পেকুয়া সংবাদদাতা:
পেকুয়া উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে বিপদজনক এলাকা হিসাবে পরিচিত মগনামা, টৈটং আর রাজাখালী। কোন না কোন সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়ার বিষয়টি রাজনৈতিক রুপধারণ করে ভিন্নরূপে প্রবাহিত হয়। এমনকি হত্যার মত ঘটনাও ঘটে। যার কারণে ওই সমস্ত ইউনিয়নে আইনশৃঙ্খলা অবনতি হওয়ার পাশাপাশি আতংকের মধ্যে দিনাযাপন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। সময়ে সময়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে হামলার শিকার হতে হয় ওই বাহিনীর সদস্যদের। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আধিপত্যের কারণে বলি হতে হয় নিরহ জনগণকে।

স্থানীয়রা জানায়, গত মঙ্গলবার সকালে মৎস্য প্রজেক্টের মাছ লুঠের অজুহাত দিয়ে মগনামা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী ওয়াসিমের ভাই সরকারি চাকুরিজীবি নিরহ এনায়েত উল্লাহ ও তার মামাতো ভাই আরফাতকে কুপিয়ে ও চোখ উপড়ে হত্যার চেষ্টা করে। স্থানীয়দের তড়িৎ তৎপরতায় এ যাত্রা থেকে রক্ষা হলেও হাসপাতালে মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তারা। স্থানীয় চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী এ ঘটনাটি ঘটনার সাথে সাথে তার সমর্থক ও এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করলে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন চেয়ারম্যানকে।

সাথে সাথে দ্রুত সময়ে পেকুয়া থানার একদল পুলিশ মগনামার মুহুরী পাড়ায় গিয়ে হামলাকারীদের ধরার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে স্থানীয় নিরহ জনগণ এক শ্রেণির সুবিধাবাদী নেতার আশ্বাসে পুলিশের উপর হামলা করে আসামী ছিনিয়ে নেয়। ফলে চরম অবনতি হয় আইনশৃংখলার।

এদিকে পেকুয়া থানা প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জেলা পুলিশ সুপারের সহায়তা কামনা করলে পুলিশ সুপার মোঃ হাসানুজ্জামান ও সার্কেল ( চকরিয়া-পেকুয়া) তৌফিক আলম অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে পরিস্থিতির সাময়িক নিয়ন্ত্রণ করে।

এদিকে মগনামার পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশংকা দেখা দিলে পুলিশের উপর হামলার ভিডিও ফুটেজ দেখে ৩৩ জনকে নাম উল্লেখ করে ও ৯০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা রেকর্ড করে পেকুয়া থানা পুলিশ। একই সাথে পুলিশি টহল জোরদার ও সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারীর কারণে শান্ত হয়ে আসছে মগনামার উত্তপ্ত পরিস্থিতি। একই সাথে চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী ওয়াসিম তার অনুগত লোক ও সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হয়ে আসে।

আকতার, সামশুল আলম ও রোকেয়া নামের মগনামার এক মহিলা বলেন, মগনামার কিছু মানুষের খারাপ মনমানসিকতার জন্য আইনশৃংখলার অবনতি হয়। পুলিশ অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়লে তাদের উপর হামলা করা হয়। পুলিশের কাছ থেকে আসামী ছিনিয়ে নেয়ার কথা আমাদের জন্য লজ্জার। কেউ নির্দেশ দেয় আর কেউ হামলা করে এমন বেআইনী কর্মকান্ড থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে।

মগনামা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী ওয়াসিম বলেন, মগনামায় যখন আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় তখন গ্রামীণ অবকাঠামো ছিল খুব নাজুক অবস্থায়। খাবার ও পানির সংকঠে ছিল সাধারণ জনগণ। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিকূল পরিবেশ কাটিয়ে চকরিয়া- পেকুয়ার অভিভাবক জাফর আলম মহোদয়ের হাত ধরে মগনামাকে উন্নয়নের রোল মডেল করার মনস্থির করি। বিগত পাঁচ বছরে মগনামার প্রতিটি গ্রামে উন্নয়ন করেছি। সরকারি সহায়তা ছাড়াও দূর্যোগমূহুর্তে নিজ উদ্যোগে সহায়তা দিয়ে জনগণের পাশে থেকেছি। কিন্তু একটি চক্র আমার এমন উন্নয়নে ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার লোকদেরকে হত্যা আর হামলা শুরু করে। এর আগে জয়নালকে হত্যা করার পর গত পরশু আমার ভাইকেও হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে গুটি কয়েক লোক। মগনামার সকল মানুষ মারেনি মারধর করেছে কয়েকজন দূর্বৃত্ত । কিন্তু তারই সুত্র ধরে একটি পাড়ার সকল মানুষকে আমার প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টা দুঃখজনক। মুহুরীপাড়ার অনেক জ্ঞানী মানুষের জন্ম। আমার অনেক শুভাকাংখি ভাই ওখানে আছে। সত্যিকার অর্থে আমার সঙ্গে কারো ব্যক্তিগত শত্রুতা নাই। মগনামার সকল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চেয়ারম্যান হিসেবে আমার কর্তব্য ও দায়িত্ব । আমি আমার আত্মীয়স্বজন বা শুভাকাংখীদের বলতে চাই অতি উৎসাহী হয়ে কিছু করবেন না। মগনামার আপামর জনতা আমার হৃদয়ের মানুষ । আমি তাদের নগণ্য সেবক। আমি বলতে চাই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু মানুষ পরিস্থিতি অশান্ত করেছে। আমার ভাইকে যারাই মেরেছে মামলায় শুধু মাত্র তারাই আসামী হয়েছে। আর পুলিশের উপর হামলা ও আসামী ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনার মামলায় আমার কোন হাত নাই। যতটুকু জানতে পেরেছি পুলিশ ভিডিও ফুটেজ দেখে মামলায় আসামী করেছে। যদিওবা কোন নিরহ লোক আসামী হয়ে থাকে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হউক।

তিনি আরো বলেন, মৎস্য প্রজেক্ট করে অথবা যেখোন কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করা সকলের অধিকার। কারো মৎস্য প্রজেক্ট থেকে যদি কেউ মাছ লুঠ করে থাকে তাহলে প্রশাসন তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে এবং এক্ষেত্রে আমারও সহযোগিতা থাকবে। মাছ লুঠের কথা বলে নিরহ লোকদের উপর যদি হামলা হয় প্রশাসনতো ব্যবস্থা নিবেই। কিছুদিন আগে আমার নিকটতম লোক জয়নালকে নির্মমভাবে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। অভিযোগ রয়েছে সেই সন্ত্রাসী ও তাদের অনুসারীদের নিয়ে বেঙকল ঘোনা নামে মৎস্য প্রজেক্টের বাসায় কক্সবাজার শহরে অবস্থানকারী মগনামার সন্তান রাশেদুল ইসলাম বৈঠক করেছেন। অথচ রাশেদুল ইসলাম অতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান ও আমার প্রিয় মানুষের সন্তান। ওনার সাথে আমার কোন বিরোধ নাই। ওনারা যেমন এলাকার মানুষদের মঙ্গল কামনা করেন তেমনি আমিও জনগণের সেবা করি। আমার ভাইয়ের উপর হামলার ঘটনাটি দেখে সাধারণ জনগণ রাশেদুল ইসলামের নামে যেই স্লোগান দিয়েছেন তা আমার ভাইয়ের রক্ত দেখে হয়তোবা দিয়েছেন। আমার আশা ও বিশ্বাস থাকবে ওনি সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিবেনা।

চেয়ারম্যান ওয়াসিম অভিযোগ করেন, অনেকে আমার ভাইয়ের মামলায় আসামি করার ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমি বা আমার লোকজন পথে-ঘাটে হামলা করবে বলে অপপ্রচার করছে। এটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো। চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসে আমি ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যাঁরা জড়িত তাঁদের সবাইকে আমি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখছি।

এছাড়াও গুটিকয়েক যাঁরা দুর্বৃত্ত তাঁদের মগনামার সাধারণ জনতা প্রত্যাখ্যান করেছে। আমার ভাইয়ের মামলায় যাঁরা জড়িত শুধু মাত্র তাঁদের ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের প্রতিও আমার ক্ষোভ নেই। আমার কামনা, আমার ভাই সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক। আইন আইনের গতিতে চলুক।

এবিষয়ে পেকুয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, দুইজন লোককে প্রকাশ্যে আহত করার ঘটনায় পুলিশ হামলাকারীদের আটক করতে গেলে তাদের উপর হামলা করা হয়। ছিনিয়ে নেয়া হয় আসামী। তা খুব বর্বর ঘটনা। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে যারাই জড়িত মামলায় আসামী করা হয়েছে। আর সেই ঘটনার পর থেকে পুলিশ সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করার পর পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। মামলার আসামীদের ধরার চেষ্টা চলছে। আর যারাই আইনশৃঙ্খলার অবনতি করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •