মো. নুরুল করিম আরমান, লামা:
বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের একটি গ্রাম পোয়াং বাড়ি। এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি ও দিন মজুর। এক সময় এ গ্রামের কৃষকেরা জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ফসল ফলাতেন। এ সার ব্যবহারের পর ফসলের রোগবালাই বেড়ে যেত, উৎপাদন খরচও হতো বেশি। রাসায়নিক সার কম প্রয়োগে ফলন কম হয়। আবার অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের কারণে মাটির উর্বরতা শক্তি ও পানি ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং সবজির স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। ফসলে রোগজীবাণুর আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এদিক চিন্তা করে সাত বছর আগে বেসরকারী সংস্থা কারিতাসের খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ প্রদানের পর রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন এ গ্রামের কৃষক নুরুল আবচার, আমির হামজা, সেতারা বেগম, হাছিনা বেগমসহ ১০ থেকে ১৫জন কৃষক। তাদের দেখাদেখি ইতিমধ্যে কৃষি প্রযুক্তিতে নতুন সংযোজন কেঁচো সার তৈরিতে সাড়া জাগিয়েছে এ আদর্শ গ্রামটি। তা দেখে অনুপ্রাণিত হয় উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়নের দরদরী বরিশালপাড়া, নয়াপাড়া ও সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা গ্রামের কৃষকরাও। তাদেরকেও প্রশিক্ষণ ও উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করেন কারিতাসের বর্তমানে চলমান এগ্রো ইকোলজি প্রকল্পের কর্মকর্তারা। এ প্রকল্পের আওতায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে দেশী জাতের ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি এসব গ্রামে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন কৃষকরা। এতে তাদের সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। এখন এসব গ্রামসহ বিভিন্ন গ্রামের আড়াই সহস্রাধিক কৃষাণ কৃষানী গৃহস্থলী কাজের পাশাপাশি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে কেঁচো সার ও কেঁচো বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন। প্রতি মাসে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২৫ মেট্রিক টন কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। প্রতি কেজি সার ১৫টাকা হারে আয় হচ্ছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এসব জেলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকসহ পান, ধান, সবজিসহ ফলদ বাগান চাষিরা প্যাকেট জাতের মাধ্যমে এখান থেকে কিনে নিয়ে তাদের জমিতে ব্যবহার করছেন। আবার এ কারণে গ্রামগুলোর নাম ছড়িয়ে পড়েছে তিন পার্বত্য জেলাসহ পাশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে আসার কারণে উর্বরতা ফিরছে মাটির। লাভবান হওয়ায় দিন দিন এ সারের উৎপাদনে চাষীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, মাটির ভারসাম্য রক্ষায় এবং জমিতে ভালো ফলন উৎপাদনের জন্য জৈব সার অর্থাৎ কেঁচো সারের কোনো বিকল্প নেই। তাই ২০১৩ সালে পোয়াং বাড়ী গ্রামের নুরুল আবচার নামে এক কৃষককে কেঁচো সার উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করেন তৎকালীন কারিতাস খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের মাঠ সহায়ক প্রিয়াংকা ত্রিপুরা। তার পরামর্শে পোয়াং বাড়ীর পরিত্যক্ত একটি কক্ষে রিং বাসিয়ে গোবর সাজিয়ে তার ওপরে কেঁচো দিয়ে ছালা কিংবা মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন কৃষক নুরুল আবচার। পরে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই কেঁচো সার জমিতে ব্যবহারের উপযোগী হয়। উৎপাদিত সার নুরুল আবচার তার নিজের জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পান। এতে এ সার উৎপাদনে তার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। পরে তিনি কেঁচো সার উৎপাদন বৃদ্ধি করেন। গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষক তার কাছ থেকে কেঁচো সার নিয়ে তাদের জমিতে ব্যবহার করেন। এতে তারাও ভালো ফলন পান। এ সারের গুণাগুণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কৃষক নুরুল আবচারের দেখাদেখি অন্য চাষিরাও উদ্বুদ্ধ হয়। একে একে পুরো গ্রামে কেঁচো সার উৎপাদন ও ব্যবহারে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে কৃষাণ কৃষাণীরা। তাদেরকেও সার্বিক সহযোগিতা করেন খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের কর্মকর্তারা। সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে কৃষক নুরুল আবচার জানায়, এখন সার ও কেঁচো উৎপদনেই তার সংসার ও ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা চলে। এ আয়ের টাকা দিয়ে ইতিমধ্যে তিনি একটি পাকা ঘরও নির্মাণ করেছেন। তিনি বলেন, আমার দেখাদেখি এখন ৪৫ জন কৃষাণ-কৃষাণী কেঁচো সার উৎপাদন করে নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছেন আবার বিক্রিও করছেন। খুব কম খরচে এ সার উৎপাদন করা যায়। শুধু তাই নয় সারের পাশাপাশি কেঁচোও উৎপাদন করা যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি কেঁচো সার ১০-১৫ টাকা ও কেঁচো ১০০০-১৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান কৃষক নুরুল আবচার।

এদিকে উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়নের দরদরী নয়াপাড়ার হতদরিদ্র এক নারী ফরিদা বেগম। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। আয়ের কোন উৎস ছিলনা বিধায় খেয়ে না খেয়ে দিন যাপন করতে হত। পরে কারিতাস এগ্রো ইকোলজি প্রকল্পের সহায়তায় কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি। এ প্রকল্পের আওতায় তাকে একটি রিং ও কেঁচো সহ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর তিনি শুরু করেন কেঁচো সার উৎপাদন। বর্তমানে ৫টি রিং এ কেঁচো সার উৎপাদন করছেন ফরিদা বেগম। ৪-৫ হাজার টাকার সার উৎপাদন করছেন। এ আয় দিলেই তার সংসার চলে। তিনি প্রতি কেজি সার বিক্রি করেন ১০-১৫ টাকা ও প্রতি কেজি কেঁচো বিক্রি করেন ১০০০-১৫০০ টাকা দরে। নাছিমা বেগম, জরিনা, মামুন, মোসলেমা বেগম সহ এ গ্রামের ৫০ জন কৃষাণ কৃষানী এ সার উৎপাদনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন। তারা গত কয়েক মাসে ১৫টন সার উৎপাদন করে বিক্রি করেছেন। এছাড়া মেরাখোলা, গজালিয়া, বগাইছড়ি, শীলেরতুয়াসহ বিভিন্ন স্থানেও শত শত কৃষক এখন কেঁচো সার উৎপাদন ও ব্যবহারে সম্পৃক্ত। এতে তারা যেমন জমিতে চাষাবাদ করে ভালো ফলন পেয়ে লাভবান হচ্ছেন। তেমনি কেঁচো সার ও কেঁচো বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছেন মেরাখোলা গ্রামের ডেইজী রানী শীল, বাদল চন্দ্র নাথ, সৈয়দ নূর, কালা মিয়াসহ আরো অনেকে। এভাবে এ গ্রামটিও কেঁচো সার গ্রামে পরিণত হয়। ওইসব গ্রামের লোকদের কেঁচো সার উৎপাদনে সাফল্য দেখে আশপাশের গ্রামসহ দূরদূরান্তের লোকজনও তাদের জমিতে কেঁচো সার ব্যবহার ও উৎপাদন শুরু করেছেন।

কেঁচো সার ব্যবসায়ী আমির হাজমা জানান, এই সার এলাকার চাহিদা মিটিয়ে এখন কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছি। গত কয়েক বছরে এ সারের ব্যবসা করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় করেছি। প্রতি মাসে উপজেলায় প্রায় ২৫ মে.টন সার উৎপন্ন হচ্ছে। কারিতাস এগ্রো ইকোলজি প্রকল্পের কর্মকর্তা কর্মচারীদের কারণে এতটাকা আয় করতে পেরেছেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে কারিতাসের বান্দরবান কর্মসূচী কর্মকর্তা রুপনা দাশ জানান, ১৯৯১ সাল থেকে পার্বত্য অঞ্চলে জৈবিকভাবে চাষাবাদ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি দরিদ্র নারী পুরুষের উন্নয়নে কারিতাস বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। তারই ধারাবাহিকতায় খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান জেলার লামা, আলীকদম ও থানচি উপজেলায় কেঁচো সার উৎপাদনের জন্য কৃষাণ কৃষাণীদের প্রশিক্ষণ ও উপকরন প্রদান করা হয়েছে। এ সারে কৃষকদের আত্নসামাজিক অবস্থারও উন্নতী হচ্ছে। ভবিষ্যতে এগ্রো ইকোলজি প্রকল্প দ্বিতীয় ধাপে আরো প্রায় দেড় হাজার মানুষকে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ কেঁচো সার জনপ্রিয় হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদনে উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষিত বেকার নারী-পুরুষ এগিয়ে এসেছেন। এতে উপজেলায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে এসেছে। এ সার উৎপাদনে তারা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন, এতে উপজেলার কৃষি অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন কারিতাসের এ কর্মকর্তা।

কারিতাসের উদ্যোগে কৃষকদের কেঁচো সার উৎপাদনের সত্যতা নিশ্চিত করে লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সানজিদা বিনতে সালাম জানায়, কেঁচো সার দিলে ফসলের উৎপাদন বেশি ও ফল বা সবজি সুস্বাদু হয়। মাটির স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। এ জন্য আমরাও রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার উৎপাদনে কৃষকদের নানাভাবে উৎসাহিত করে আসছি। যে হারে কৃষকরা কেঁচো সার উৎপাদনে ঝুঁকে পড়েছেন, তাতে প্রতি বছর বরিশাল পাড়া, উত্তর দরদরী নয়াপাড়া, মেরাখোলা ও পোয়াং বাড়ি গ্রাম থেকে ২৫ মেট্রিক টন কেঁচো সার উৎপাদন করা সম্ভব। সারটি উৎপাদনে কৃষকদের বাড়তি আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলেও জানান তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •