্গল যাত্রায় জন্তু-জানেয়ারের কিম্ভুতকিমাকার মুখোশগুলো না লাগালে কি এমন ক্ষতি হত?
পয়লা বৈশাখে পান্তা ইলিশ নাকি খেতেই হবে। এ রেওয়াজটা চালু হওয়ার নেপথ্য কাহিনী না জানলেও বিভিন্ন হোটেলে দেখা গেল বেশ ভীড়। বিভিন্ন দমের পান্তা-ইলিশের প্যাকেজ ছেড়েছে হোটেলওয়ালারা। সাথে নাকি কাঁচা মরিচ ও আলুভর্তা ফ্রি ! অল্পটুক পান্তাভাতের সাথে ছোট্ট একটুকরা ইলিশ দিয়ে ৩/৪ শ টাকা নিয়ে নিচ্ছে এরা। আজ কেমন যেন ইলিশ খাওয়ার ইচ্ছা হলনা কেরামতের। তাই পান্তা ভাতের সাথে লইট্টা মাছ অর্থাৎ “পান্তা-লইট্টা” চাওয়ায় হোটেলওয়ালারা রীতিমত বেজার হল।
আজ অনেককেই দেখা গেল সাদা ধুতি ও ফতোয়া পরা অবস্হায়। অথচ এরা সারাবছরই শার্ট-প্যান্ট, কোট-টাইয়ে কেতাদুরস্ত থাকেন। কিন্তু আজ নাকি শতভাগ বাঙ্গালী সাজতে হবে। না হলে বাঙ্গালীয়ানা জাহির হবেনা।
সারাবছর ভিনদেশী সংস্কৃতি অনুসরন করে পয়লা বৈশাখে একদিনের বাঙ্গালীয়ানার যৌক্তিকতা বুঝতে পারেনা মাথামোটা কেরামত আলী।
হাজারো বছরের সোনালীঐতিহ্যে লালিত আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতিগুলো আজ বিলুপ্ত প্রায়। এসব বাদ দিয়ে আজ কোন পথে ছুটছে আমাদের যুবক-যুবতীরা ? এর পরিবর্তে প্রতি পয়লা বৈশাখে, বাংলা নববর্ষের দিনে শিকড়সন্ধানের পথে, উৎসমুখেই কি আমরা হাঁটতে পারিনা?
কেরামত আলীর মত অনেকেই স্বপ্ন দেখে।
“কষ্ট যাক আসুক হর্ষ, শুভ হোক নববর্ষ”। নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

আতিকুর রহমান মানিক
ফিশারীজ কনসালটেন্ট ও
সংবাদকর্মী।
ই-মেইল : [email protected]
মুঠোফোন-০১৮১৮-০০০২২০

cbn কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন) এ প্রকাশিত কোন সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।-কক্সবাজার নিউজ ডটকম  

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারে দুদকের গণশুনানীতে অভিযোগের পাহাড়

আবুল মনসুর টেকনাফের নতুন এসি ল্যান্ড

ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী খলিল গ্রেপ্তার

ডিসি কামাল ১২ দিনের সফরে আমেরিকায় : ভারপ্রাপ্ত ডিসি আশরাফুল আফসার

তুমব্রু খালে এবার স্লুইচ গেইট নির্মাণ করছে মিয়ানমারঃ বিজিবি ও বিজিপির পতাকা বৈঠক সম্পন্ন

সদর হাসপাতালে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেয়া হবে : এমপি কমল

কক্সবাজারের সন্তান কায়িদ ঢাকায় শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত

জলকেলি উৎসবে মুখরিত রাখাইন পল্লীগুলো

উচ্চ শিক্ষা অর্জনে বিদেশ গমনে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহযোগীতা দেয়া হবে- এমপি কমল

হোপ ফাউন্ডেশনে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহ ২০১৯’ উৎযাপন

খরুলিয়ার সেই মা-মেয়েকে মামলা দিয়ে কারাগের প্রেরণ

এড. কবির ছিলেন একজন সফল মানুষ : জেলা জজ হাসান মোঃ ফিরোজ

কক্সবাজার সরকারি কলেজে ইতিহাস বিভাগের ৪র্থ বর্ষে পদার্পণ উৎসব

চতূর্থবারের মতো চট্টগ্রাম রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ টেকনাফের ওসি প্রদীপ

চকরিয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে মাদকসেবীকে ৩ মাসের সাজা

বদরমোকাম সমাজের পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠিত

সাংবাদিক হানিফসহ তিনজনকে শ্রেষ্ঠ সন্তান ও ছয় জনকে শ্রেষ্ঠ প্রবীণ সম্মাননা

নবম শ্রেণির প্রশ্নে সানি লিওন-মিয়া খলিফা!

আবুধাবি দূতাবাসে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ উদযাপন

এক পা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে টিউশনি করে পড়াশোনা ও সংসারের ঘানি টানছেন যিনি