প্রেমের টানে সাত সাগর আর তেরো নদী পাড়ি দেওয়ার কাহিনি সবারই জানা। এই গল্পগুলো মাঝেমধ্যেই বাস্তব হতে দেখা যায় আমাদের চারপাশে। তেমনি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের দবরদস্তা গ্রামের জীন ক্যাটামিন প্রেট্রিয়াকা-জুলহাস উদ্দিন দম্পতির কথা।

ভালোবাসার টানে ২০১০ সালের শেষের দিকে জুলহাস বাংলাদেশ থেকে ছুটে যান ফিলিপাইনে। সেখানে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন জীন ক্যাটামিন প্রেট্রিয়াকা ও জুলহাস। এরপর স্বামীর ভালোবাসায় ধর্ম, মা, বাবা, দেশ ছেড়ে চলে আসেন আসেন বাংলাদেশে। সংসার পাতেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের অজপাড়া গাঁয়ে।

পরে ধর্মান্তরিত হয়ে জিন ক্যাটামিন প্রেট্রিয়াকা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। জিন ক্যাটামিন প্রেট্রিয়াকা থেকে তাঁর নাম হয় জেসমিন আক্তার। এক পর্যায়ে জেসমিন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে যান। এখানেই শেষ নয়, সবাইকে চমকে দিয়ে এখন তিনি জনপ্রতিনিধি।

১১ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের মা। জানা যায়, জীন ক্যাটামিন প্রেট্রিয়াকা। ছিলেন ফিলিপাইনের নাগরিক। পড়াশোনা করেছেন সেখানকার নামি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ বিভাগে। গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্নের পর সিঙ্গাপুরে চাকরি করতে গিয়ে পরিচয় হয় বাংলাদেশি তরুণ জুলহাস উদ্দিনের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম, এরপর বিয়ে।

জীন ক্যাটামিন প্রেট্রিয়াকা গত ১১ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী প্রার্থী হিসেবে মাইক প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

ওই নির্বাচনে বিশাল ভোটের ব্যবধানে তিনি সংরক্ষিত নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৭ ভোট। এমন ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে পুরো জেলাজুড়ে।

জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা বলেন, ২০০৮ সালে ফিলিপাইনের Mindanao State University থেকে ফিসারিজ বিভাগে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি। এরপর চাকরি নেই সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানিতে। সেখানেই চাকরী করতেন জুলহাস। সে সময় জুলহাসের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এর দুই বছর পর জুলহাসকে বিয়ে করে ধর্ম, মা, বাবা, দেশ ছেড়ে চলে আসি বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায়।

তিনি বলেন, আমি নির্বাচন করতে চাইনি। তবে এলাকাবাসীর ইচ্ছাতেই নির্বাচন করেছি। তারাই আমাকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। এখন তাদের সেবা করতে চাই। এলাকাবাসী জানায়, বাংলাদেশে এসে স্বামী, পরিবার ও আশপাশের মানুষকে আপন করে নিয়েছেন এই বিদেশিনী। ভোটারদের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি।

ভাঙা ভাঙা বাংলা ও বাংলা-ইংরেজি মিশেলে জিন তার নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। প্রচারের সময় তার ইংরেজি কথাগুলো বাংলায় বুঝিয়ে দিতেন স্বামী জুলহাস।

দবরদস্থার আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘বিদেশি নারী হলেও তার কথাবর্তায় আমাদের গ্রামের সবাই মুগ্ধ। গ্রামের মানুষের ভালোবাসায় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।’

এ বিষয়ে জুলহাস উদ্দিন বলেন, একজন বিদেশিনীর সঙ্গে সংসার টেকে কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু সবার ভালোবাসায় সেই আশঙ্কা দূর হয়েছে। জেসমিনও সবাইকে আপন করে নিয়েছেন। শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে বোঝা যেত, তাঁর মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি রয়েছে।

জুলহাস আরও জানান, জীন এলাকাবাসীর সেবা করে তাদের জয় মন করেছে। সে এলাকার সাধারণ মানুষের কথাতেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তারাই তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •