পানি চাইলে মুখের উপর মূত্র ঢেলে দেয়, সিনহা হত্যার সাক্ষ্যতে ফরিদুল মোস্তফা

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৭:৫৭ , আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১১:০১

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


ছবি : বাম থেকে এপিপি এড. জিয়া উদ্দিন আহমদ, সাক্ষী ফরিদুল মোস্তফা খান, পিপি এড. ফরিদুল আলম ও বাদীপক্ষের আইনজীবী এড. ফারহানা কবির চৌধুরী।

মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। টেকনাফ মডেল থানার টর্চার সেলে অমানবিক নির্যাতনে অনেকটা অচেতন অবস্থায় প্রচন্ড তৃষ্ণা পেলে পুলিশ সদস্যদের একটু পানি পান করাতে বলি। তখন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এর নির্দেশে টয়লেট থেকে মূত্র এনে আমার মুখের উপর ঢেলে দেওয়া হয়।

চাঞ্চল্যকর মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার চতূর্থ দফায় সাক্ষ্য গ্রহনের শেষ দিনে বুধবার ২৯ সেপ্টেম্বর মামলার ১৮ তম সাক্ষী সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এর আদালতে এ জবানবন্দী দেন। তার দীর্ঘ জবানবন্দী দেওয়ার সময় পুরো আদালতে এক হৃদয় বিদারক অবস্থা বিরাজ করছিল। তাকে নির্যাতনের কাহিনী শুনে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন অনেকে।

ফরিদুল মোস্তফা খান তার সাক্ষ্যতে বলেন-তিনি দৈনিক কক্সবাজার বাণী পত্রিকা এবং দৈনিক জনতার বাণী বিডি ডটকম অনলাইন পোর্টালের এর সম্পাদক। ২০১৯ সালের ২৭ ও ২৮ জুন তার পত্রিকা ও পোর্টালে “অপারাধে নিমজ্জিত টেকনাফের ওসি”, “টাকা নাদিলে ক্রসফায়ারে দেন টেকনাফের ওসি প্রদীপ”, “মাদক ব্যবসা, নারীদের সম্ভ্রম হানি, কন্ট্রাক কিলিং, মাদকসেবন” শিরোনামে বিভিন্ন সংবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ তার উপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সেসময় ফরিদুল মোস্তফা খান তার ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা চেয়ে ডায়রী করতে চাইলেও কক্সবাজারের কোন থানা তার ডায়রী নেয়নি। ফলে নিরূপায় হয়ে ফরিদুল মোস্তফা খান গোপনে ঢাকায় পালিয়ে যান। ঢাকায় গিয়ে ফরিদুল মোস্তফা খান প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি সহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন মহলের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন।

এ সংবাদ ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানতে পেরে ফরিদুল মোস্তফা খান এর উপর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১ টার দিকে ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরের একটি ভাড়া বাসা থেকে কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী তার বিরুদ্ধে টেকনাফ মডেল থানায় মামলা আছে বলে তুলে নিয়ে যায়। ঢাকা থেকে সড়কপথে টেকনাফ আনার পথে ফরিদুল মোস্তফা খানকে বেদম মারধর ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তাকে টেকনাফ মডেল থানায় আনা হয়। সেখানে হাজতখানা থেকে তাকে ওসি প্রদীপের কক্ষে নিয়ে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারন করে। তার ২ চোখ মরিচের গুঁড়ো দিয়ে জলসে দেয়। ধারালো পিন চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। হকিস্টিক, লাটি, বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে মারধর করে। প্লাস দিয়ে হাত ও পায়ের নখ তুলে ফেলার চেষ্টা করে। এসব নির্যাতনে অনেকটা অচেতন হয়ে পড়লে তাকে টেকনাফ থানা হাজতে ঢুকিয়ে রাখা হয়। সেখানে অনেকটা অচেতন অবস্থায় প্রচন্ড তৃষ্ণা পেলে হাহাকার অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের একটু পানি পান করাতে বলি। তখন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এর নির্দেশে টয়লেট থেকে গোমূত্র এনে আমার মুখের উপর ঢেলে দেওয়া হয়।

একইদিন গভীর রাত্রে টেকনাফ থানা থেকে ফরিদুল মোস্তফা খানকে মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে মেরিন ড্রাইভ রোডে, পরে কক্সবাজার শহরের কবিতাচত্বরে বালিকা মাদ্রাসা রোডে এনে ক্রস ফায়ার দেওয়ার চেষ্টা করে ওসি প্রদীপ ও তার বাহিনী।

পরে সেখান থেকে পুলিশের বহর নিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়া পাড়ার ফরিদুল মোস্তফা খানের বিক্রিত বাড়িতে গভীর রাতে গিয়ে ঘুমন্ত নারী শিশুদের উপর চরম অত্যচার চালায়। এরপর মদ, অস্ত্র ও ইয়াবা দিয়ে তাকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তৎকালীন ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার সহ অন্যান্যরা তাকে অমানবিক নির্যাতন করে। ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সদর থানা কর্তৃপক্ষ ফরিদুল মোস্তফা খানের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদকের পৃথক তিনটি মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। এরআগে ওসি প্রদীপ তার লোক দিয়ে ফরিদুল মোস্তফা খানের বিরুদ্ধে আরো তিনটি মিথ্যা মামলা দেয়। মোট ৬ টি মিথ্যা মামলায় ১১ মাস ৫ দিন জেল খেটে ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট ফরিদুল মোস্তফা খান জামিনে মুক্তি পান।

ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে সত্য কথা লিখতে গিয়ে ফরিদুল মোস্তফা খানকে চরম নির্যাতনের ঘটনা তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান জানার পর ফরিদুল মোস্তফা খানের সাথে তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন ফরিদুল মোস্তফা খান কারাগারে আটক থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে ফরিদুল মোস্তফা খানের মতো মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান এর উপর ওসি প্রদীপ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে ফরিদুল মোস্তফা খান জানতে পারেন। ফরিদুল মোস্তফা খান ওসি প্রদীপ কর্তৃক তাকে নির্যাতনের জবানবন্দী দেওয়াকালে আদালতে এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। ফরিদুল মোস্তফা খান (৩৮) মৃত মো: ইসহাক খান ও বেগম বাহারের পুত্র।

২৯ সেপ্টেম্বর এ মামলার ১৯ তম সাক্ষী হিসাবে আদালতে বেবী বেগম এর আংশিক জবানবন্দি নেওয়া হয়। সাক্ষ্য গ্রহনের পরবর্তী ধার্য তারিখ ১০ অক্টোবর বেবী বেগমের অবশিষ্ট জবানবন্দী ও আসামীদের পক্ষে তাকে জেরা করা হবে। বেবী বেগম (৩০) টেকনাফের হোয়াইক্ষ্যং লম্বাবিলের জিয়াউর রহমান স্ত্রী।

এদিকে, এ মামলায় পঞ্চম দফায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা আগামী ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর একটানা ৩ দিন অনুষ্ঠিত হবে। কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এর আদালতে এ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।

গত মঙ্গলবার ও বুধবার যথাক্রমে ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর পর পর ২ দিন মামলার ৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ ও আসামীদের পক্ষে জেরা শেষে বিজ্ঞ বিচারক পঞ্চম দফা সাক্ষ্য নেওয়ার জন্য এসব দিন ধার্য্য করেন।

এ মামলায় এনিয়ে মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। একজন সাক্ষীর আংশিক জবানবন্দি নেওয়া হয়। ১৮ জন যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা হলেন-মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী সাহিদুল ইসলাম সিফাত, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ আমিন, মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও হাফেজ শহীদুল ইসলাম, আবদুল হামিদ, ফিরোজ মাহমুদ ও মোহাম্মদ শওকত আলী, হাফেজ জহিরুল ইসলাম, ডা. রনধীর দেবনাথ, সেনা সদস্য সার্জেন্ট আইয়ুব আলী, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. মোঃ শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী, মোক্তার আহমদ, ছেনোয়ারা বেগম, হামজালাল, আলী আকবর, ফরিদুল মোস্তফা খান। আংশিক জবানবন্দি দিয়েছেন সাক্ষী বেবী বেগম।

রাষ্ট্র পক্ষে মামলাটির আইনজীবী ও কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) এডভোকেট ফরিদুল আলম, অতিরিক্ত পিপি এডভোকেট মোজাফফর আহমদ হেলালী, এপিপি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জিয়া উদ্দিন আহমদ সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণ করেন। এসময় বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস এর আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তফা, এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট মাহবুবুল আলম টিপু, এডভোকেট ফারহানা কবির চৌধুরী, এডভোকেট মোহাম্মদ সৈয়দুল ইসলাম, এডভোকেট এসমিকা সুলতানা প্রমুখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আসামীদের পক্ষে আদালতে এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, এডভোকেট দিলীপ দাশ, এডভোকেট শামশুল আলম, এডভোকেট মমতাজ আহমদ (সাবেক পিপি) এডভোকেট মোহাম্মদ জাকারিয়া, এডভোকেট চন্দন দাশ, এডভোকেট এম.এ বারী, এডভোকেট ওসমান সরওয়ার শাহীন, এডভোকেট মোশাররফ হোসেন শিমুল, এডভোকেট ইফতেখার মাহমুদ প্রমুখ সাক্ষীদের জেরা করেন।

সাক্ষ্য গ্রহণকালে মামলার ১৫ জন আসামীকেও কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। মামলায় কারাগার থেকে এনে আদালতে যে ১৫ জন আসামিকে হাজির করা হয়, তারা হলো : বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া।প, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •