মোঃ আবছার কবির আকাশ :
গ্রামীন কুসুংস্কার আর প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন টেকনাফ উপজেলার হ্নীলার প্রত্যন্ত গ্রাম মৌলভীবাজারের গৃহবধূ আসমা মাহবুবা পিংকি। পিংকি শুধু সফল স্ত্রী বা মা নন, তিনি একজন চাকরিজীবী, কঠোর পরিশ্রমী ও তীব্র ইচ্ছা শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত টেকনাফের একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।

মাশরুম চাষ ও উৎপাদনে বিশাল সাফল্যের সূচনা করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা পিংকি। স্কুল জীবন থেকে বইয়ের ছবি দেখে মাশরুম চাষের যে স্বপ্ন তিনি মানসপটে এঁকেছিলেন, এখন তা বাস্তব জীবনে ফুটিয়ে তুলে টেকনাফের মত এলাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। পরিণত জীবনে আসমা মাহবুবা পিংকি এখন অনেকটা সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছেন। অনেকে মনে করেন, টেকনাফে মাশরুম চাষে পিংকি হতে পারেন আদর্শ মডেল চাষি।

গৃহবধু পিংকির বাড়িতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে মাশরুম চাষের জন্য ছোট-বড় পাচঁটি শেড রয়েছে তার। ওয়েস্টার (পপ-২,পিও-২) , হোয়াইট, মিল্কি, স্ট্র জাতের চার ধরনের মাশরুম বীজ এখানে চাষ হচ্ছে। মাশরুম চাষের জন্য প্রথমে একটি বড় পলিথিনের মধ্যে ধান গাছের খড়কে সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে রাখা হয়। তারপর এর মধ্যে মাশরুম বীজ রাখার ২৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে পরিপক্ব মাশরুম পাওয়া যায়। পলিথিন ব্যাগের ছিদ্র দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে ধবধবে সাদা বর্ণের মাশরুম বের হয়ে আসে।

মাশরুমগুলো যখন পরিপক্ব হয়ে ওঠে তখন সেগুলো কেটে রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। তার মাশরুম খামার থেকে প্রতিদিন ০৭ থেকে ১০ কেজি মাশরুম পাওয়া যায়, যা বিক্রি করে মাসিক অন্তত ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। পিংকি পুরো বাড়িই মাশরুম উৎপাদন ও পক্রিয়াজাতকরণ খামারে পরিণত হয়েছে। খামারের কোনো স্থানে রয়েছে উৎপাদিত কাঁচা মাশরুম, কোনো স্থানে মাশরুম শুকিয়ে চলছে বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি। বাড়ির একটি কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে শুকনো মাশরুম মজুদ ও বিক্রয় প্রক্রিয়ার কাজে।

আসমা মাহবুবা পিংকি বলেন, ২০১১ সালের দিকে তার মাশরুম চাষের প্রতি আগ্রহ জন্মে। তাই ২০১২ সালে কক্সবাজার হর্টিকালচার মাশরুম প্রশিক্ষন কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে ফেরেন তিনি। বাড়ি এসেই প্রথমে ট্রেনিং সেন্টার থেকে দেওয়া মাত্র ২০ টি বীজ নিয়ে ছোট পরিসরে চাষ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালের শেষের দিকে বিয়ে হলে সেইখানে মাত্র ২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে সামান্য কিছু মাশরুম বীজ কিনে এনে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে চাষ শুরু করেন। তামান্না হাবিব ও বোন কামরুন নাহার পিংকিকে পরামর্শসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে পিংকি জানান, ঋণ পেলে আরও ব্যাপক পরিসরে মাশরুম চাষ করা সম্ভব হবে। পিংকির স্বপ্ন মাশরুম নিয়ে টেকনাফের সাধারণ মানুষদের সাথে কাজ করা এবং টেকনাফকে মাশরুম ব্যবসায় রুল মডেলে পরিনত করা।

টেকনাফ উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মাশরুম ফার্মে ঋতু ভেদে বিভিন্ন ধরনের মাশরুম চাষ হয়। বিশেষ করে গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবকরা পিংকির এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখে এখন এ চাষের প্রতি ঝুঁকছেন এবং জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কেউ মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে আমরা তাদের সিডিউল অনুযায়ী ব্যবস্থা করি। পিংকি শুধু মাশরুম চাষে না, শাক-সবজি চাষেও এলাকায় তার বিরাট অবদান রয়েছেন। তরুন উদ্যোক্তা পিংকিকে সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।

ব্যক্তিগত জীবনে পিংকি বিবাহিত। তার সংসারে রয়েছে এক মেয়ে এক ছেলে। তার স্বামী বেলাল উদ্দিন একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরিরত। মাশরুম চাষে তার স্বামী বেলালের সার্বিক সহযোগিতা পান বলে জানান পিংকি।