স্বীকৃতি বড়ুয়া, নিউইয়র্কঃ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চারটি মূলনীতি গন্ততন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের মধ্য দিয়ে একটি সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতির নির্মূল না করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজিত “বঙ্গবন্ধু সম্মেলনে” বক্তারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গত ২০শে নভেম্বর শনিবার অনলাইনে “বঙ্গবন্ধু সম্মেলন”-এ সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবীর সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্বীকৃতি বড়ুয়ার সঞ্চালনায় স্মারক বক্তব্য রাখেন প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ এবং প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ডঃ আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিশেষ অতিথি হিসেবে সংযুক্ত ছিলেন এন আর বি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও রাশিয়া বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তমাল পারভেজ, কানাডা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি আমিন মিয়া, যুক্তরাজ্য বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেন, যুক্তরাজ্য বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ সভাপতি সাংবাদিক মোহাম্মদ মকিস মনসুর, যুক্তরাজ্য বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম আলিমুজ্জামান এবং অস্ট্রেলিয়া বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপদেষ্টা মোঃ মুনীর হোসেন। সম্মেলনের শুরুতেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ, ২ লক্ষ নারী, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ও ৩রা নভেম্বর নিহত সকল শহীদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের টাইটেল স্পন্সরে নির্মিত ‘ফিরে এসো বঙ্গবন্ধু’ সংগীত চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডঃ নুরুন নবী বলেন যদিও আমরা করোনা মহামারীর কারণে গতবছর বঙ্গবন্ধু সম্মেলন করতে পারিনি, এর পূর্বে প্রতিবছর আমরা এই সম্মেলনের আয়োজন করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন দেশে ও প্রবাসে শুধু বাঙ্গালিদের কাছে নয়, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া। তিনি বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্ত সকল নেতৃবৃন্দের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অধুনালুপ্ত বাংলা পত্রিকা সাপ্তাহিক প্রবাসীর সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ তার স্মারক বক্তৃতায় বলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটি সোনার বাংলার, যেখানে একটি ন্যায় সমাজ প্রতিষ্ঠিত থাকবে, একটি অসম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠিত থাকবে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থা থাকবে। সেই বাংলাদেশ যদি আমরা দেখতে পাই, তাহলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের যথাযত সম্মান প্রদর্শিত হবে। কিন্তু আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে, এমন এমন কাণ্ড করে বসি যা তার আজীবন লালিত আদর্শ ও স্বপ্নের বিপরীত, তাতে বঙ্গন্ধুর মত একজন দেশ প্রেমিক ঐতিহাসিক মহাপুরুষের মর্যাদা হানি হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উপড়ে, বঙ্গবন্ধুর যেরকম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেগুলো স্টাডি করে, গবেষণা করে যতাযত মূল্যায়ন আমাদের করতে হবে। যেমনটি বর্তমানেকরছেন, এন আর বি কমার্শিয়াল ব্যাংক, তারা দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধু কর্নার খুলে সেখানে বই পুস্তকের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে জানার সুযোগ করে দিচ্ছেন। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক আক্রমণগুলো হয়েছে, তাতেই বুঝা যায় আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন থেকে বহুদূরে। সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশ থেকে উৎখাত করতে হবে, কোন সভ্য দেশে সাম্প্রদায়িকতা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ডঃ আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন বঙ্গবন্ধু যে কত বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তা আমরা বুঝতে পারি তার কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে। বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন, আমি তোদেরকে হয়ত কিছু দিতে পারিনি, কিন্তু একটি সবুজ পাসপোর্ট আর একটি পতাকা দিয়ে গেলাম – এই দুটো দিয়েই তোরা মাথা উঁচু করে চলতে পারবি। কথাটি কত গুরুত্বপূর্ণ আমরা এখন তা উপলব্ধি করতে পারি। ১৯৭১ সালে বা তার আগে কয়জন বাঙ্গালি বিদেশে যেতে পেরেছিল ? পাসপোর্ট পর্যন্ত পাওয়া যেতো না। আর এখন আমরা প্রায় এক কোটিরও অধিক বাঙ্গালী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছি। এটি সম্ভব হয়েছে একমাত্র বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের ফলে। বঙ্গবন্ধু প্রচণ্ড সাহসী ও আত্ম বিশ্বাসী ছিলেন। তার ৭ই মার্চের ভাষণ আজ শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, বিশ্ব সম্পদ। কিন্তু এখন এও আমাদের শুনতে হয়, মালয়েশিয়ায় বিশেষ করে কানাডার বেগম পারা নামক স্থানে, কিছু কিছু বাঙ্গালী দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের সম্পদ পাচার করে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে। একদিকে তারা দুর্নীতি করে আবার অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর কথা বলে। বঙ্গবন্ধু আতশুদ্ধ সোনার মানুষ চেয়েছিলেন, সেই আত্তশুদ্ধ মানুষ নেই বলেই দুর্নীতি হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে জানতে হলে, বুঝতে হলে, উপলব্ধি করতে হলে – ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ এই তিনটি বই আমাদের পড়তে হবে এবং আমাদের ছেলে মেয়েদের হাতে তুলে দিতে হবে।

সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাংলাদেশের ফেরৎ পাঠানোর লক্ষ্যে যৌথ উদ্দ্যেগ গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্বরচিত কবিতা ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু ছিলেন’ পাঠ করেন বঙ্গবন্ধু পরিষদ বৃহত্তর ওয়াশিংটনের সভাপতি দস্তগীর জাহাঙ্গীর। অন্যান্যদের মাঝে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ডঃ সিদ্দিকুর রহমান, ফোবানা চেয়ারম্যান ও ইউএসএ কমিটি ফর সেকুলার এন্ড ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপদেষ্টা এম এ সালাম, বঙ্গবন্ধু পরিষদ ক্যালিফোর্নিয়ার উপদেষ্টা মোমিনুল হক বাচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক রানা মাহমুদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ বৃহত্তর ওয়াশিংটনের উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের প্রাক্তন সিনিয়র প্রসিকিউটর অমর ইসলাম, নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শেখ আতিকুল ইসলাম, অধ্যাপক শাহদাত হাসান, যুক্তরাজ্য থেকে মোস্তফা কামাল বাবলূ প্রমুখ। সম্মেলনে আরও সংযুক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিষদ মিশিগানের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আহাদ আহমদ, শাখাওয়াত আলী, অধ্যাপক ডঃ রাজীব, জামাল আহমদ খান প্রমুখ। যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রাফায়েত চৌধুরী সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।