আবদুর রহমান খান

 

বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে আফগানিস্তান। বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা এবং তার সহযোগী ইউরোপীয় যুদ্ধবাজরা বিশ্ব ইতিহাসদের দীর্ঘতম যুদ্ধে করুন পরাজয় বরণ করে ঘরে ফিরে গেছে। বিজয়ী তালেবানরা আফগানিস্তানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছে।

গোটা বিশ্বের নজর এখন আফগানিস্তানের দিকে। ইতোমধ্যে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দিয়েছে। আখুন্দজাদা তার বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীকে এটা নিশ্চিত করতে চাই যে ইসলামিক আইন ও শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নে এ সরকার কঠোর পরিশ্রম করে যাবে। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের সব কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হবে শরিয়াহ আইন অনুসারে। তালেবানের নতুন সরকার দেশটিতে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি, অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাবে।‘

আফগানিস্তানে ক্ষমতার পট পরিবর্তনে মধ্যস্ততা করা, হাজার হাজার বিদেশীকে সে দেশ থেকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করা, নতুন সরকার গঠন এবং আফগানিস্তানের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা – এসব ব্যাপারে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে বিশ্বের নজর কেড়েছে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান।

আফগানিস্তানে শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করার আগ্রহ নিয়ে বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের আয়োজন করেছে পাকিস্তান। পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশির সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নিয়েছে ইরান, চীন, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের পররাষ্টমন্ত্রীগন।

এক বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আফগানিস্তানকে তিন কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই সহায়তার আওতায় আফগানিস্তানকে খাদ্যসামগ্রী ও করোনার টিকা দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার ( ০-৯ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের

মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী দেশ হিসেবে আফগানিস্তানে বিশ্ব ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। গত দু’শক ধরে আমেরিকার সহযোগী হয়ে ভারত নানাভাবে আফগানিস্তানে তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে । দেশটির নিরাপত্তা ও ভূকৌশল বিশেষজ্ঞরা এখন মনে করছেন, তালেবানপূর্ব আফগানিস্তানে ভারতের যে প্রভাব ছিল, সেটা এখন যেমন খর্ব হবে, তেমনি তালেবানের উত্থান ভারতের নিরাপত্তার জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আফগানিস্তানে তালেবানদের পুরুত্থান যে ভারতের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার লক্ষণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তালেবানদের হাতে কাবুলের ক্ষমতা নিশ্চিত হবার পর পরই ভারত কাশ্মীরের সংবাদপত্রে তালেবান নিয়ে খবর নিষিদ্ধ করেছে।

গত ১৫ আগস্ট নাগাদ আফগান প্রেসিডেন্ট আশরফ গনি যখন দেশ ছাড়েন, কাশ্মীরের সংবাদপত্রগুলো সেই খবর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেছিল। পরদিনই তথ্য কর্মকর্তার দপ্তর থেকে পত্রিকার সম্পাদকদের ডেকে বলে দেওয়া হয়, তালেবান কিংবা আফগানিস্তানের প্রসঙ্গে কোনো খবর যদি তারা প্রকাশ করে, তা হলে সরকারি বিজ্ঞাপন মিলবে না।

মুসলিম হিসেবে কাশ্মীরের বিষয়ে কথা বলার অধিকার রয়েছে- তালেবান মুখপাত্রের এমন বক্তব্যও কাশ্মীরের কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি।

এছাড়া, ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মিরের স্বাধীকারকামী প্রবীণ নেতা সাইয়েদ আলী শাহ গিলানি গৃহবন্দী অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে নিজ বাসভবনে মৃত্যু বরণ করার পর তার জানাজায় ব্যাপক জনসমাগম ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরিবার অভিযোগ করছে, গিলানির শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাকে শ্রীনগরের ঈদগাহের কাছে মাজার-ই-শুহাদা বা শহীদদের কবরস্তানে দাফনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হলেও রাত সাড়ে তিনটায় সরকারি বাহিনী বাড়িতে এসে তার লাশ ছিনিয়ে নেয় এবং বাড়ির কাছে এক কবরস্তানে গোপনে দাফন করে।পরদিন সকাল ১০টায় পরিবারের সদস্যদের গিলানির কবর দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) জানিয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা গিলানীর লাশ দাফন করেছেন এবং ভারত বিরোধী বিক্ষোভের আশঙ্কায় গণজানাজা পড়ার অনুমতি দেয়নি।

এদিকে, কাশ্মীরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই প্রবীণ নেতার লাশ পাকিস্তানের পতাকায় আবৃত করা এবং দাফনের আগে ভারতবিরোধী স্লোগান তোলায় তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভারতীয় পুলিশ।

ভারতের মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম) প্রধান ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এমপি বৃহস্পতিবার ( ৯ সেপ্টেম্বর ) বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশের বারাবাঙ্কিতে এক জনসভায় বলেছেন, ‘২০১৪ সালে দেশে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিজেপি ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করতে চায়।’ উত্তর প্রদেশ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যটিতে রাজনৈতিক ভিত মজবুত করতে মাঠে নেমেছে ‘মিম’।

সম্প্রতি ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত নিকোলাই কুদাশেভ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের প্রভাব কাশ্মিরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব নিকোলাই পাত্রুশেভ এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বুধবার(৮ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে এক বৈঠকে অংশ নিয়ে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে। বৈঠকে জৈশ-ই-মুহাম্মাদ এবং লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে ভারতীয় এক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশেষকগণ বলছেন, আফগানিস্তানে তালেবান গোষ্ঠীর উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ক্ষমতা বিন্যাসে ভারত যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছে আর পাকিস্তান চলে এসেছে সুবিধাজনক অবস্থানে। তালেবান-পাকিস্তানের মধ্যকার ঘনিষ্টতা ক্রমশ বাড়তে থাকায় ভারতের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। কারণ, আগে থেকেই তালেবান-চীন নৈকট্যের বিষয়টি ভারতকে উদ্বিগ্ন করে রেখেছে।

ভারত গত দুই দশকে চার শতাধিক সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ৩০০ কোটি ডলারেও বেশি বিনিয়োগ করেছে। এইসব অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ভারতের কাছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে কাবুলের ক্ষমতায় পালাবদলে ভারত শুধু জটিল সঙ্কটেই নিপতিত হয়নি, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিসরে যথেষ্ট কোণঠাসাও হয়ে পড়ছে।

মধ্য এশিয়ার বাজারে ঢোকার জন্য ভারতের জন্য আফগানিস্তান খুবই জরুরি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ। কারণ, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে এবং লাদাখ নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের বিপজ্জনক দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন আফগানিস্তান শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হলে এবং চীন ও পাকিস্তান কাবুলে ক্ষমতাসীন তালেবানদের ঘনিষ্টতর হলে ভারতের দুশ্চিন্তা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক ।

ভারতীয় মিডিয়া, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো তালেবান-পাকিস্তান মৈত্রীর নানা দৃষ্টান্ত সামনে তুলে ধরছে। ভারতের গণমাধ্যমে এখনো তালেবানদের সন্ত্রাসী বলেই অভিহিত করা হচ্ছে।

উগ্র হিন্দুত্ববাদি বিজেপি ভারতের আরও মনঃকষ্টের বিষয় হচ্ছে তালেবানদের শরিয়া আইনের ঘোষণা । ভারতের উগ্রবাদী দল বিজেপি বা শিবসেনাদের স্বপ্ন তারা ভারতকে কেবল হিন্দুদের জন্য একটি খাটি “ হিন্দুস্থান” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের স্বপ্নের রামরাজ্য আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা ভারতের মুসলমানদেরকেও হিন্দু হয়ে যাবার পরামর্শ দিচ্ছে এবং গরু রক্ষার নামে মুসলমানদের পিটিয়ে মারছে। রাষ্ট্রীয় মদদে মুসলিম সহ সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক নির্যন চালিয়ে আসছে বৃহৎ গণতন্ত্রের দাবিদার ভারত ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক ম্যাগাজিন ডিপ্লোম্যাট –গত সপ্তাহে এক নিবন্ধ প্রকাশ করে জানিয়েছে, আফগানিস্তান নিয়ে ভারতের ত্রিমুখী সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত স্থলপথে দু’দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব নয় আর বিমান যোগেও পথের বাধা পাকিস্তান ও চীন। দ্বিতীয়ততঃ আমেরিকার হাত ধরে আফগানিস্তানে প্রভাব খাটানোর সুযোগও হারিয়ে ফেলেছে ভারত। আর সর্বশেষ আতঙ্ক হচ্ছে তালিবানদের পক্ষে পাকিস্তানের শক্ত সমর্থন।

এ অবস্থায় কাশ্মীর বা ভারতের মুসলমানদের মধ্য তালেবানী চেতনা ছড়িয়ে গেলে কী ভয়ানক সমস্যা হবে , সেটা ভেবেই শঙ্কিত ভারতের বিজেপি সরকার। তবে বিজেপিকে এখন বরং ভাবতে হবে তারা উগ্র হিন্দুবাদী মতাদর্শে ভারতকে এগিয়ে নেবে নাকি গণতন্ত্র ও ধর্মকনিরপেক্ষতার পথে ফিরে আসবে।

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •