নীতিশ বড়ুয়া, রামু (কক্সবাজার) :

খাগড়াছড়ির গুগড়াছড়ি ধর্মসুখ বিহারের অধ্যক্ষ বৌদ্ধ ভিক্ষু বিশুদ্ধ মহাথেরকে হত্যার প্রতিবাদে ও ন্যায় বিচারের দাবীতে কক্সবাজারের রামুতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৪টায় উপজেলার চৌমুহনীতে এ মানববন্ধন কর্মসূচীর আয়োজন করে, কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদ। কক্সবাজার-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল, কক্সবাজারের বিভিন্ন বিহারের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সহ সামাজিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা এ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেয়।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু’র সভাপতিত্বে এ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার বিকাল ৩ টায় রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার প্রাঙ্গন থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষু বিশুদ্ধ মহাথেরকে হত্যার প্রতিবাদে একটি মৌন মিছিল বের করে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। মিছিলটি রামুর চৌমুহনীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

বিশুদ্ধ মহাথের হত্যাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবী সহ সকল প্রকার হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধনে বক্তৃতা করেন, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল, রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শীলপ্রিয় মহাথের, সুশাসনের জন্য নাগরিক ‘সুজন’ রামু উপজেলার সভাপতি মাষ্টার মোহাম্মদ আলম, রামু উপজেলা বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক পরীক্ষিত বড়–য়া টুটুন, কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শুভংকর বড়–য়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পটল বড়–য়া, সাংগঠনিক সম্পাদক বিপক বড়–য়া বিটু, তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুমন বড়–য়া, অর্থ সম্পাদক রাজু বড়–য়া, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সুনিত্য বড়–য়া, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট আশীষ বড়–য়া, রামু উপজেলা শাখার সভাপতি রিটন বড়–য়া, ছাত্র ইউনিয়ন কক্সবাজার জেলা সংসদের সভাপতি জয় বড়–য়া, রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য রিটন বড়–য়া প্রমুখ।

মানববন্ধনে বৌদ্ধ ভিক্ষুর হত্যার তদন্ত মুলক সুষ্ঠু বিচারের দাবী জানান কক্সবাজার-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল। তিনি বলেন, খাগড়াছড়িতে একজন মহাথেরোকে হত্যা করা হয়েছে। তার কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকতে পারেনা। তিনি পরিবার-পরিজনের মায়া ত্যাগ করে, সবকিছুর উর্ধে উঠে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন। তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। তিনি রাজনৈতিক শত্রুতার শিকার হতে পারেন না। তাহলে এই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে কারা হত্যা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য কি? হত্যাকারীরা নিশ্চয় নিজেদের সুবিধা অর্জনের জন্য এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এমপি কমল বলেন, দুষ্ট লোকেরা যে কোন মুহুর্তে, যে কোন কাজ করতে পারে। এরা জাতির শত্রু, এরা আমাদের শত্রু। সে যেই ধর্মের হোক না কেন, সে ধর্মেরও শত্রু। এই রকম ঘটনা যেন পূনরাবৃত্তি না হয়, সেই দিকে আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে।

মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বৌদ্ধ নেতারা বলেন, গত ৩০ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গুগড়াছড়ি ধর্মসুখ বিহারের অধ্যক্ষ বিশুদ্ধ মহাথেরকে নিজ বিহারে দিবাগত রাতে কে বা কারা হত্যা করে। এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে আমরা রামুতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছি। দেশের নানান স্থানে এ কর্মসূচী পালিত হচ্ছে। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, মাঝে মাঝে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর এমন নৃশংস ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। বারে বারে এমন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটতে থাকায় আমরা চরম ক্ষুব্দ এবং উদ্বিগ্ন। অতীতের ঘটনা গুলোর আজও কোন কুলকিনারা হয়নি। যে বা যারাই এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকুক না কেন আমরা এসব নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবী জানাই। বৌদ্ধ নেতারা বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এমন ঘটনা ধর্মীয় সম্প্রীতিকে বারে বারে আঘাত করছে এবং সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিচ্ছে। এসব ঘটনার নেপথ্যে যে বা যারা রয়েছে তাদেরকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনা না হলে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না গেলে, এমন ঘটনা বারংবার ঘটতে থাকবে।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, ২০০২ সালের ২১ এপ্রিল রাউজানের হিঙ্গলায় ভদন্ত জ্ঞানজ্যোতি মহাস্থবিরকে তার নিজের প্রতিষ্ঠানে জবাই করে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের ১৪ মে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের উপর চাকপাড়া গ্রামের বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ধাম্মাওয়াসা ভিক্ষুকে তার নিজ বিহারে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট কুমিল্লা সদর উপজেলার বানাশুয়া রেল ব্রিজের নিচ থেকে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যার মতো একটা জঘন্য অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়া মানে এরকম আরো দশটা ঘটনা ঘটার পথ সুগম করে দেয়া। তাই এমন নৃশংস, বর্বোরোচিত, সভ্যতা বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সবার সোচ্চার হওয়া উচিত। তাই আমরাও আজকে প্রতিবাদ জানাতে এবং অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবী নিয়ে রাজপথে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছি।